Image description

আফ্রিকার অর্থনীতিকে ঘিরে বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘটছে। দীর্ঘদিন ধরে আফ্রিকা আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহায়তা, দারিদ্র্য, সংঘাত ও মানবিক সংকটের আলোচনায় বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। কিন্তু এখন সেই চিত্রের পাশাপাশি আরেকটি আফ্রিকা সামনে আসছে—যে আফ্রিকা বৈশ্বিক বিনিয়োগ, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ, তরুণ শ্রমশক্তি, দ্রুত বর্ধনশীল ভোক্তা বাজার এবং গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রবন্দরকে কেন্দ্র করে নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনার ক্ষেত্র হয়ে উঠছে।

ফরেন অ্যাফেয়ার্সের গত ৭ অক্টোবর প্রকাশিত জ্যারেড কোহেনের নিবন্ধে এই পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাখ্যা রয়েছে। কোহেনের মতে, আফ্রিকায় আন্তর্জাতিক ব্যবসায়িক আগ্রহ দ্রুত বাড়ছে। কিন্তু এই বিনিয়োগের সুফল গোটা মহাদেশে সমানভাবে ছড়িয়ে পড়বে না। বরং আগামী দিনে এমন একটি ‘দুই আফ্রিকা’ তৈরি হতে পারে—একদিকে সংস্কার, স্থিতিশীলতা ও বিনিয়োগ আকর্ষণে সফল দেশগুলো দ্রুত এগিয়ে যাবে, অন্যদি অর্থনৈতিজনৈতিক অস্থিরতা, দুর্বল প্রতিষ্ঠান, দুর্নীতি, সংঘাত ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতায় আটকে থাকা দেশগুলো আরও পিছিয়ে পড়বে।

এই পরিবর্তনের পেছনে আন্তর্জাতিক নীতিরও একটি গুরুত্বপূর্ণ রূপান্তর রয়েছে। নিবন্ধের শুরুতেই কোহেন উল্লেখ করেছেন, গত বছর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আফ্রিকার নেতাদের বলেছিলেন যে যুক্তরাষ্ট্র ‘সহায়তা থেকে বাণিজ্যের দিকে’ যাচ্ছে। একই সময়ে ওয়াশিংটন বিশ্বের সবচেয়ে বড় উন্নয়ন সহায়তা সংস্থা ইউএসএআইডি বন্ধ করার প্রক্রিয়া শুরু করে এবং যুক্তরাষ্ট্রের অনেক মিত্রও আফ্রিকায় তাদের সহায়তা কর্মসূচি কমিয়ে দেয়।

একদিকে এই সহায়তা কমে যাওয়া মানবিক ও উন্নয়নমূলক দৃষ্টিকোণ থেকে বড় ঝুঁকি তৈরি করেছে। অন্যদিকে আফ্রিকার অর্থনৈতিক গুরুত্বের কারণে আন্তর্জাতিক ব্যবসায়িক আগ্রহ কমেনি। বরং তা বাড়ছে। আফ্রিকার বিশাল খনিজ সম্পদ, তরুণ জনসংখ্যা, ক্রমবর্ধমান ভোক্তা শ্রেণি এবং গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথের পাশে অবস্থিত বন্দরগুলো বিশ্বের বড় অর্থনৈতিক শক্তিগুলোকে নতুন করে আকৃষ্ট করছে। কোহেনের হিসাবে, এ বছর বিশ্বের দ্রুততম বর্ধনশীল ২০টি অর্থনীতির প্রায় অর্ধেকই আফ্রিকার হতে পারে।

তবে এখানেই আফ্রিকার সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি তৈরি হচ্ছে। আন্তর্জাতিক পুঁজি আফ্রিকায় আসতে চাইছে—কিন্তু আফ্রিকার কোন দেশ সেই পুঁজিকে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক উন্নয়নে পরিণত করতে পারবে? কোহেনের বিশ্লেষণে এই প্রশ্নের উত্তর কোনো একটি খনিজ সম্পদ, বড় জনসংখ্যা কিংবা ভৌগোলিক অবস্থানের ওপর নির্ভর করে না। বরং নির্ভর করে একটি দেশের প্রতিষ্ঠান, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, অবকাঠামো, বিদ্যুৎ, শিক্ষা, বাণিজ্যব্যবস্থা এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশের ওপর।

যেসব দেশ ধারাবাহিক সংস্কার করতে পারবে এবং বিদেশি বিনিয়োগের পাশাপাশি নিজেদের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিকেও শক্তিশালী করবে, তারা হয়তো বিংশ শতাব্দীতে সিঙ্গাপুর, দক্ষিণ কোরিয়া ও তাইওয়ানের মতো শিল্পায়নের পথ অনুসরণ করতে পারবে। অর্থাৎ আফ্রিকার বর্তমান বিনিয়োগ প্রতিযোগিতা শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুযোগ নয়; সফল হলে এটি কিছু দেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদি ভূরাজনৈতিক শক্তির ভিত্তিও তৈরি করতে পারে

বর্তমানে অবশ্য আফ্রিকার বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অবস্থান তার সম্ভাবনার তুলনায় অনেক ছোট। কোহেনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের মোট জনসংখ্যার প্রায় ২০ শতাংশ আফ্রিকায় বসবাস করলেও বৈশ্বিক জিডিপিতে মহাদেশটির অংশ মাত্র ৩ শতাংশ এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যেও অংশ প্রায় ৩ শতাংশ। গত ২৫ বছরে সাব-সাহারান আফ্রিকায় বিদেশি প্রত্যক্ষ বিনিয়োগও জিডিপির অনুপাতে প্রায় ২ থেকে ৩ শতাংশের মধ্যে মোটামুটি স্থির থেকেছে।

তার বড় অংশই গেছে তেল, হীরা, সোনা এবং অন্যান্য খনিজ উত্তোলনে। ফলে আফ্রিকায় বিদেশি পুঁজি এসেছে, কিন্তু তা অধিকাংশ ক্ষেত্রে বৃহত্তর শিল্পায়ন, বহুমুখী উৎপাদন বা স্থানীয় অর্থনীতির গভীর রূপান্তর ঘটাতে পারেনি। এখানেই বর্তমান বিনিয়োগের নতুন ঢেউয়ের তাৎপর্য। যদি নতুন বিনিয়োগ শুধু সম্পদ উত্তোলনে সীমাবদ্ধ না থেকে উৎপাদন, প্রযুক্তি, অবকাঠামো, সেবা ও ভোক্তা বাজারের বিকাশ ঘটায়, তাহলে আফ্রিকার অর্থনৈতিক কাঠামো বদলে যেতে পারে।

আফ্রিকার দক্ষিণাঞ্চল এই পরিবর্তনের সম্ভাবনার একটি উদাহরণ। কোহেন দেখিয়েছেন, দক্ষিণ আফ্রিকায় আন্তঃরাষ্ট্রীয় অবকাঠামো তুলনামূলকভাবে উন্নত এবং বাণিজ্যের বাধাও অপেক্ষাকৃত কম। যদিও শুল্ক-বহির্ভূত বাধা এখনো রয়েছে। ১২টি দেশের বিদ্যুৎব্যবস্থা একটি পাওয়ার পুলের মাধ্যমে যুক্ত। তারা পরস্পরের কাছ থেকে বিদ্যুৎ কিনতে ও বিক্রি করতে পারে। একইভাবে বতসোয়ানা, এসওয়াতিনি, লেসোথো, নামিবিয়া ও দক্ষিণ আফ্রিকাকে নিয়ে গঠিত একটি পুরোনো কাস্টমস ইউনিয়ন বাণিজ্য নীতি সমন্বয় ও রাজস্ব ভাগাভাগি করে।

 

নাইজেরিয়ার জামফারা রাজ্যের গুসাউয়ের একটি বাজারের দৃশ্য। ছবি: রয়টার্স
নাইজেরিয়ার জামফারা রাজ্যের গুসাউয়ের একটি বাজারের দৃশ্য। ছবি: রয়টার্স

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে উন্নততর পরিবহন ও লজিস্টিক নেটওয়ার্ক, যা মহাদেশের দক্ষিণ-মধ্যাঞ্চলের খনিজ অঞ্চলকে দুই উপকূলের বন্দরের সঙ্গে যুক্ত করছে। এর ফলে বিনিয়োগকারীরা পৃথক দেশ নয়, একটি আঞ্চলিক বাজার হিসেবে এই অঞ্চলকে বিবেচনা করার সুযোগ পাচ্ছেন। বতসোয়ানা ও জাম্বিয়ার চলতি বছরের সম্ভাব্য প্রবৃদ্ধি যথাক্রমে ৪ দশমিক ৭ ও ৪ দশমিক ৩ শতাংশ হওয়ার কথাও কোহেন উল্লেখ করেছেন।

অন্য অঞ্চলগুলোতেও একই ধরনের সম্ভাবনা রয়েছে। নাইজেরিয়ার বিশাল উদ্যোক্তা-ভিত্তিক অর্থনীতি ও বিনিয়োগের আগ্রহ পশ্চিম আফ্রিকাকে বড় বাজারের সুবিধা দিচ্ছে। কেনিয়া, তানজানিয়া ও উগান্ডা পূর্ব আফ্রিকার একটি ক্রমবর্ধমান বাণিজ্যিক কেন্দ্র গড়ে তুলছে। মরিশাস নিজেকে আন্তর্জাতিক আর্থিক কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। আবার বোতসোয়ানা ও রুয়ান্ডা সীমিত আকারের অর্থনীতি হওয়া সত্ত্বেও তুলনামূলক স্থিতিশীল নীতি ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশের মাধ্যমে বিদেশি পুঁজি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছে। এই উদাহরণগুলো দেখায়, বড় বাজার বা বিপুল সম্পদ থাকাই বিনিয়োগ আকর্ষণের একমাত্র শর্ত নয়। নীতি ও প্রতিষ্ঠানও বিনিয়োগের গন্তব্য নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

আফ্রিকার সবচেয়ে বড় দীর্ঘমেয়াদি সম্পদগুলোর একটি তার জনসংখ্যা। উন্নত অর্থনীতিগুলো যখন ক্রমেই বয়স্ক হয়ে উঠছে, তখন আফ্রিকার বহু দেশ আগামী কয়েক দশকে বিপুল কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী পাবে। কোহেন ডেমোগ্রাফার নিকোলাস এবারস্টাডের ২০২৪ সালের একটি নিবন্ধের উদ্ধৃতি দিয়ে দেখিয়েছেন যে ২০৪০ সালের মধ্যে সাব-সাহারান আফ্রিকা ছাড়া বিশ্বের প্রায় সর্বত্র ১৫ থেকে ৪৯ বছর বয়সী জনসংখ্যার জাতীয় গোষ্ঠী কমে যাবে।

একই সঙ্গে দ্রুত নগরায়ণও আফ্রিকার জন্য নতুন অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরি করছে। ওইসিডি-এর হিসাবে ২০৫০ সালের মধ্যে আফ্রিকার প্রায় প্রতি তিনজনের মধ্যে দুজন শহরে বসবাস করবে। একটি সমৃদ্ধ ও নগরায়িত আফ্রিকা তখন শুধু তেল ও খনিজের জন্য নয়, ভোক্তা পণ্য, আর্থিক সেবা, প্রযুক্তি, আবাসন, পরিবহন এবং অন্যান্য সেবার জন্যও বিনিয়োগের বড় বাজার হয়ে উঠতে পারে।

কিন্তু জনসংখ্যা নিজে কোনো অর্থনৈতিক সম্পদ নয়, যদি সেই জনসংখ্যাকে শিক্ষা, দক্ষতা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ দেওয়া না যায়। কোহেন এই ঝুঁকিটিও স্পষ্ট করেছেন। আফ্রিকার তরুণ জনগোষ্ঠী একদিকে সম্ভাবনার উৎস, অন্যদিকে কর্মসংস্থান ও শিক্ষার ঘাটতি থাকলে অস্থিরতার কারণও হতে পারে। সাব-সাহারান আফ্রিকায় ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সী জনগোষ্ঠীর মাত্র ৭৫ শতাংশ সাক্ষর। অনেক দেশ আবার দক্ষ মানবসম্পদ হারাচ্ছে মেধাপাচারের কারণে। ফলে জনসংখ্যাগত সুবিধাকে অর্থনৈতিক সুবিধায় পরিণত করার জন্য শিক্ষাব্যবস্থা, দক্ষতা উন্নয়ন এবং আনুষ্ঠানিক কর্মসংস্থানের বিস্তার অপরিহার্য। রুয়ান্ডার প্রাথমিক শিক্ষায় প্রায় সব শিশুর অন্তর্ভুক্তির উদাহরণ দেখায় যে কিছু দেশ এই ক্ষেত্রে অগ্রগতি করতে পারছে।

অ্যাঙ্গোলার রাজধানী লুয়ান্ডার উপকণ্ঠে কামামা এলাকায় ক্রেতাদের কাছে পণ্য বিক্রি করছেন। ছবি: রয়টার্স
অ্যাঙ্গোলার রাজধানী লুয়ান্ডার উপকণ্ঠে কামামা এলাকায় ক্রেতাদের কাছে পণ্য বিক্রি করছেন। ছবি: রয়টার্স

আফ্রিকার খনিজ সম্পদ এই নতুন ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার আরেকটি কেন্দ্রে রয়েছে। সাব-সাহারান আফ্রিকায় বিশ্বের পরিচিত গুরুত্বপূর্ণ খনিজের প্রায় ৩০ শতাংশ মজুত রয়েছে। বৈদ্যুতিক গাড়ি, ব্যাটারি, সৌর প্যানেল, বিদ্যুৎ অবকাঠামো ও অন্যান্য প্রযুক্তির জন্য প্রয়োজনীয় এসব খনিজের কারণে আফ্রিকার কৌশলগত গুরুত্ব দ্রুত বাড়ছে। চীন এই বাস্তবতা অনেক আগে উপলব্ধি করে আফ্রিকায় ব্যাপক বিনিয়োগ করেছে। কোহেনের হিসাবে, গত ২০ বছরে আফ্রিকায় চীনের মোট বিনিয়োগ ৩৫০ বিলিয়ন ডলারের বেশি এবং প্রায় সব সাব-সাহারান আফ্রিকান দেশই কোনো না কোনোভাবে বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। আদ্দিস আবাবা-জিবুতি ও মোম্বাসা-নাইরোবি রেলপথের মতো প্রকল্পের মাধ্যমে চীন আফ্রিকার বাণিজ্য করিডোরেও নিজের উপস্থিতি শক্ত করেছে।

এখন যুক্তরাষ্ট্র ও তার অংশীদাররাও আফ্রিকার খনিজ ও অবকাঠামো প্রতিযোগিতায় আরও সক্রিয় হতে চাইছে। ট্রাম্প প্রশাসন গণতান্ত্রিক প্রজাতান্ত্রিক কঙ্গো ও রুয়ান্ডার খনিজ সম্পদে মার্কিন প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার উদ্যোগের সঙ্গে দুই দেশের মধ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার একটি চুক্তিকে যুক্ত করেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও জি-৭ দেশগুলো লোবিতো করিডোরের মতো প্রকল্পে সমর্থন দিচ্ছে, যা কঙ্গো ও জাম্বিয়ার খনিজ অঞ্চলকে অ্যাঙ্গোলার আটলান্টিক উপকূলের সঙ্গে যুক্ত করবে। তামার মতো গুরুত্বপূর্ণ ধাতু পরিবহনে এই করিডোর ভবিষ্যতে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। একই সঙ্গে আফ্রিকান গ্রোথ অ্যান্ড অপরচুনিটি অ্যাক্টের মেয়াদ ২০২৮ সাল পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে, যার আওতায় সাব-সাহারান দেশগুলো মার্কিন বাজারে শুল্কমুক্ত প্রবেশের সুযোগ পায়। ফলে আফ্রিকা এখন চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রও হয়ে উঠছে।

আফ্রিকার ভূগোলও তার কৌশলগত গুরুত্ব বাড়াচ্ছে। সুয়েজ খাল ও বাব আল-মান্দাব প্রণালির মতো দুটি গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক সংকীর্ণ পথ আফ্রিকার উপকূলের সঙ্গে যুক্ত। লোহিত সাগরে হুতিদের হামলার কারণে বড় জাহাজ কোম্পানিগুলো গত কয়েক বছরে আফ্রিকার দক্ষিণ প্রান্ত ঘুরে চলাচল বাড়িয়েছে। এর ফলে আফ্রিকার দক্ষিণ ও পশ্চিম উপকূলের বন্দরগুলোর গুরুত্বও বেড়েছে। চীনা রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলো আফ্রিকার অন্তত ৩২টি দেশে ৭৮টির মতো বন্দর নির্মাণ, অর্থায়ন বা পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত। তুরস্ক মোগাদিসুর বন্দর পরিচালনা করে এবং সেখানে তার বৃহত্তম বিদেশি সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করেছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের কোম্পানিগুলোও এক ডজনের বেশি বন্দর পরিচালনা করছে। অর্থাৎ আফ্রিকার বন্দর ও সামুদ্রিক অবকাঠামো এখন কেবল বাণিজ্যের বিষয় নয়; তা বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার অংশ হয়ে উঠছে।

এই প্রতিযোগিতায় উপসাগরীয় দেশগুলোর ভূমিকা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কোহেনের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে আফ্রিকায় উপসাগরীয় পুঁজির প্রবাহ সবচেয়ে কম আলোচিত অথচ গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক পরিবর্তনগুলোর একটি। সংযুক্ত আরব আমিরাত ২০১৯ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে প্রায় ১১০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে এবং কিছু বছরে চীনের চেয়েও বেশি নতুন বিদেশি প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ করেছে। সৌদি আরব ও কাতার রিয়েল এস্টেট, খনিজ ও ডিজিটাল অবকাঠামোয় সার্বভৌম পুঁজি ব্যবহার করছে। চীনা ঋণ অনেক ক্ষেত্রে কমে যাওয়ায় উপসাগরীয় দেশগুলো সেই শূন্যস্থান পূরণ করছে। আফ্রিকার অনেক সরকারও এই মডেলকে আকর্ষণীয় মনে করছে। কারণ উপসাগরীয় বিনিয়োগকারীরা ঋণের বোঝা চাপানোর পরিবর্তে প্রকল্পে অংশীদার হতে আগ্রহী।

কিন্তু বিনিয়োগের এই প্রতিযোগিতা থেকে আফ্রিকার সব দেশ সমান সুবিধা পাবে না। জাতিসংঘের হিসাবে আফ্রিকার ৮০ শতাংশের বেশি বিদেশি প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ মাত্র ১৫টি দেশে কেন্দ্রীভূত। এই তথ্যই ‘দুই আফ্রিকা’ ধারণাটির কেন্দ্রে রয়েছে। বিনিয়োগকারীরা অনেক ধরনের সমস্যা মেনে নিতে পারেন, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি অনিশ্চয়তা মেনে নিতে চান না। চুক্তি কার্যকর থাকবে কি না, সরকার বদলালে নীতি বদলাবে কি না, সম্পত্তির অধিকার সুরক্ষিত থাকবে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর নেতিবাচক হলে বিপুল খনিজ সম্পদও বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য যথেষ্ট হয় না। বুরকিনা ফাসো, মালি ও নাইজারে সামরিক অভ্যুত্থানের পর অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতা বেড়েছে। মাদাগাস্কারের অভ্যুত্থান অর্থনৈতিক সংস্কার ও নজরদারি থামিয়ে দিয়েছে।

মিসর ও মোজাম্বিকের মতো দেশগুলো আবার ঋণসংকট বা ঋণসংকটের ঝুঁকিতে সরকারি ব্যয়ের সুযোগ হারাচ্ছে।

এই পার্থক্য জাম্বিয়া ও কঙ্গোর তুলনায়ও স্পষ্ট। উভয় দেশেরই বিপুল খনিজ সম্পদ রয়েছে। কিন্তু ২০২০ সালের ঋণখেলাপির পর জাম্বিয়া করব্যবস্থায় পরিবর্তনসহ ধারাবাহিক সংস্কারের মাধ্যমে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেছে এবং এর ফলে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহও পুনরায় বেড়েছে। অন্যদিকে কঙ্গোতে চলমান সংঘাত রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকি বাড়িয়ে দিয়েছে। অর্থাৎ একই ধরনের প্রাকৃতিক সম্পদ থাকা সত্ত্বেও রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান ও রাজনৈতিক পরিবেশের পার্থক্য বিনিয়োগের ফলাফলকে সম্পূর্ণ ভিন্ন করে দিতে পারে। এ কারণেই আফ্রিকার ভবিষ্যৎ শুধু ‘কত খনিজ আছে’ এই প্রশ্নের ওপর নির্ভর করছে না; বরং ‘সেই সম্পদ পরিচালনার জন্য রাষ্ট্র কতটা সক্ষম’—এই প্রশ্নের ওপরও নির্ভর করছে।

নিরাপত্তা পরিস্থিতি এই পার্থক্যকে আরও গভীর করছে। ২০২০ সালের পর আফ্রিকায় অন্তত ৯টি সফল সামরিক অভ্যুত্থান হয়েছে। বিশ্বের মোট সংঘাতের প্রায় ৪০ শতাংশ এখন সাব-সাহারান আফ্রিকায়, বিশেষ করে সাহেল অঞ্চল ও সুদানে। সুদানের পরিস্থিতিকে কোহেন বিশ্বের সবচেয়ে ভয়াবহ চলমান মানবিক সংকটগুলোর একটি হিসেবে তুলে ধরেছেন। যেখানে যুক্তরাষ্ট্র ও ফ্রান্স তাদের সামরিক উপস্থিতি প্রত্যাহার করেছে, সেখানে জিহাদি গোষ্ঠী ও রুশ প্যারামিলিটারি শূন্যস্থান পূরণ করেছে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক অধিকার ও নাগরিক স্বাধীনতার ক্ষেত্রেও অবনতি ঘটেছে।

ফ্রিডম হাউস-এর ২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, আফ্রিকার ১৮টি দেশে রাজনৈতিক অধিকার ও নাগরিক স্বাধীনতার অবনতি ঘটেছে, বিপরীতে উন্নতি হয়েছে মাত্র ১১টিতে। ফলে আফ্রিকার বিনিয়োগ সম্ভাবনা নিরাপত্তা ও শাসনব্যবস্থার সংকট থেকে আলাদা করে দেখা সম্ভব নয়।

এই সব সমস্যার মধ্যে কোহেন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাধাগুলোর একটি হিসেবে বিদ্যুৎকে চিহ্নিত করেছেন। সাব-সাহারান আফ্রিকায় এখনো প্রায় ৬০ কোটি মানুষ বিদ্যুৎ সুবিধার বাইরে।

অথচ আধুনিক যুগে কোনো দেশই সস্তা ও নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ ছাড়া শিল্পায়ন করতে পারেনি। আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে তেল, গ্যাস ও তামার মতো বিপুল জ্বালানি ও শিল্পসম্পদ থাকলেও বিদ্যুৎ উৎপাদন, সঞ্চালন ও বিতরণব্যবস্থার দুর্বলতা উৎপাদনশীলতা সীমিত করছে। রুয়ান্ডার উদাহরণ অবশ্য আশাব্যঞ্জক। ২০০৯ সালে দেশটির মাত্র ৬ শতাংশ পরিবার বিদ্যুৎ পেত; ২০২৪ সালে এই হার ৭৫ শতাংশে পৌঁছেছে। এর ফলে ব্যবসা পরিচালনা, ডিজিটাল সংযোগ, পণ্য সংরক্ষণ এবং স্কুল পরিচালনার সুযোগ বেড়েছে। কেনিয়া ও উগান্ডাও বিদ্যুতায়নে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করেছে।

বিদ্যুতের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত আরেকটি প্রশ্ন হলো আফ্রিকার অভ্যন্তরীণ বাজারকে একীভূত করা।

আফ্রিকার শহরগুলো দ্রুত বাড়ছে। কিন্তু শুধু জনসংখ্যা বাড়লেই বড় অর্থনৈতিক বাজার তৈরি হয় না। দুর্বল বিদ্যুৎ, সীমান্তের জটিলতা, অদক্ষ কাস্টমস ব্যবস্থা, অসম্পূর্ণ অবকাঠামো এবং ভিন্ন ভিন্ন পেমেন্ট ব্যবস্থার কারণে আবিদজান, দার এস সালাম, জোহানেসবার্গ, লাগোস ও নাইরোবির মতো বড় শহরগুলোর অর্থনৈতিক সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগছে না। তাই আফ্রিকার জন্য মহাদেশীয় বাণিজ্য একীভূত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আফ্রিকান কন্টিনেন্টাল ফ্রি ট্রেড এরিয়া ৫০টি দেশ অনুমোদন করেছে এবং এটি বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ শুল্কমুক্ত অঞ্চল তৈরির লক্ষ্য নিয়েছে। তবে বাণিজ্য নিয়ম, শুল্ক ও কাস্টমস প্রক্রিয়া সমন্বয়ের ক্ষেত্রে এখনো অনেক কাজ বাকি। এই বাজার একীভূত করা গেলে আফ্রিকার অর্থনীতি কাঁচামাল রপ্তানি থেকে উৎপাদন ও মূল্য সংযোজনের দিকে এগোতে পারে।

জ্যারেড কোহেনের বিশ্লেষণের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো, আফ্রিকার ভবিষ্যৎ একক কোনো গল্প নয়। মহাদেশটির বর্তমান পরিবর্তন একই সঙ্গে সুযোগ ও বিভাজন—দুটিই তৈরি করতে পারে। আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ বাড়ছে, চীন, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ, ভারত ও উপসাগরীয় দেশগুলোর প্রতিযোগিতা আফ্রিকার কৌশলগত গুরুত্ব বাড়াচ্ছে, গুরুত্বপূর্ণ খনিজের চাহিদা বাড়ছে, তরুণ জনগোষ্ঠী ও নগরায়ণ নতুন বাজার তৈরি করছে। কিন্তু এই সুযোগকে দীর্ঘমেয়াদি সমৃদ্ধিতে রূপান্তর করতে না পারলে সম্পদসমৃদ্ধ দেশও সংঘাত, দুর্নীতি, ঋণ ও অস্থিরতার ফাঁদে আটকে থাকতে পারে। বিপরীতে স্থিতিশীল প্রতিষ্ঠান, কার্যকর সরকার, নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ, শিক্ষিত ও দক্ষ শ্রমশক্তি, অবকাঠামো এবং আঞ্চলিক বাণিজ্যের সঙ্গে নিজেদের যুক্ত করতে পারা দেশগুলো দ্রুত এগিয়ে যেতে পারে।

অতএব আফ্রিকার সামনে এখন যে প্রশ্নটি দাঁড়িয়ে আছে, তা শুধু বিদেশি বিনিয়োগ কত আসবে—তা নয়। আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, সেই বিনিয়োগের নিয়ন্ত্রণ, ব্যবহার ও সুফল কীভাবে দেশের অর্থনীতির গভীরে পৌঁছাবে। খনিজ উত্তোলন যদি কেবল বিদেশি কোম্পানির মুনাফা বাড়ায়, কিন্তু স্থানীয় শিল্প, কর্মসংস্থান, শিক্ষা ও অবকাঠামো উন্নত না করে, তাহলে বিনিয়োগের পরিমাণ বাড়লেও অর্থনৈতিক রূপান্তর ঘটবে না। আবার যদি বিনিয়োগকে বিদ্যুৎ, পরিবহন, উৎপাদন, প্রযুক্তি, দক্ষতা ও আঞ্চলিক বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত করা যায়, তাহলে আফ্রিকার বর্তমান সুযোগ একটি ঐতিহাসিক পরিবর্তনের সূচনা করতে পারে। কোহেনের ভাষায়, শেষ পর্যন্ত আফ্রিকার নেতাদের হাতে যথেষ্ট ক্ষমতা রয়েছে—তারা নিজেদের দেশকে অভ্যন্তরীণ বাণিজ্য ও বৈদেশিক পুঁজির জন্য উন্মুক্ত করে কোন পথে নিয়ে যাবেন, তার ওপরই অনেক কিছু নির্ভর করবে।

এই অর্থে ‘দুই আফ্রিকা’ কোনো ভৌগোলিক বিভাজন নয়; এটি উন্নয়নের দুই সম্ভাব্য পথের প্রতিচ্ছবি। এক আফ্রিকা তার তরুণ জনগোষ্ঠী, খনিজ সম্পদ, বন্দর, নগরায়ণ ও নতুন বৈশ্বিক বিনিয়োগকে ব্যবহার করে শিল্পায়ন, বাণিজ্য ও ভূরাজনৈতিক শক্তির নতুন ভিত্তি তৈরি করতে পারে। অন্য আফ্রিকা একই সম্পদ থাকা সত্ত্বেও দুর্বল প্রতিষ্ঠান, সংঘাত, দুর্নীতি, অদক্ষ অবকাঠামো ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে পিছিয়ে পড়তে পারে। ফলে আফ্রিকার বর্তমান বিনিয়োগ-বুম মহাদেশটির জন্য একদিকে ঐতিহাসিক সুযোগ, অন্যদিকে একটি কঠিন পরীক্ষা। কোন আফ্রিকা আগামী দশকগুলোতে সামনে আসবে, তা শেষ পর্যন্ত শুধু বিদেশি শক্তিগুলোর সিদ্ধান্তে নির্ধারিত হবে না; বরং আফ্রিকার দেশগুলো নিজেদের সম্পদ, প্রতিষ্ঠান ও মানুষের সম্ভাবনাকে কতটা কার্যকরভাবে কাজে লাগাতে পারে, তার ওপরই নির্ভর করবে।