সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে ইরান-সমর্থিত হুতি যোদ্ধাদের ধারাবাহিক হামলায় নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক চাপে পড়েছেন যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান। ৪১ বছর বয়সী এই যুবরাজ বাংকার-সুবিধাসহ কঠোর নিরাপত্তাবেষ্টিত বিভিন্ন প্রাসাদের মধ্যে যাতায়াত করছেন। তার নিরাপত্তায় নিয়োজিত রয়েছে বাছাই করা একটি দল। মঙ্গলবারের পর তাকে আর জনসমক্ষে দেখা যায়নি। সেদিন তিনি জাতীয় রক্তদান কর্মসূচিতে সমর্থন জানাতে রক্তদান করেন। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বরাতে এ তথ্য জানিয়েছে দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল।
শনিবার (১০ অক্টোবর) সৌদি আরবের রাজধানীর আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হুতিদের অন্তত একটি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে। এতে অন্তত ১৩ জন নিহত এবং কয়েক শ মানুষ আহত হন। আহতদের অনেকের অবস্থা গুরুতর। ইরান যুদ্ধ-সংশ্লিষ্ট সংঘাতগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র ও উপসাগরীয় অঞ্চলে দেশটির মিত্রদের ওপর চালানো হামলাগুলোর মধ্যে এটিই ছিল সবচেয়ে প্রাণঘাতী।
রোববার হুতিদের এক সামরিক মুখপাত্র আবারও সৌদি বিমানবন্দরগুলোকে হামলার লক্ষ্যবস্তু করার হুঁশিয়ারি দেন। সৌদি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আরও হামলা প্রতিহত করার জন্য প্রয়োজনীয় ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধক ব্যবস্থার মজুত কমে আসছে। দেশটির বিশাল ভূখণ্ডের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলো সুরক্ষিত রাখতে আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা বিভিন্ন স্থানে সরিয়ে নিতে হচ্ছে। প্রাসাদ ও জ্বালানি অবকাঠামোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।
অর্থনীতি ও উচ্চাভিলাষী প্রকল্পে চাপ
বছরের শুরুতে সৌদি আরবকে তুলনামূলক সুবিধাজনক অবস্থানে মনে হচ্ছিল। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকের জন্য হোয়াইট হাউস সফরে গিয়ে উষ্ণ অভ্যর্থনা পেয়েছিলেন যুবরাজ। ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পরও হরমুজ প্রণালির বাধা এড়িয়ে পাইপলাইনের মাধ্যমে লোহিত সাগর পর্যন্ত তেল পরিবহন করতে পেরেছিল সৌদি আরব। তেল বিক্রি ও দাম বেড়ে যাওয়ায় দেশটি বাড়তি সুবিধাও পায়।
কিন্তু পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায়। জুলাইয়ে হুতিরা সৌদি আরবের বিরুদ্ধে সামুদ্রিক অবরোধের ঘোষণা দেয়। এতে লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচল ঝুঁকির মুখে পড়ে। সেপ্টেম্বরে সৌদি আরবের প্রধান পূর্ব-পশ্চিম তেল পাইপলাইনে হামলা হয়। এরপর হুতিরা দেশটির বিমান চলাচল খাতকে লক্ষ্যবস্তু করে। রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অন্তত চারবার হামলা চালিয়েছে তারা।
এই সংঘাত সৌদি আরবের তেলনির্ভর অর্থনীতিকে বহুমুখী করার পরিকল্পনাকেও ঝুঁকির মুখে ফেলেছে। বছরের প্রথম দুই প্রান্তিকে দেশটিতে বিদেশি বিনিয়োগ কমেছে। বিনিয়োগের পরিমাণ যুবরাজের ২০৩০ সালের লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক পিছিয়ে রয়েছে। প্রতিরক্ষা ও অবকাঠামো খাতে ব্যয় বাড়ায় অর্থনীতির রূপান্তরে প্রয়োজনীয় অর্থের জোগান কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) কেন্দ্র হয়ে ওঠার পরিকল্পনাও নতুন ঝুঁকিতে পড়েছে, কারণ ডেটা সেন্টারগুলো হামলার লক্ষ্যবস্তু হতে পারে।
যুবরাজের উদ্যোগে নেয়া বড় বড় প্রকল্পের অনেকগুলো স্থগিত রয়েছে অথবা পর্যালোচনা করা হচ্ছে। জানুয়ারিতে সৌদি আরব ২০২৯ সালের এশিয়ান শীতকালীন গেমস আয়োজনের পরিকল্পনা থেকে সরে আসে। ২০৩০ সালের বিশ্ব এক্সপো এবং এর চার বছর পর ফুটবল বিশ্বকাপ আয়োজনের অর্থায়নের ব্যবস্থাও করতে হবে দেশটিকে।
ক্যাপিটাল ইকোনমিকসের তথ্য অনুযায়ী, বছরের প্রথম প্রান্তিকের তুলনায় দ্বিতীয় প্রান্তিকে সৌদি অর্থনীতির অ-তেল খাতের আকার ছোট হয়েছে। দেশটির অর্থ মন্ত্রণালয় ২০২৬ সালে মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) ৩ দশমিক ৬ শতাংশ সংকুচিত হওয়ার পূর্বাভাস দিচ্ছে। যুদ্ধের ব্যয়ে বাজেট ঘাটতিও বেড়েছে। মাসের শেষ দিকে নির্ধারিত একটি বড় আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ সম্মেলন নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
গত এক দশকে যুবরাজ মোহাম্মদ নিওমের মতো ভবিষ্যৎধর্মী শহর, রিয়াদে বিশাল ঘনকাকৃতির ভবন এবং মরুভূমিতে স্কি রিসোর্ট নির্মাণসহ বিভিন্ন উচ্চাভিলাষী প্রকল্পে বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করেছেন। এসব প্রকল্পের মোট ব্যয় ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। বছরে প্রায় ৩৫০ বিলিয়ন ডলারের বাজেট থাকা একটি সরকারের জন্য এই ব্যয় অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী। ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের ব্যয় ও অর্থনৈতিক ক্ষতি প্রকল্পগুলোর অর্থায়ন আরও কঠিন করে তুলছে।
হুতিদের হুমকি সম্পর্কে ভুল হিসাব?
২০১৫ সালে যুবরাজ মোহাম্মদ সৌদি আরবকে ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধে জড়ান। হুতিদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে তিনি ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারকে সমর্থন দেন। সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক হস্তক্ষেপের সময় চালানো ধ্বংসাত্মক বিমান হামলা সংঘাতকে আরও তীব্র করে। পরবর্তী সময়ে হুতিরা সৌদি আরবের তেল স্থাপনা ও রিয়াদের মতো শহরে হামলা চালায়। দুই পক্ষের লড়াই অচলাবস্থায় পৌঁছানোর পর ২০২২ সালে যুদ্ধবিরতি হয়।
নতুন করে সহিংসতা শুরুর আগে সৌদি কর্মকর্তাদের একাংশ মনে করেছিলেন, গত বছর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় হুতিরা উল্লেখযোগ্য সামরিক ক্ষতির মুখে পড়েছে। তারা ধারণা করেছিলেন, হুতিরা ইরানের স্বার্থের পরিবর্তে নিজেদের স্বার্থ বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেবে। কিন্তু সৌদি গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, ইরান হুতিদের যুদ্ধে যোগ দিতে সক্রিয়ভাবে চাপ দিচ্ছিল বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন।
আগস্টে লোহিত সাগরের প্রবেশমুখে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বাব আল-মানদেব প্রণালির কাছে উপকূলীয় এলাকা দখলে অভিযান চালায় হুতিরা। সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় সৌদি আরব ইয়েমেনে তার মিত্রদের সহায়তায় বিমান হামলা চালায়নি। তখন ইয়েমেনি মিত্ররা গুরুত্বপূর্ণ বন্দরনগরী মোখায় হুতিদের আক্রমণ ঠেকানোর চেষ্টা করছিল। শেষ পর্যন্ত শহরটি ও উপকূলের আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান হুতিদের দখলে চলে যায়। এতে সৌদি তেল পরিবহনের ওপর হুমকি বেড়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা ও কূটনৈতিক সমাধানের চেষ্টা
ট্রাম্পের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারে যুবরাজ মোহাম্মদ যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ১ ট্রিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তা সত্ত্বেও হুতিদের অগ্রযাত্রা ঠেকাতে সৌদি যুবরাজের সামরিক সহায়তার অনুরোধে যুক্তরাষ্ট্র এখন পর্যন্ত সাড়া দেয়নি। তবে দেশটি সামরিক উপদেষ্টা পাঠিয়েছে। ট্রাম্প বলেছেন, হুতিদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যোগাযোগ চলছে এবং সৌদি হামলায় যোগ দেয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেয়া হচ্ছে না।
সৌদি আরব তার সামরিক মিত্র পাকিস্তানের কাছে সহায়তা চেয়েছে এবং বিশ্বজুড়ে আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা সংগ্রহের চেষ্টা করছে। ইয়েমেনে নিজেদের মিত্রদের সহায়তায় বিদেশি যোদ্ধা নিয়োগের কথাও ভাবছে দেশটি। একই সঙ্গে সংঘাত নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে উঠতে পারে—এমন আশঙ্কায় কূটনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখছে সৌদি আরব।
রাইস বিশ্ববিদ্যালয়ের বেকার ইনস্টিটিউটের ফেলো ও পারস্য উপসাগরবিষয়ক বিশেষজ্ঞ ক্রিস্টিয়ান কোয়েটস উলরিখসেনের মতে, সৌদি নেতার সামনে ভালো বিকল্প খুব বেশি নেই। তার ভাষায়, যেকোনো সামরিক পাল্টা পদক্ষেপের ফলে এমন এক অসম সংঘাতে আরও গভীরভাবে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে, যেখানে হুতিরা উল্লেখযোগ্য ও প্রতীকী ক্ষয়ক্ষতি ঘটানোর সক্ষমতা দেখিয়েছে।