মার্কিন কংগ্রেসের প্রতিনিধি ইলহান ওমরের ওয়াশিংটন ডিসির এলাকার বাড়িতে তল্লাশি চালিয়েছেন দেশটির হোমল্যান্ড সিকিউরিটি ইনভেস্টিগেশনের (এইচএসআই)
সদস্যরা। একটি ফৌজদারি তদন্তের অংশ হিসেবে আদালতের পরোয়ানা নিয়ে এ অভিযান চালানো হয়েছে বলে জানিয়েছে মার্কিন বিচার বিভাগ।
সোমবার (১২ অক্টোবর) স্থানীয় সময় সকাল ৬টার দিকে ইলহান ওমরের বাড়িতে এ অভিযান শুরু হয়।
তবে তদন্তের ধরন বা অভিযোগের বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানায়নি মার্কিন বিচার বিভাগ। বর্তমানে কংগ্রেসের অধিবেশন বন্ধ থাকায় অভিযানের সময় ওমর বাড়িতে ছিলেন কি না, তা-ও স্পষ্ট নয়।
ডেমোক্র্যাট দলের সদস্য ও প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কড়া সমালোচক হিসেবে পরিচিত ইলহান ওমর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ অভিযানকে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে লক্ষ্যবস্তু বানানোর চেষ্টা বলে অভিহিত করেছেন।
তিনি লিখেছেন, ট্রাম্প ১০ বছর ধরে ভিত্তিহীন মিথ্যা ও অপপ্রচারের মাধ্যমে আমাকে লক্ষ্যবস্তু বানিয়েছেন। এটি তার সর্বশেষ পদক্ষেপ। এভাবে আমাকে চুপ করানো না।
সোমবার সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় ট্রাম্প অবশ্য ওমরের বিরুদ্ধে বিচার বিভাগের তদন্তের সঙ্গে নিজের কোনো সম্পৃক্ততা নেই বলে দাবি করেন। একই সঙ্গে তিনি ওমরকে ‘অভিযোগকারী’ ও ‘ভয়ংকর ব্যক্তি’ বলে মন্তব্য করেন।
সোমালিয়ান বংশোদ্ভূত এই কংগ্রেস সদস্যকে নিয়ে ট্রাম্প বলেন, ‘তিনি এমন একটি দেশ থেকে এসেছেন, যে দেশ আসলে কোনো দেশই নয়। এরপরও তিনি আমাদের সংবিধান নিয়ে অভিযোগ করেন।’
ওমরের যোগাযোগবিষয়ক পরিচালক জ্যাকলিন রজার্স সোমবার সকালে চালানো তল্লাশিকে ট্রাম্প প্রশাসনের ‘ক্ষমতার চরম অপব্যবহার’ বলে উল্লেখ করেছেন। তার ভাষ্য, কংগ্রেস সদস্য ওমর কোনো অন্যায় করেননি।
বিবিসির একটি দল ওমরের বাড়ির বাইরে কয়েকজন কর্মকর্তাকে দেখতে পেয়েছে। তাদের কয়েকজনকে বাক্স নিয়ে একটি ভ্যানে তুলতে দেখা যায়।
ফক্স নিউজের প্রথম প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওমর শৈশবে থাকা অবস্থায় তার প্রয়াত বাবা অভিবাসনসংক্রান্ত যেসব নথি জমা দিয়েছিলেন, সেগুলোকে কেন্দ্র করে তদন্তটি চলছে। তবে এ বিষয়ে মার্কিন কর্তৃপক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত জানায়নি।
আগামী নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের মাত্র ২২ দিন আগে এই তল্লাশি চালানো হয়েছে। ওই নির্বাচনের মাধ্যমে আগামী দুই বছরের জন্য কংগ্রেসে ক্ষমতার ভারসাম্য নির্ধারিত হবে। অভিযানের সময় নিয়ে ওমরের ডেমোক্র্যাট সহকর্মীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
মার্কিন বিচার বিভাগের দীর্ঘদিনের নীতি হলো, নির্বাচনে প্রভাব ফেলার উদ্দেশ্যে বা কোনো প্রার্থীকে অসুবিধায় ফেলার চেষ্টা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে এমন আইন প্রয়োগ বিরত থাকা।
প্রতিনিধি পরিষদের শীর্ষ ডেমোক্র্যাট নেতারা এক বিবৃতিতে বলেছেন, ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরে ওমরকে ‘জঘন্যভাবে ব্যক্তিগত আক্রমণ ও ভিত্তিহীন অভিযোগের’ লক্ষ্যবস্তু বানিয়েছেন।
বিবৃতিতে তারা বলেন, মধ্যবর্তী নির্বাচনের ৩০ দিনেরও কম সময় আগে ব্যাপকভাবে বিতর্কিত বাহিনী একজন নির্বাচিত কংগ্রেস সদস্য ও তার পরিবারের বাড়িতে গিয়ে হাজির হয়েছে।
এর আগেও রিপাবলিকানরা ওমরের অভিবাসনসংক্রান্ত নথি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। চলতি বছরের শুরুর দিকে দক্ষিণ ক্যারোলাইনার কংগ্রেস সদস্য ন্যান্সি মেস তার নথি তলবের জন্য একটি সমন জারির উদ্যোগ নিয়েছিলেন। তবে সেই উদ্যোগ সফল হয়নি।
গত মাসে মার্কিন হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগের মন্ত্রী মার্কওয়েইন মুলিন এক রক্ষণশীল ধারার পডকাস্টে ওমরকে নিয়ে বলেন, ‘কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে।’ একই সময়ে হোয়াইট হাউসের সীমান্তবিষয়ক প্রধান টম হোম্যান ফক্স নিউজকে জানান, অভিবাসন আইন লঙ্ঘনের অনির্দিষ্ট কিছু অভিযোগে ওমরের বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে।
ওমর গত মাসে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেন। এক ইমেইলে তিনি বলেন, আমি আবারও স্পষ্ট করে বলতে চাই, এসব তদন্ত নিয়ে আমি মোটেও উদ্বিগ্ন নই। কারণ, এগুলো সম্পূর্ণ সাজানো।
ট্রাম্প এর আগেও ওমরকে সোমালিয়ায় ফিরে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন এবং তাকে বহিষ্কারের দাবি তুলেছেন।
সোমালি-আমেরিকান সম্প্রদায়কেও একাধিকবার আক্রমণ করেছেন ট্রাম্প। গত সপ্তাহে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি লেখেন, মিনেসোটা ‘সোমালি অভিবাসীদের দখলে চলে যাচ্ছে’ এবং সেখানকার বাসিন্দাদের এর বিরুদ্ধে লড়াই করতে হবে।
সোমবারের তল্লাশিকে স্বাগত জানিয়েছেন কয়েকজন রিপাবলিকান নেতা। মিনেসোটার আরেক প্রতিনিধি টম এমার বলেন, ‘কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নন। এই অভিযান ও তদন্ত সম্পর্কে আরও তথ্য জানার অপেক্ষায় আছি। জবাবদিহি নিশ্চিত করা হবে।’
ইলহান ওমর মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদে নির্বাচিত প্রথম সোমালি-আমেরিকান। তিনি মিনিয়াপোলিস এলাকার একটি আসনের প্রতিনিধিত্ব করেন। মিশিগানের কংগ্রেস সদস্য রাশিদা তালিবের সঙ্গে তিনি দুই মুসলিম নারী হিসেবে মার্কিন কংগ্রেসে নির্বাচিত হয়েছিলেন। দুই বছর আগে পুনর্নির্বাচনে তিনি ৭৪ শতাংশ ভোট পেয়েছিলেন।
অভিযানের সমালোচনা করেছেন মিনেসোটার শীর্ষ ডেমোক্র্যাট নেতারাও। রাজ্যটির গভর্নর টিম ওয়ালজ বলেন, আমেরিকানরা বিষয়টি স্পষ্টভাবেই বুঝতে পারছেন নির্বাচনের কয়েক সপ্তাহ আগে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে লক্ষ্যবস্তু বানাতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার ক্ষমতার অপব্যবহার করছেন।
মিনেসোটার সিনেটর টিনা স্মিথও এ ঘটনাকে নির্বাচনে হস্তক্ষেপের একটি চেষ্টা বলে মন্তব্য করেছেন।