বৃষ্টি হচ্ছিল। দুর্গাপূজার সপ্তমীর সন্ধ্যায় মানুষের ঢল নেমেছিল ভারতের পশ্চিমবঙ্গের উত্তর কলকাতার চোরবাগান সর্বজনীন পূজামণ্ডপে। কিন্তু এত মানুষের যাতায়াতের জন্য প্রবেশ ও বের হওয়ার পথ ছিল সরু। সেখানে পর্যাপ্ত আলোও ছিল না।
এর মধ্যেই একটি ঘোষণা আসে। শুরু হয় হুড়োহুড়ি। কয়েকজন পড়ে যান। মুহূর্তের মধ্যে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।
গতকাল শনিবার সন্ধ্যার সেই ঘটনায় পদদলিত হয়ে অন্তত ১৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। নিহতদের মধ্যে ১৩ জন নারী ও একটি শিশু রয়েছে। আহত হয়েছেন অন্তত ২৫ জন।
কলকাতা পুলিশ জানিয়েছে, গিরিশ পার্ক থানা এলাকার চোরবাগান সর্বজনীন পূজামণ্ডপ থেকে বের হওয়ার পথে সন্ধ্যা ৭টা ৪০ মিনিটের দিকে পদদলনের ঘটনা ঘটে। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, বৃষ্টির মধ্যে পূজামণ্ডপে আসা মানুষের প্রচণ্ড ভিড়ের কারণে এ পরিস্থিতি তৈরি হয়।
মণ্ডপের বাইরে স্বজনদের আহাজারি। ছবি : সংগৃহীতঘটনার বর্ণনায় কয়েকটি বিষয় সামনে এসেছে। বিপুল মানুষের ভিড়, বৃষ্টি, সরু প্রবেশ ও বের হওয়ার পথ, অন্ধকার এবং মানুষের হঠাৎ তাড়াহুড়া। এর সঙ্গে আয়োজকদের একটি ঘোষণাও পরিস্থিতি আরও খারাপ করে থাকতে পারে।
ঘটনাস্থলে থাকা এক ব্যক্তির বর্ণনায় পরিস্থিতির ভয়াবহতা আরও স্পষ্ট হয়েছে। তার মেয়ে ও নাতনিকে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছিল।
তিনি জানিয়েছেন, প্রবেশের পথ খুব সরু ছিল। বের হওয়ার পথও ছিল সরু। ওই এলাকায় আলো ছিল না।
পূজামণ্ডপে ঢুকতে প্রায় ৯০ মিনিটের লম্বা সারি ছিল। আবার বৃষ্টি হওয়ায় সবাই দ্রুত ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করছিলেন।
প্রত্যক্ষদর্শী বলেছেন, ‘জায়গাটি খুব সরু ছিল। অন্ধকার ছিল। একটি আলোও ছিল না। অন্ধকারের কারণে দুজন পড়ে যায়।’
তিনি নিজেও পড়ে গিয়েছিলেন। তার সামনে একটি ছোট মেয়ে ও একটি ছেলে পড়ে যায়। এরপর তাদের ওপর অনেক মানুষ পড়ে যান।
তার দাবি, ওই সময় সেখানে পুলিশ বা স্বেচ্ছাসেবক কাউকেই দেখা যায়নি।
এর সঙ্গে আরেকটি বিষয় সামনে এসেছে। হাসপাতালে যাওয়ার পর মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বলেছেন, আয়োজকদের একটি ঘোষণার পর দর্শনার্থীদের মধ্যে হুড়োহুড়ি শুরু হয়। তার মতে, সেই হুড়োহুড়িই এ ‘বেদনাদায়ক ঘটনার’ দিকে নিয়ে যায়।
অর্থাৎ একটি কারণ নয়, কয়েকটি পরিস্থিতি একই সময়ে তৈরি হয়েছিল। আগে থেকেই ছিল বিপুল ভিড়। মানুষের চলাচলের জায়গা ছিল সংকীর্ণ। অন্ধকারে সামনে কী ঘটছে, তা বোঝাও কঠিন হয়ে পড়েছিল। বৃষ্টির কারণে মানুষ দ্রুত এগোতে চাইছিলেন। এরপর একটি ঘোষণা হঠাৎ ভিড়ের গতিবিধি বদলে দেয়।
মণ্ডপে প্রবেশমুখে দর্শণার্থীদের হুড়োহুড়ির দৃশ্য। ছবি : সংগৃহীতপুলিশ জানিয়েছে, আহতদের উদ্ধার করে মেডিকেল কলেজ অ্যান্ড হাসপাতালে নেওয়া হয়। নিয়ন্ত্রণকক্ষ থেকে অতিরিক্ত পুলিশ পাঠানো হয়। দমকল বাহিনী, কলকাতা পুলিশের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা দল এবং চিকিৎসকসহ অ্যাম্বুলেন্সও মোতায়েন করা হয়। পরে পূজামণ্ডপটি দর্শনার্থীদের জন্য বন্ধ করে দেওয়া হয়।
ঘটনায় শোক জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। নিহতদের পরিবারকে দুই লাখ রুপি করে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন তিনি। আহতদের দ্রুত সুস্থতা কামনা করেছেন মোদি।
কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহও শোক জানিয়েছেন। আহতদের দেখতে হাসপাতালে যাওয়ার জন্য রবিবার পশ্চিমবঙ্গে তার নির্ধারিত সব কর্মসূচি স্থগিত করার কথা জানিয়েছেন তিনি।
তৃণমূল কংগ্রেসের এমপি অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছেন, এমন ঘটনা তিনি আগে দেখেননি। এ ঘটনায় কলকাতা পুলিশ, পশ্চিমবঙ্গ পুলিশ ও শুভেন্দু অধিকারীর সরকারের সমালোচনা করেছেন তিনি।
উৎসবের সপ্তমীর সন্ধ্যায় তাই কয়েকটি ঝুঁকি একসঙ্গে মিলে ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনে। সরু পথ, অন্ধকার, বৃষ্টি ও বিপুল ভিড়ের মধ্যে হঠাৎ হুড়োহুড়ি— শেষ পর্যন্ত সেটিই ১৯ জনের প্রাণ কেড়ে নেয়।
সূত্র : এনডিটিভি