অনলাইন ব্যঙ্গাত্মক পেজ থেকে শুরু হওয়া ককরোচ জনতা পার্টির আন্দোলন কীভাবে জাতীয় রাজনীতিতে চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠল? আন্দোলন দমনে ইন্টারনেট বন্ধ ও গণ-আটকের মতো পদক্ষেপ কি সরকারের বিরুদ্ধে তরুণদের ক্ষোভ আরও বাড়াবে?
শ্যাম কুমার: ককরোচ জনতা পার্টির আন্দোলনকে নিছক একটি অনলাইন ব্যঙ্গাত্মক উদ্যোগ হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এর মধ্যে ভারতের তরুণ প্রজন্মের জমে থাকা ক্ষোভ, কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা, প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় অনিয়মের অভিযোগ এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহি নিয়ে ক্রমবর্ধমান প্রশ্নের প্রতিফলন রয়েছে। ডিজিটাল মাধ্যম এখন এমন একটি রাজনৈতিক পরিসর তৈরি করেছে, যেখানে প্রচলিত রাজনৈতিক দলের সাংগঠনিক কাঠামোর বাইরে থেকেও তরুণেরা নিজেদের বক্তব্য তুলে ধরতে এবং দ্রুত জনমত সংগঠিত করতে পারছেন।
বিজেপির জন্য এখানেই বড় চ্যালেঞ্জ। গত এক দশকে দলটি নির্বাচনী প্রচার, সামাজিক মাধ্যমের ব্যবহার এবং রাজনৈতিক বয়ান নির্মাণে উল্লেখযোগ্য দক্ষতা দেখিয়েছে। কিন্তু যে ডিজিটাল পরিসর একসময় তাদের রাজনৈতিক প্রচারের গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার ছিল, সেই একই পরিসর এখন সরকারের নীতির সমালোচনা এবং বিরোধী জনমত গঠনের ক্ষেত্র হয়ে উঠতে পারে। কোনো রাজনৈতিক দলই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ওপর স্থায়ী নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে পারে না।
ভোটার তালিকার স্বচ্ছতা এবং নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠলে বিষয়টি আরও গুরুতর হয়ে ওঠে। কারণ গণতন্ত্রে নির্বাচন শুধু নির্দিষ্ট সময় অন্তর ভোটগ্রহণের প্রক্রিয়া নয়। নির্বাচনের আগে ভোটার তালিকা তৈরি, ভোটারদের নাম অন্তর্ভুক্তি, আপত্তি নিষ্পত্তি এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের স্বচ্ছতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। এসব বিষয়ে নাগরিকদের সংশয় থাকলে নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব হলো তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে সংশয় দূর করা।
সরকারের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের জবাব দেওয়ার পরিবর্তে যদি অতিরিক্ত পুলিশি নিয়ন্ত্রণ, নির্বিচার আটক কিংবা ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধের মতো ব্যবস্থা নেওয়া হয়, তাহলে তা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা আরও দুর্বল করতে পারে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষার প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করা যায় না। কিন্তু সেই যুক্তিতে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং রাজনৈতিক সংগঠনের অধিকার খর্ব করা গ্রহণযোগ্য নয়।
আমার মতে, বিজেপি সরকারের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, তারা প্রায়ই রাজনৈতিক অসন্তোষকে প্রশাসনিক সমস্যা হিসেবে দেখতে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে। অথচ কর্মসংস্থান, শিক্ষা, নির্বাচনী স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহির মতো প্রশ্নের সমাধান পুলিশি ব্যবস্থায় সম্ভব নয়। তরুণদের ক্ষোভকে দেশবিরোধিতা বা রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের তকমা দিয়ে খারিজ করার পরিবর্তে সরকারকে তাদের প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে। অন্যথায় আজকের আন্দোলন আগামী দিনে আরও বিস্তৃত রাজনৈতিক অসন্তোষের ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে।
তরুণদের বিকেন্দ্রীভূত আন্দোলনের মুখে বিজেপি কি তার সাংগঠনিক কাঠামো বদলাতে বাধ্য হচ্ছে? পরিস্থিতি সামাল দিতে দলটি কী ধরনের কৌশল নিচ্ছে?
শ্যাম কুমার: বিজেপির সাংগঠনিক শক্তি অস্বীকার করার কোনো কারণ নেই। আরএসএসের দীর্ঘদিনের সাংগঠনিক নেটওয়ার্ক, বুথস্তরের কর্মী, নির্বাচনী ব্যবস্থাপনা এবং ডিজিটাল প্রচারব্যবস্থা দলটিকে শক্তিশালী করেছে। কিন্তু সাংগঠনিক শক্তি থাকা মানেই সমাজের প্রতিটি অংশের ওপর রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা সম্ভব, এমন নয়। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের রাজনৈতিক আচরণ অনেক বেশি পরিবর্তনশীল।
বিজেপির সামনে এখন দ্বিমুখী সমস্যা। একদিকে, দলটির নেতৃত্ব হিন্দুত্ব, জাতীয়তাবাদ এবং শক্তিশালী কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের ওপর নির্ভর করে নিজেদের রাজনৈতিক ভিত্তি ধরে রাখতে চায়। অন্যদিকে, তরুণদের একটি অংশ কর্মসংস্থান, শিক্ষার সুযোগ, সরকারি নিয়োগে স্বচ্ছতা, মূল্যবৃদ্ধি এবং নাগরিক অধিকার নিয়ে সরাসরি প্রশ্ন তুলছে। এই প্রশ্নগুলোকে কেবল সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদের বয়ান দিয়ে সামাল দেওয়া কঠিন।
আমার মতে, বিজেপির রাজনৈতিক কৌশলের একটি বড় সীমাবদ্ধতা হলো, তারা সমালোচনাকে অনেক সময় নিজেদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র হিসেবে ব্যাখ্যা করে। বিরোধী দল, ছাত্র সংগঠন, সাংবাদিক কিংবা নাগরিক আন্দোলনের প্রশ্নকে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা হিসেবে দেখার পরিবর্তে গণতান্ত্রিক জবাবদিহির অংশ হিসেবে গ্রহণ করা উচিত। একটি সুস্থ গণতন্ত্রে সরকারকে প্রশ্ন করা অপরাধ নয়; বরং সেই প্রশ্নের উত্তর দেওয়াই সরকারের দায়িত্ব।
এখানে আরও একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। তরুণদের আন্দোলন সবসময় প্রচলিত রাজনৈতিক নেতৃত্বের নিয়ন্ত্রণে থাকে না। তারা কোনো দলের পতাকা ছাড়াই আন্দোলন গড়ে তুলতে পারে, আবার নির্দিষ্ট দাবি পূরণ না হলে দ্রুত বৃহত্তর রাজনৈতিক প্রতিবাদেও যুক্ত হতে পারে। ফলে বিজেপি যদি মনে করে, সাংগঠনিক শক্তি ও নির্বাচনী প্রচারের মাধ্যমে প্রতিটি অসন্তোষ নিয়ন্ত্রণ সম্ভব, তাহলে সেটি হবে রাজনৈতিক বাস্তবতার ভুল মূল্যায়ন।
দিল্লির সিজেপি আন্দোলন, বাংলাদেশের জুলাই আন্দোলন এবং নেপালের জেন-জি আন্দোলনের মধ্যে কী ধরনের সাদৃশ্য দেখতে পাচ্ছেন? বিজেপি সরকার কি এই ঘটনাগুলো থেকে কোনো শিক্ষা নিতে পারে?
শ্যাম কুমার: এই আন্দোলনগুলোর মধ্যে প্রধান সাদৃশ্য হলো, তরুণ প্রজন্মের মধ্যে প্রচলিত রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও ক্ষমতাকাঠামোর বিরুদ্ধে ক্রমবর্ধমান অসন্তোষ। তবে এগুলো নিজ নিজ দেশ অনুযায়ী আলাদা। এটা বাংলাদেশ বা নেপালের সঙ্গে মেলালে হবে না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে হাতিয়ার করে তরুণেরা দ্রুত সংগঠিত হচ্ছে এবং কর্মসংস্থান, দুর্নীতি, গণতান্ত্রিক অধিকার ও রাষ্ট্রীয় জবাবদিহির প্রশ্নে সরাসরি প্রতিবাদ জানাচ্ছে। বাংলাদেশের জুলাই আন্দোলন, নেপালের জেন-জি আন্দোলন এবং দিল্লির সিজেপি আন্দোলনের প্রেক্ষাপট আলাদা হলেও এগুলো শাসনব্যবস্থার প্রতি আস্থার প্রশ্নকে সামনে নিয়ে এসেছে।
বিজেপি সরকারের বোঝা উচিত, নির্বাচনী সংখ্যাগরিষ্ঠতা মানেই জনগণের প্রতিটি প্রশ্ন উপেক্ষা করার অধিকার নয়। আন্দোলন দমনে পুলিশি ব্যবস্থা কিংবা সমালোচকদের রাজনৈতিকভাবে আক্রমণ করার পরিবর্তে সরকারের উচিত স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা। তরুণদের দাবি উপেক্ষা করলে অসন্তোষ আরও গভীর হতে পারে। গণতন্ত্রের শক্তি বিরোধীদের কণ্ঠরোধে নয়, বরং সমালোচনা গ্রহণ করে সমস্যার সমাধান করার সক্ষমতায় নিহিত।
নির্বাচনী সাফল্যের বাইরে বিজেপির সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আধিপত্যকে কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন? এই আধিপত্য কি ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ ও বহুত্ববাদী রাজনৈতিক কাঠামোর জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে? সিজেপির এই আন্দোলন ২০২৯ সালের নির্বাচনে কী ভূমিকা রাখবে?
শ্যাম কুমার: বিজেপির রাজনৈতিক উত্থান বুঝতে হলে শুধু নির্বাচনী ফলাফল বিশ্লেষণ করলে চলবে না। গত কয়েক দশকে ভারতের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিসরে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘটেছে। বিজেপি এবং বৃহত্তর সঙ্ঘ পরিবার দীর্ঘদিন ধরে হিন্দুত্বকে জাতীয় পরিচয়ের কেন্দ্রীয় উপাদান হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করেছে। এই প্রচেষ্টা নির্বাচনী রাজনীতির পাশাপাশি শিক্ষা, সংস্কৃতি, ইতিহাসের ব্যাখ্যা এবং গণপরিসরের রাজনৈতিক ভাষাকেও প্রভাবিত করেছে।
বিজেপির সাফল্যের একটি কারণ হলো, তারা সাংস্কৃতিক পরিচয়কে কল্যাণমূলক প্রকল্প, জাতীয়তাবাদ এবং শক্তিশালী নেতৃত্বের ধারণার সঙ্গে যুক্ত করতে পেরেছে। বিভিন্ন সামাজিক শ্রেণি ও জাতিগত গোষ্ঠীর মধ্যে নিজেদের সমর্থন বাড়ানোর জন্য দলটি বিভিন্ন রাজনৈতিক কৌশল নিয়েছে। ফলে বিজেপির ভোটভিত্তি কেবল একটি সামাজিক গোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি।
কিন্তু এই রাজনৈতিক সাফল্যের আড়ালে একটি মৌলিক সাংবিধানিক প্রশ্ন রয়েছে। ভারত কি এমন একটি রাষ্ট্র থাকবে, যেখানে প্রত্যেক নাগরিকের ধর্মীয় পরিচয় নির্বিশেষে সমান মর্যাদা থাকবে, নাকি রাষ্ট্রের জাতীয় পরিচয় ক্রমে একটি সংখ্যাগরিষ্ঠ ধর্মীয় পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়বে? আমার মতে, বিজেপির হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির সবচেয়ে বড় সমস্যা এখানেই। সাংস্কৃতিক পরিচয় উদ্যাপন করা এবং রাষ্ট্রের নাগরিকত্বকে একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় পরিচয়ের অধীন করে ফেলা এক বিষয় নয়।
ভারতের সংবিধান ধর্মীয় স্বাধীনতা, সমতা, মতপ্রকাশের অধিকার এবং বহুত্ববাদের ভিত্তিতে রাষ্ট্রকে পরিচালিত করার নীতি প্রতিষ্ঠা করেছে। সেই কাঠামোয় সংখ্যাগরিষ্ঠের সংস্কৃতির গুরুত্ব থাকতে পারে; কিন্তু সংখ্যালঘুদের অধিকার বা নাগরিক মর্যাদা সংখ্যাগরিষ্ঠের রাজনৈতিক অনুমোদনের ওপর নির্ভর করতে পারে না।
কল্যাণমূলক প্রকল্পের সুবিধা প্রদান সরকারের দায়িত্ব। সেই সুবিধাকে কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের প্রতি আনুগত্যের সঙ্গে যুক্ত করে দেখানো উচিত নয়। নাগরিকরা রাষ্ট্রের কাছ থেকে অধিকার হিসেবে পরিষেবা পাবেন; রাজনৈতিক আনুগত্যের বিনিময়ে নয়। সুতরাং বিজেপির সাংস্কৃতিক আধিপত্যের প্রশ্নটি কেবল একটি দলের জনপ্রিয়তার প্রশ্ন নয়। এতে ভারতের গণতান্ত্রিক চরিত্র, নাগরিকত্বের ধারণা এবং সংবিধানের ধর্মনিরপেক্ষ ভিত্তি কতটা অক্ষুণ্ণ থাকবে, সেই বৃহত্তর প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত।
বিজেপি তার রাজনৈতিক শক্তির ভিত্তি হিসেবে উন্নয়ন ও জাতীয়তাবাদের কথা বলে। সমালোচকেরা ধর্মীয় মেরুকরণকে দলটির অন্যতম প্রধান কৌশল হিসেবে চিহ্নিত করেন। ২০২৬ সালের রাজনৈতিক বাস্তবতায় কোন বয়ান ভোটারদের বেশি প্রভাবিত করছে?
শ্যাম কুমার: এই দুই বিষয়কে সম্পূর্ণ আলাদা করে দেখা যায় না। বিজেপি উন্নয়ন, জাতীয় নিরাপত্তা, সাংস্কৃতিক গৌরব এবং হিন্দুত্বের রাজনীতিকে অনেক সময় একই রাজনৈতিক বয়ানের মধ্যে উপস্থাপন করে। ফলে ভোটারদের কাছে উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি এবং সংখ্যাগরিষ্ঠের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের প্রশ্ন পাশাপাশি উপস্থিত থাকে। তবে এর অর্থ এই নয় যে, ভারতের সব ভোটার একইভাবে এই বয়ান গ্রহণ করেন।
সরকারের উন্নয়নসংক্রান্ত দাবিকে মূল্যায়ন করতে হলে নির্দিষ্ট তথ্যের দিকে তাকাতে হবে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, পরিকাঠামো নির্মাণ, ডিজিটাল পরিষেবা কিংবা কল্যাণমূলক প্রকল্পের অগ্রগতি অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু একই সঙ্গে কর্মসংস্থানের মান, বাস্তব মজুরি, মূল্যবৃদ্ধি, বৈষম্য, কৃষকের আয় এবং তরুণদের ভবিষ্যৎ নিয়েও প্রশ্ন তুলতে হবে। বড় প্রকল্পের প্রচার এবং সাধারণ মানুষের জীবনে তার বাস্তব প্রভাব এক নয়।
বিজেপির রাজনৈতিক প্রচারে উন্নয়নকে প্রায়ই নেতৃত্বের সাফল্যের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করা হয়। কিন্তু একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে উন্নয়ন কোনো ব্যক্তিবিশেষ বা দলের একক সম্পত্তি নয়। সরকারি প্রকল্পের অর্থ আসে জনগণের কর ও রাষ্ট্রীয় সম্পদ থেকে। তাই প্রকল্পের সাফল্য মূল্যায়নে স্বচ্ছতা, বাস্তব উপকারভোগীর সংখ্যা এবং দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক প্রভাব বিবেচনা করা প্রয়োজন।
জাতীয়তাবাদের নামে নাগরিকদের মধ্যে বিভাজন তৈরি হলে তা দীর্ঘমেয়াদে দেশের সামাজিক সংহতিকে দুর্বল করতে পারে। দেশপ্রেমের অর্থ সরকারের প্রতিটি সিদ্ধান্ত সমর্থন করা নয়। বরং রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো স্বচ্ছভাবে কাজ করছে কি না, নাগরিকের অধিকার সুরক্ষিত কি না এবং সরকার জনস্বার্থে কাজ করছে কি না, সেই প্রশ্ন তোলাও গণতান্ত্রিক দায়িত্ব।
তাই আমার মূল্যায়ন, বিজেপির রাজনৈতিক শক্তি শুধু উন্নয়ন কিংবা শুধু ধর্মীয় মেরুকরণের ওপর নির্ভরশীল নয়। এই দুইয়ের সমন্বিত রাজনৈতিক বয়ান দলটিকে সুবিধা দিয়েছে। কিন্তু সেই বয়ানের স্থায়িত্ব নির্ভর করবে বাস্তব অর্থনৈতিক ফলাফল, সামাজিক সম্প্রীতি এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি মানুষের আস্থার ওপর।
নরেন্দ্র মোদি সরকার ‘এক দেশ, এক নির্বাচন’ বাস্তবায়নের পক্ষে। এই প্রস্তাব কি প্রশাসনিক দক্ষতা বাড়ানোর সংস্কার, নাকি রাজ্যগুলোর রাজনৈতিক স্বায়ত্তশাসন কমিয়ে কেন্দ্রীয় ক্ষমতা আরও শক্তিশালী করার পথ?
শ্যাম কুমার: ‘এক দেশ, এক নির্বাচন’ নিয়ে বিতর্কটি ভারতের সংসদীয় গণতন্ত্র এবং যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর ভবিষ্যতের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। বিজেপি ও কেন্দ্রীয় সরকারের যুক্তি হলো, একই সময়ে লোকসভা ও বিধানসভা নির্বাচন আয়োজন করলে নির্বাচনী ব্যয় কমবে; প্রশাসনিক কাজে বিঘ্ন কম হবে এবং সরকার দীর্ঘমেয়াদি নীতি বাস্তবায়নে বেশি সময় পাবে। এই যুক্তিগুলোকে একেবারে অগ্রাহ্য করা যায় না। কিন্তু কোনো প্রস্তাবের প্রশাসনিক সুবিধা থাকলেই সেটি সাংবিধানিকভাবে সর্বোত্তম সমাধান হয়ে যায় না।
বিজেপির বিরুদ্ধে বিরোধীদের প্রধান উদ্বেগ হলো, গত কয়েক বছরে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ক্ষমতা ক্রমে কেন্দ্রের হাতে কেন্দ্রীভূত হওয়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। বিরোধীদের অভিযোগ, কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার ব্যবহার, রাজ্যপালের ভূমিকা এবং রাজ্যগুলোর সঙ্গে আর্থিক ও প্রশাসনিক সম্পর্কের প্রশ্নে ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। প্রতিটি অভিযোগের পৃথক বিচার প্রয়োজন, কিন্তু বৃহত্তর প্রশ্নটি উপেক্ষা করা যায় না—কেন্দ্রীয় সরকার কি রাজ্যগুলোকে সমান সাংবিধানিক অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করছে?
আমার মতে, ভারতের গণতন্ত্রের শক্তি শুধু একটি শক্তিশালী কেন্দ্রীয় সরকারে নয়; বরং কেন্দ্র, রাজ্য, সংসদ, বিচারব্যবস্থা, নির্বাচন কমিশন এবং নাগরিক সমাজের মধ্যে কার্যকর ভারসাম্যের ওপর নির্ভরশীল। ‘এক দেশ, এক নির্বাচন’ যদি বাস্তবায়ন করতে হয়, তবে তার আগে বিস্তৃত রাজনৈতিক ঐকমত্য, সাংবিধানিক সুরক্ষা এবং রাজ্যগুলোর মতামত নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
কোনো নির্বাচনী সংস্কারের উদ্দেশ্য হওয়া উচিত গণতন্ত্রকে আরও অংশগ্রহণমূলক, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করা—ক্ষমতাকে একটি কেন্দ্রের হাতে আরও বেশি কেন্দ্রীভূত করা নয়। বিজেপি যদি প্রশাসনিক দক্ষতার যুক্তি দেখিয়ে এমন কোনো ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে চায়, যা আঞ্চলিক রাজনৈতিক বৈচিত্র্য দুর্বল করে, তাহলে তা ভারতের যুক্তরাষ্ট্রীয় গণতন্ত্রের জন্য উদ্বেগের কারণ হবে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে ভারতের নির্বাচনী ব্যবস্থায় ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর-এর ভবিষ্যৎ কী বলে মনে করেন? এই প্রক্রিয়ায় ভোটার তালিকার নির্ভুলতা বাড়ানোর পাশাপাশি নাগরিকদের ভোটাধিকার সুরক্ষিত রাখা এবং নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করতে কী ধরনের সংস্কার প্রয়োজন?
শ্যাম কুমার: এসআইআরের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে এই প্রক্রিয়া কতটা স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও অন্তর্ভুক্তিমূলকভাবে পরিচালিত হচ্ছে, তার ওপর। ভোটার তালিকা হালনাগাদ করা নির্বাচন কমিশনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। ১৩ কোটি ভোটারের নাম কাটার অভিযোগটির নিষ্পত্তি করতে হবে। প্রক্রিয়ায় প্রকৃত ভোটারদের নাম বাদ পড়ার ঝুঁকি থাকলে; বিশেষ করে দরিদ্র, পরিযায়ী শ্রমিক ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে, তা গুরুতর উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠতে পারে। বিজেপিশাসিত কেন্দ্রীয় সরকারের আমলে নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা নিয়েও রাজনৈতিক বিতর্ক রয়েছে। তাই এসআইআরকে রাজনৈতিক বিতর্কের ঊর্ধ্বে রাখতে হলে নাম বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্তে যথাযথ নোটিস, সহজ আপিলের সুযোগ, প্রকাশ্য তথ্য এবং স্বাধীন নজরদারি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। ভোটার তালিকা সংশোধনের উদ্দেশ্য হওয়া উচিত প্রতিটি যোগ্য নাগরিকের ভোটাধিকার রক্ষা করা, কাউকে নির্বাচনী প্রক্রিয়ার বাইরে ঠেলে দেওয়া নয়।