Image description

ইতালিতে পিৎজা শেফ হিসেবে কাজ করেন ঝিনাইদহের কালীগঞ্জের বাসিন্দা জুয়েল মোল্লা। তিনি নিয়মিত দেশে যাতায়াত করেন। ৫ অক্টোবর সর্বশেষ দেশে নামার পরপরই বিমানবন্দরের এক কর্মী তাকে দুই হাজার টাকায় লাগেজ ট্রলিতে তুলে দ্রুত বের করে দেওয়ার প্রস্তাব দেন। জুয়েল সেই প্রস্তাবে রাজি না হতেই শুরু হয় চরম দুর্ভোগ।

জুয়েল টাইমসকে বলেন, ‘যাত্রীর তুলনায় ট্রলি ছিল কম, সবাই হুমড়ি খেয়ে ট্রলি নিয়ে কাড়াকাড়ি করছিল।’

যাত্রীর তুলনায় জায়গার অভাব আর মাত্র আটটি কনভেয়ার বেল্ট থাকায় লাগেজ পেতে দেরি হওয়া শাহজালাল বিমানবন্দরের নিয়মিত ঘটনা। সে কারণে জুয়েলকেও বিমান থেকে নেমে সাড়ে তিন ঘণ্টার মতো অপেক্ষা করতে হয়েছে।

ওইদিন সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত বিভিন্ন দেশ থেকে আসা যাত্রীদের সঙ্গে কথা বলে টাইমস। এতে জানা যায়, বিমান থেকে নামার পর একজন যাত্রীর বোর্ডিং ব্রিজ পার হয়ে ইমিগ্রেশন, লাগেজ সংগ্রহ, কাস্টমস এবং আগমন গেট পার হয়ে মূল সড়কে পৌঁছাতে সাধারণ অবস্থায় ৪৫ মিনিট থেকে এক ঘণ্টার মতো সময় লাগার কথা। তবে ইমিগ্রেশন ও লাগেজ সরবরাহে অযাচিত ভোগান্তি এবং আধুনিক প্রযুক্তির অভাবের কারণে যাত্রীদের দুই থেকে চার ঘণ্টাও লেগে যায়।

সম্প্রতি তিন নারী যাত্রীকে বিদেশযাত্রায় বাধা দেওয়া এবং জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল দেশে ফেরার পর বিমানবন্দরের এই অব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়। তবে সারা বছর জুড়েই যাত্রীদের লাগেজ কেটে চুরি, লাগেজ পেতে বিলম্ব, ইমিগ্রেশনে দেরি, কর্মীদের দায়িত্বে অবহেলা ও অপেশাদার আচরণ নিয়ে ভুক্তভোগীদের করা ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়তে দেখা যায়।

তবে ইমিগ্রেশন কর্মকর্তাদের দাবি, মানবপাচার, বিদেশে বাংলাদেশিদের অবৈধভাবে বসবাস এবং অপরাধী ও সন্দেহভাজনদের শনাক্ত করতে প্রয়োজনে বাড়তি সতর্কতা নেওয়া হয়। আর এই বাড়তি তল্লাশি ও যাচাই-বাছাইয়ের কারণেই ইমিগ্রেশন শেষ হতে বেশি সময় লাগে।

ট্রলি সংকট

বছরে ৮০ লাখ যাত্রী ধারণক্ষমতার শাহজালাল বিমানবন্দরে গত বছর ১ কোটি ২৭ লাখ যাত্রী যাতায়াত করেছেন। প্রতিদিন এই বিমানবন্দরে ৩০ থেকে ৩৫ হাজার যাত্রী চলাচল করেন। তাদের জন্য বর্তমানে ৩ হাজার ৯২০টি ট্রলি রয়েছে, যার মধ্যে কিছু আবার নষ্ট থাকায় মেরামতে আছে। এক সঙ্গে চারটির বেশি উড়োজাহাজ নামলেই ট্রলি সংকট চরম আকার ধারণ করে।

বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) সেন্ট্রাল প্রকিউরমেন্ট, ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড স্টোর ইউনিটের পরিচালক আব্দুল করিম মোল্লা জানান, গাজীপুর মেশিন টুলস কারখানা থেকে ৫০০টি নতুন ট্রলি কেনার প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করা হয়েছে। চলতি মাসেই প্রথম চালানে ২০০টি ট্রলি আসার কথা থাকলেও তারা নির্দিষ্ট সময়ে তা দিতে ব্যর্থ হয়েছে।

ইমিগ্রেশনে অযাচিত প্রশ্ন ও হয়রানি

দীর্ঘ লাইন শেষে জুয়েল মোল্লা যখন ইমিগ্রেশন কাউন্টারে পৌঁছান, তখন তাকে প্রশ্ন করা হয় তিনি কেন বছরে তিনবার দেশে এসেছেন। এর জবাবে জুয়েল নিজের দেশে আসার কারণ জানাতে হবে কেন তা পাল্টা জানতে চান।

ইমিগ্রেশন পার হওয়ার পর লাগেজ বেল্টের কাছে সাদা পোশাকের এক ব্যক্তি আবার তার পাসপোর্ট দেখতে চেয়ে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাকে ডাকছেন বলে জানান। জুয়েল ইমিগ্রেশন ছাড়পত্র দেওয়ার পর আবার পাসপোর্ট দেখার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।

তবে ইমিগ্রেশন পুলিশের সুপার মো. মনিরুজ্জামান টাইমসকে বলেন, তিনি এই সাদা পোশাকের তল্লাশি সম্পর্কে কিছুই জানেন না।

 

ইমিগ্রেশনে অযাচিত প্রশ্ন ও খারাপ আচরণের বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছে। সম্প্রতি অবিবাহিত তিন নারীকে নেপাল যেতে বাধা দেওয়ার পর তারা হাইকোর্টে রিট আবেদন করেছেন। অন্যদিকে মো. মনিরুজ্জামানের দাবি, সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার জন্যই অনেকে এমন ভিত্তিহীন অভিযোগ করেন।

ই-গেটের টাকা জলে

২০১৮ সালের জুলাই মাসে একটি প্রকল্পের অধীনে শাহজালাল বিমানবন্দরে প্রথমে ৪৫টি এবং পরে আরও সাতটি ই-গেট বসানো হয়। উদ্দেশ্য ছিল, ই-পাসপোর্ট ও ই-ভিসা ব্যবহারকারী যাত্রীদের ইমিগ্রেশন সহজ করা। বর্তমানে স্বয়ংক্রিয় পাসপোর্ট রিডারসহ ২৬টি ই-গেট রয়েছে, যা মাত্র ১৮ সেকেন্ডে তথ্য যাচাই করতে সক্ষম। কিন্তু মাঝেমধ্যে পরীক্ষামূলকভাবে চালানো ছাড়া বহির্গামী যাত্রীদের জন্য এসব ই-গেট বেশিরভাগ সময় বন্ধই রাখা হয়। এমনকি যাত্রীরা এসব গেট পার হওয়ার পরও তাদের আবার সাধারণ ইমিগ্রেশন লাইনে দাঁড়াতে হয়, যা হয়রানি আরও বাড়িয়ে দেয়।

বিমান চলাচল বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহিদুল আলম টাইমসকে বলেন, ‘চার হাজার কোটি টাকার এই প্রকল্পটি তার মূল উদ্দেশ্য পূরণে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে।’

অন্যদিকে, অন্যান্য দেশের মতো ইলেকট্রনিক ট্রাভেল অথরাইজেশন যাচাইয়ের জন্য এখানে কোনো পূর্ণাঙ্গ স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা নেই। অনেক ক্ষেত্রে কর্মকর্তাদের আলাদাভাবে অনলাইন সিস্টেমে ঢুকে বা বাড়তি কাগজপত্র দেখে ভিসার তথ্য মেলাতে হয়, এতেও বাড়তি সময় নষ্ট হয়।

ইমিগ্রেশনে ব্যবহৃত তথ্যভাণ্ডারগুলোও (ডেটাবেজ) একে অপরের সঙ্গে যুক্ত নয়। আধুনিক স্বয়ংক্রিয় সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় একটিমাত্র প্ল্যাটফর্মেই পাসপোর্ট, ভিসা, ভ্রমণের ইতিহাস ও নিরাপত্তা সতর্কতা দেখা গেলেও শাহজালালে এসব তথ্য আলাদা আলাদা উৎস থেকে যাচাই করতে হয়।

এ ছাড়া বিমানবন্দর থেকে কাছাকাছি গন্তব্যে যাত্রীদের পৌঁছে দিতে মাসে ৯ লাখ টাকা খরচে দুটি ফ্রি শাটল বাস সার্ভিস উত্তরা জসিম উদ্দিন রোড ও কাওলা পর্যন্ত চলাচল করে, যার কথা সাধারণ যাত্রীরা জানেনই না।

লাগেজ কাটা ও চুরি

লাগেজ কেটে ভেতরের জিনিসপত্র চুরি যাওয়া শাহজালাল বিমানবন্দরের এক নিয়মিত অভিযোগ। ব্যাগ থেকে মোবাইল ফোন, ল্যাপটপ, স্বর্ণালংকার ও নগদ টাকাসহ মূল্যবান জিনিসপত্র চুরি হয়। এতে যাত্রীরা আর্থিক ক্ষতির শিকার হওয়ার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে।

গত ৫ অক্টোবর আইনজীবী মো. মাহমুদুল হাসান মামুন বিমান কার্গো থেকে লাগেজ বেল্ট পর্যন্ত পুরো কাজ টার্মিনালের মনিটরে সরাসরি সম্প্রচার করা এবং কর্মী নিয়োগে স্বচ্ছতা আনার দাবিতে আইনি নোটিশ পাঠিয়েছেন। এর জবাবে বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, চুরিরোধে দুই ডজনের বেশি এআই ক্যামেরা বসানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

বেবিচকের সদস্য (প্রশাসন) অতিরিক্ত সচিব এস এম লাবলুর রহমান টাইমসকে বলেন, ‘১৫ অক্টোবর থেকে ক্যামেরাগুলো চালু হবে। তখন ৫৬ ইঞ্চির মনিটরে যাত্রীরা তাদের লাগেজ সরবরাহের পুরো দৃশ্য সরাসরি দেখতে পাবেন।’

টাকা দিলেই মেলে সুবিধা

বিমানবন্দরে লাগেজ ওঠানামা এবং ইমিগ্রেশনের কাজ দ্রুত করে দেওয়ার জন্য কিছু বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ‘মিট অ্যান্ড গ্রিট’ সেবা রয়েছে, যেখানে যাত্রীপ্রতি ৫০০ থেকে দেড় হাজার টাকা নেওয়া হয়। ৫০০ টাকায় লাগেজ সেবা, ১ হাজার টাকায় ইমিগ্রেশন ও চেক-ইন এবং দেড় হাজার টাকায় প্রিমিয়াম সুবিধা মেলে। এমনকি নির্দিষ্ট হটলাইনে কল করে ৫ হাজার টাকা দিলে ভিআইপি লাইনে আগে ঢোকার সুযোগও পাওয়া যায়।

তবে এখানেও রয়েছে অনিয়ম। যুক্তরাজ্য থেকে ফেরা তানবীন ইসলাম জানান, কয়েকজন লোক জোর করে তার লাগেজ ধরতে আসে এবং সাহায্যের নামে ২-৩ হাজার টাকা দাবি করে। তানবীন টাইমসকে বলেন, ‘ইমিগ্রেশন লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থাতেই তারা টাকা নিয়ে আগে ঢুকিয়ে দেওয়ার প্রস্তাব দিচ্ছিল। অথচ বিদেশের বিমানবন্দরে যাত্রীদের একদম বিনামূল্যে পথ দেখিয়ে দেওয়া হয়।’

অবশ্য বেবিচকের উপপরিচালক (এটিএম) মাহমুদ আখতার হোসেন টাইমসকে বলেন, এভাবে টাকা চাওয়ার কথা তার জানা নেই।

বিমান বাংলাদেশের নিয়ম অনুযায়ী ইকোনমি ক্লাসে সর্বোচ্চ ৪০ কেজি লাগেজ আনা যায়। তানবীন ৪০ কেজির কম লাগেজ আনলেও কাস্টমস কর্তৃপক্ষ তার কাছ থেকে চকলেট রেখে দেয়। এজন্য তাকে কোনো ‘ডিটেনশন মেমো’ বা রসিদ দেয়া হয়নি। ব্যাগেজ নিয়ম অনুযায়ী, উপহারের জন্য সীমিত চকলেট আনা গেলেও বাণিজ্যিকভাবে বিক্রির সন্দেহে ৫-১০ কেজি চকলেট আটক করা হতে পারে। তবে তানবীনের আনা চকলেটগুলো একই ব্র্যান্ডের ছিল না এবং পরিমাণেও বেশি ছিল না।

বাইরে মানুষের ভিড় ও বিশৃঙ্খলা

বিমানবন্দরের বাইরের পরিবেশের অবস্থাও বেশ শোচনীয়। সকাল ৯টায় ওমান থেকে আসা বড় ভাইয়ের জন্য ৪ ঘণ্টা ধরে অপেক্ষা করা ওয়াহিদুল ইমরান বলেন, ‘এটি অন্যান্য দেশের তুলনায় সবচেয়ে নোংরা ও খারাপ এয়ারপোর্ট।’

ভেতরের রাস্তায় গাড়ির পাশাপাশি অটোরিকশা ও মোটরসাইকেলের অবৈধ পার্কিং থাকে। বাঁ দিকের গেটে এয়ারপোর্ট আর্মড পুলিশ (এপিবিএন) ও এভিয়েশন সিকিউরিটির (অ্যাভসেক) সদস্যরা দায়িত্বে থাকলেও তাদের চোখের সামনে দিয়েই বিনা বাধায় ভাসমান মানুষ ভেতরে ঢুকে পড়ে। সেখানে হকারদের নানা রকম পণ্য বিক্রি করতেও দেখা যায়।

টাঙ্গাইল থেকে আসা রুহুল ইসলাম বলেন, ‘আমাকে কেউ আটকায়নি, আড্ডা দিতে এসেছি।’ আবার রিকশাচালক মো. সুমনকে পাওয়া গেল বন্ধুদের নিয়ে ছবি তুলতে।

এ বিষয়ে জুয়েল মোল্লা বলেন, ‘ইতালিতে যাত্রীর একজন সঙ্গী ইমিগ্রেশন পর্যন্ত যেতে পারেন, সেখানে কোনো বিশৃঙ্খলা নেই। কিন্তু এখানে কোনো শৃঙ্খলাই নেই। একেকজন যাত্রীকে বিদায় দিতে বা গ্রহণ করতে ১০ থেকে ১৫ জন করে স্বজন আসছেন, হাজার হাজার মানুষ পুরো এলাকায় গিজগিজ করছে।’