বাংলাদেশের জুলাই অভ্যুত্থান থেকে ভারতের তরুণরা অনুপ্রেরণা নিচ্ছে—অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের (AISA) সভাপতি নেহা বোরার এমন বক্তব্য ঘিরে ভারতের রাজনীতিতে শুরু হয়েছে বিতর্ক। তাঁর বক্তব্যকে কেন্দ্র করে কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী ও বিরোধী দলগুলোর বিরুদ্ধে আক্রমণ জোরদার করেছে ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)। দলটির নেতাদের অভিযোগ, বাংলাদেশের অভ্যুত্থানকে অনুসরণ করে ভারতে সরকার পরিবর্তন ও অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির পরিকল্পনা করছে বিরোধীরা। গত ১৪ অক্টোবর বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের ষষ্ঠ জাতীয় সম্মেলন উপলক্ষে এক ভিডিওবার্তায় বক্তব্য দেন নেহা বোরা। সেখানে বাংলাদেশের জেন-জি আন্দোলনের প্রশংসা করে তিনি বলেন, ভারতের বিভিন্ন স্থানে যে তরুণদের আন্দোলন দেখা যাচ্ছে, তার সূচনা বাংলাদেশে হয়েছিল। বাংলাদেশের তরুণদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘আমাদের পথ দেখানোর জন্য অভিনন্দন।’
তবে তাঁর এই বক্তব্যকে ভারতে সরকার পরিবর্তনের পরিকল্পনার ইঙ্গিত হিসেবে ব্যাখ্যা করেছে বিজেপি।
দলটির জাতীয় মুখপাত্র প্রদীপ ভান্ডারি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বোরার বক্তব্যের ভিডিও শেয়ার করে তাঁকে রাহুল গান্ধীর ‘পোস্টার গার্ল’ হিসেবে উল্লেখ করেন। একই সঙ্গে তিনি অভিযোগ করেন, “রাহুল গান্ধী ও তাঁর পুরো রাজনৈতিক বলয় কেবল রাজনৈতিক বিরোধিতা করতে চায় না; তাদের লক্ষ্য সরকার পরিবর্তন। একটি সাক্ষাৎকারে নেহা বোরা বলেছেন, তিনি বাংলাদেশের জেন-জি নেতৃত্বাধীন আন্দোলন থেকে অনুপ্রাণিত। আর তারা ভারতে বাংলাদেশে যা ঘটেছে, তা পুনরাবৃত্তি করতে চায়। এটি সরকার পরিবর্তনের ষড়যন্ত্রের প্রকাশ্য স্বীকারোক্তি। রাহুল গান্ধী ও তাঁর সহযোগীরা ভারতের গণতন্ত্রের জন্য হুমকি!”
নেহার বক্তব্যকে সরকার পতনের ষড়যন্ত্র হিসেবে উল্লেখ করে বিজেপির আইটি সেলের প্রধান দীপক মাশকে বলেন, “There, they've said it. No elections, no respect for the Constitution, just mob rule.”
নেহার বক্তব্য নিয়ে বিতর্ক উসকে দিয়েছেন উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী ও উগ্র হিন্দুত্ববাদী বিজেপি নেতা যোগী আদিত্যনাথও। নেহা বোরার বক্তব্যের সমালোচনা করে তিনি বলেন, “গণতন্ত্রে ক্ষমতায় যাওয়ার পথ জনগণের রায় থেকে আসে, নৈরাজ্য থেকে নয়। বাংলাদেশে যা ঘটেছে, তার আদলে ভারতে ক্ষমতা পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখা শক্তিগুলো তরুণদের হাতে রাষ্ট্র গঠনের মশাল তুলে দেওয়ার পরিবর্তে নৈরাজ্যের হাতিয়ার তুলে দিতে চায়।”
বিষয়টি নিয়ে আরও সরব হয়েছেন ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং। গত ১৬ অক্টোবর লখনউয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি অভিযোগ করেন, 'বাংলাদেশের অভ্যুত্থানের আদলে ভারতে সরকার পরিবর্তনের চেষ্টা করছে বিরোধী দলগুলোর জোট। তাঁর দাবি, নির্বাচনসংক্রান্ত অনিয়মের অভিযোগ ও ভোটার তালিকা সংশোধনের বিরোধিতার আড়ালে তরুণদের রাজনৈতিক সংঘাতের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।'
এদিকে, নেহার বক্তব্য ঘিরে বিজেপিপন্থী প্রচারমাধ্যমগুলোতেও দেখা যাচ্ছে হুল্লোড়। দেশভাগের ষড়যন্ত্র, সরকার পতনের ষড়যন্ত্র, ডিপ স্টেটের ফান্ডিংসহ নানা তত্ত্ব হাজির করছে প্রচারমাধ্যমগুলো। রিপাবলিক বাংলার চিফ এডিটর অর্ণব গোস্বামী একটি অ্যানালিসিস প্রতিবেদন প্রচার করেন, যার শিরোনাম ছিল, ‘বাংলাদেশ মডেলে রেজিম পরিবর্তন করতে চাওয়া নেহা, দীপকে ও ককরোচদের বিরুদ্ধে জাতীয়তাবাদীরা জাগবে’। এনডিটিভির টকশোর শিরোনাম ছিল, ‘ভারতের জন্য বাংলাদেশ মডেল? নেহার বক্তব্য ঘিরে রাজনৈতিক সমালোচনা’। এ ছাড়া ভারতের প্রায় প্রতিটি প্রচারমাধ্যম নেহার বাংলাদেশের গণঅভ্যুত্থান নিয়ে করা প্রশংসাকে নেতিবাচকভাবে প্রচার করে। দেখুন এখানে, এখানে, এখানে।
পিছিয়ে নেই বিজেপিপন্থী প্রোপাগান্ডা পেজগুলোও। বিজেপি অফশিয়াল পেজেও নেহার বক্তব্যকে রাষ্ট্রবিরোধী আখ্যা করে প্রচার করা হয়েছে। তাছাড়া সিজেপির আন্দোলনকে দমাতে অসংখ্য আইডি থেকে অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশে হিন্দু গণহত্যা হয়েছে, নেহা এমন হিন্দু হত্যার অভ্যুত্থান ভারতে চান, ভারতকে টুকরো করতে চান—এমন নানা ন্যারেটিভ প্রচার করে যাচ্ছে। দেখুন এখানে এখানে এখানে এখানে
বোরার বক্তব্য নিয়ে বিরোধী শিবিরেও ভিন্ন প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। আম আদমি পার্টির দিল্লি শাখার সভাপতি সৌরভ ভরদ্বাজ মন্তব্যটিকে নেহা বোরার ব্যক্তিগত মতামত হিসেবে উল্লেখ করেন। নেহা প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “এটি নেহা বোরার ব্যক্তিগত মতামত হতে পারে। আমার মতে, ভারতের জেন-জি শহীদ-এ-আজম ভগৎ সিংয়ের আদর্শে অনুপ্রাণিত।”
নেহা বোরার বক্তব্যকে কেন্দ্র করে ভারতের রাজনৈতিক অঙ্গনে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তাতে বাংলাদেশের জুলাই অভ্যুত্থান এখন দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনীতিরও আলোচ্য বিষয় হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশের আন্দোলন থেকে অনুপ্রেরণা নেওয়ার বক্তব্যকে বিজেপি নেতারা সরকার পরিবর্তনের ষড়যন্ত্র হিসেবে ব্যাখ্যা করছেন। অন্যদিকে, বিজেপিপন্থী প্রচারমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিভিন্ন পেজে বিষয়টি নিয়ে নানা দাবি ও বয়ান ছড়ানো হচ্ছে। ফলে নেহার বক্তব্যের মূল বক্তব্যের পাশাপাশি সেটিকে ঘিরে তৈরি হওয়া রাজনৈতিক ব্যাখ্যা ও প্রচারের ধরনও এখন বিতর্কের কেন্দ্রে।
প্রসঙ্গত, গতকাল দিল্লিতে ককরোচ জনতা পার্টির (CJP) ‘লেহরা দো তিরঙ্গা’ কর্মসূচি শুরুর আগেই পুলিশি বাধায় ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ এবং ভোটার তালিকা সংশোধন (SIR) নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ তুলে এই বিক্ষোভের ডাক দেওয়া হয়েছিল। কর্মসূচিতে যোগ দেওয়ার পথে CJP প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে গ্রেপ্তার করা হয়, অন্যদিকে আটক হওয়ার প্রায় ১২ ঘণ্টা পর মুক্তি পান অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি নেহা বোরা। দিল্লি পুলিশ অভিজিৎকে শান্তিভঙ্গের আশঙ্কায় প্রতিরোধমূলক ধারায় আটক করেছে বলে জানিয়েছে।