সৌদি আরবের নিরাপত্তায় আরও সেনা মোতায়েন করতে যাচ্ছে পাকিস্তান। তবে গুরুত্বপূর্ণ এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে দেশটির পার্লামেন্টের কোনো ভূমিকা নেই। এতে পাকিস্তানের পররাষ্ট্রনীতি ও সামরিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে সেনাবাহিনীর ক্রমবর্ধমান প্রভাব নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
২০১৫ সালে ইয়েমেনে সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক অভিযানে অংশ নেওয়ার প্রস্তাব নাকচ করে দিয়েছিল পাকিস্তানের পার্লামেন্ট। সে সময় দেশটির আইনপ্রণেতারা সর্বসম্মতভাবে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, পাকিস্তান ওই যুদ্ধে নিরপেক্ষ থাকবে। তবে সৌদি আরবে সেনা পাঠানোর বর্তমান সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে পার্লামেন্টে ভোটাভুটি ছাড়াই।
গত সোমবার প্রথমবারের মতো কার্যকর করা হয় পাকিস্তান, সৌদি আরব ও তুরস্কের মধ্যে গত আগস্টে স্বাক্ষরিত একটি প্রতিরক্ষা চুক্তি। ইয়েমেনে ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীদের হামলা বেড়ে যাওয়ার মধ্যে সৌদি আরবের নিরাপত্তা জোরদার করতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের ক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়টিও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। গত বছর সংবিধানে পরিবর্তনের মাধ্যমে ২০৩০ সাল পর্যন্ত তিন বাহিনীর ওপর তার কর্তৃত্ব নিশ্চিত করা হয়। একই সঙ্গে তাকে আজীবন ফিল্ড মার্শাল পদমর্যাদা এবং ফৌজদারি মামলায় বিচারের মুখোমুখি হওয়া থেকে দায়মুক্তি দেওয়া হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, সৌদি আরবে সেনা মোতায়েনের সিদ্ধান্ত পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও সেনাবাহিনীর প্রভাব কতটা বেড়েছে, তা তুলে ধরছে। দেশটিতে কারাবন্দি সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই) সেনাবাহিনীর রাজনৈতিক আধিপত্যের অভিযোগ তুলে ইসলামাবাদ অভিমুখে কর্মসূচি চালাচ্ছে। তবে সেনাবাহিনী এ অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক আটলান্টিক কাউন্সিলের দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক জ্যেষ্ঠ গবেষক মাইকেল কুগেলম্যান বলেন, অতীতে পাকিস্তানের পার্লামেন্ট সেনা পাঠানোর প্রস্তাব নাকচ করলে সামরিক বাহিনী সেই সিদ্ধান্ত মেনে নিত। কিন্তু এখন পরিস্থিতি বদলে গেছে।
পাকিস্তানের তথ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এই জোটের বিষয়ে প্রয়োজনীয় সরকারি প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছে। তবে সিদ্ধান্তে মন্ত্রিসভা বা পার্লামেন্টের ভূমিকা ছিল কি না, সে বিষয়ে স্পষ্ট করে কিছু জানায়নি মন্ত্রণালয়। সেনা মোতায়েনের বিস্তারিত তথ্যকে তারা সামরিক কার্যক্রমের গোপনীয় বিষয় হিসেবে উল্লেখ করেছে।
হুথিদের বিরুদ্ধে লড়বে পাকিস্তানি সেনারা?
সৌদি আরবে পাঠানো পাকিস্তানি সেনারা ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে সরাসরি সামরিক অভিযানে অংশ নেবে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
ইরান-সমর্থিত হুথিরা গত জুলাইয়ে সৌদি জাহাজ চলাচলের ওপর নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করে। এরপর থেকে তারা তেলবাহী জাহাজ ও জ্বালানি স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে। গত সপ্তাহে ইয়েমেনে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট অভিযোগ করে, হুথিরা মদিনার একটি বিদ্যুৎকেন্দ্রে হামলা চালিয়েছে। ওই কেন্দ্র থেকে মসজিদে নববিতে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়। তবে হুথিরা এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
সম্প্রতি সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে অনুষ্ঠিত এক জরুরি বৈঠকে পাকিস্তান, সৌদি আরব ও তুরস্কের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। বৈঠকে মুনিরের সঙ্গে সৌদি ও তুরস্কের প্রতিনিধিরাও ছিলেন। মক্কা ও মদিনাকে লক্ষ্য করে হামলার চেষ্টার নিন্দা জানিয়ে তিন দেশ সম্মত সামরিক শক্তি ও সরঞ্জাম দ্রুত মোতায়েনের প্রতিশ্রুতি দেয়। তবে প্রতিটি দেশের নিজস্ব আইন মেনেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে জানানো হয়।
কত সেনা পাঠানো হবে, তাদের দায়িত্ব কী হবে, কার নেতৃত্বে তারা কাজ করবে, ব্যয় কত হবে কিংবা কত দিন তারা সেখানে থাকবে—এসব বিষয়ে বিস্তারিত জানানো হয়নি।
পাকিস্তান যদি হুথিদের বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে, তাহলে ইরানের সঙ্গে দেশটির সম্পর্কের অবনতি হতে পারে। কারণ, যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে ইরানকে ঘিরে চলমান যুদ্ধে পাকিস্তান মধ্যস্থতাকারী হিসেবে সক্রিয় রয়েছে।
২০১৫ সালের সিদ্ধান্ত থেকে কতটা বদল?
২০১৫ সালে ইয়েমেনে সামরিক অভিযানে অংশ নিতে সৌদি আরব পাকিস্তানের কাছে সেনা, যুদ্ধবিমান ও নৌজাহাজ চেয়েছিল। তখন পাকিস্তানের সরকার বিষয়টি পার্লামেন্টে তোলে। পার্লামেন্ট সর্বসম্মতিক্রমে যুদ্ধে নিরপেক্ষ থাকার সিদ্ধান্ত নেয়। তবে একই সঙ্গে সৌদি আরবের ভূখণ্ড ও পবিত্র স্থানগুলো রক্ষার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল ইসলামাবাদ।
বিশ্লেষকদের মতে, সে সময়ের সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতির পার্থক্য মূলত রাজনৈতিক। পাকিস্তানের সংবিধান তখন যেমন সশস্ত্র বাহিনীর ওপর নিয়ন্ত্রণ ও কর্তৃত্ব ফেডারেল সরকারের হাতে দিয়েছিল, এখনো তা-ই রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্রনীতির মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে সেনাবাহিনীর প্রভাব দীর্ঘদিন ধরেই শক্তিশালী।
ইমরান খানের দলের মুখপাত্র জুলফি বুখারি সেনা মোতায়েনের বিষয়ে দলটির অবস্থান স্পষ্ট করেননি। তবে তিনি বলেন, বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক বিচক্ষণতার সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।
লন্ডনের কিংস কলেজের সহযোগী অধ্যাপক আন্দ্রেয়াস ক্রিগের মতে, পাকিস্তানে এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, যেখানে বিদেশি অংশীদারেরা সেনাবাহিনীকে অপরিহার্য মনে করছে। এর ফলে দেশের ভেতরে সেনাবাহিনীর ক্ষমতা আরও শক্তিশালী হচ্ছে।
তিনি এই প্রক্রিয়াকে ‘পরস্পরকে শক্তিশালী করার চক্র’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তার মতে, বিদেশি অংশীদারেরা পাকিস্তানের বেসামরিক সরকার ও সামরিক বাহিনীর মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্যহীনতা তৈরি না করলেও, সেনাবাহিনীকে বেশি গুরুত্ব দিয়ে সেই ভারসাম্যহীনতাকে পুরস্কৃত করতে পারে।
ক্রিগ আরও সতর্ক করেছেন, যে ব্যবস্থায় ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষার কার্যকর ব্যবস্থা দুর্বল, সেখানে আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার করা সহজ হলেও পরে তার ব্যয় বা নেতিবাচক প্রভাব দেখা দিলে সিদ্ধান্ত সংশোধন করা কঠিন হয়ে পড়ে।
সব মিলিয়ে, সৌদি আরবে পাকিস্তানি সেনা মোতায়েনের উদ্যোগ শুধু আঞ্চলিক নিরাপত্তার বিষয় নয়; এটি দেশটির পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারণে সেনাবাহিনীর প্রভাব এবং বেসামরিক প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা নিয়েও নতুন বিতর্ক তৈরি করেছে।
সূত্র: রয়টার্স