Image description

দুবাই থেকে ইসরায়েলের তেল আবিব যাচ্ছিল ফ্লাইদুবাইয়ের একটি প্লেন। তাতে ছিলেন ১৭৪ যাত্রী। এদের মধ্যে ২৭ জনই শিশু। ছিলেন ছয়জন ক্রু সদস্যও। হঠাৎ মাঝআকাশে প্লেনের ককপিটে ঘটে যায় ভয়ংকর ঘটনা।

সহকারী পাইলটের বিরুদ্ধে প্রধান পাইলটকে ছুরিকাঘাত করে প্লেনটি মাটির দিকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টার অভিযোগ ওঠে। তবে শেষ পর্যন্ত যাত্রী ও ক্রুদের সাহসী তৎপরতায় বড় দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব হয়।

বিজ্ঞাপন

ভারতীয় পাইলট স্মিত মাচ্ছার গুরুতর আহত অবস্থায়ও ককপিটের দরজা খুলে দেন। এরপর যাত্রীদের কয়েকজন ককপিটে ঢুকে অভিযুক্ত সহকারী পাইলটকে বাগে আনতে সাহায্য করেন।

 

এই ঘটনায় প্রধান পাইলটসহ পাঁচজনকে সাহসিকতার জন্য নায়ক হিসেবে দেখা হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

পাইলট স্মিত মাচ্ছার

ফ্লাইটটির ভারতীয় পাইলট স্মিত মাচ্ছারই প্রথমে হামলার শিকার হন। অভিযোগ রয়েছে, ওমানের নাগরিক সহকারী পাইলট তাকে ছুরিকাঘাত করেন। এরপর তিনি প্লেনটির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করেন।

গুরুতর আহত হয়েও মাচ্ছার অসাধারণ উপস্থিত বুদ্ধির পরিচয় দেন। তিনি ককপিটের দরজা খুলে ক্রুদের সতর্ক করেন।

এরপর জরুরি সংকেত পাঠিয়ে প্লেনটি সৌদি আরবের তাবুকের দিকে ঘুরিয়ে নেওয়া হয়। সেখানে একটি ছোট বিমানবন্দরে প্লেনটি অবতরণ করে।

বিজ্ঞাপন

মাচ্ছারকে পরে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তিনি মাথা ও হাতে গুরুতর আঘাত পেয়েছিলেন এবং প্রচুর রক্তক্ষরণ হয়েছিল।

 

ইয়ানিভ হায়ুন

যাত্রীদের মধ্যে সবার আগে ককপিটে ছুটে যাওয়া ব্যক্তিদের একজন ইয়ানিভ হায়ুন। পেশায় তিনি একজন প্লাম্বার।

বিজ্ঞাপন

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু তেল আবিব বিমানবন্দরে তার সঙ্গে দেখা করেন। হায়ুনের জামায় রক্তের দাগ ছিল। তবে তিনি নিজে আহত হননি।

হায়ুন জানান, ককপিটে ঢোকার পর তিনি দেখেন, অভিযুক্ত সহকারী পাইলট নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার কাছে অবস্থান করছেন। সেখানে কোনো পাইলট নিজের আসনে ছিলেন না। তিনি সহকারী পাইলটকে ধরে নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা থেকে সরিয়ে দেন। পরে প্লেনের নিয়ন্ত্রণ স্থিতিশীল করতেও সাহায্য করেন।

হায়ুন জানান, প্লেন চালানো সম্পর্কে তার কিছু ধারণা হয়েছিল টেলিভিশনের অনুষ্ঠান দেখে। তিনি ‘Mayday’ নামের প্লেন দুর্ঘটনা নিয়ে তৈরি অনুষ্ঠান দেখতেন।

বিজ্ঞাপন

তার ভাষ্য অনুযায়ী, ককপিটের দরজা খোলা ছিল। তিনি মনে করেন, পড়ে যাওয়ার আগে পাইলট মাচ্ছারই সেটি খুলে দিয়েছিলেন।

আসাফ রাজুয়ান

আরেক যাত্রী আসাফ রাজুয়ান একজন বিমা প্রতিষ্ঠানের মালিক। থাইল্যান্ড থেকে ছুটি কাটিয়ে ইসরায়েলে ফিরছিলেন তিনি। হঠাৎ প্লেনটি ভয়ংকরভাবে নিচের দিকে নামতে শুরু করে।

রাজুয়ানের ভাষ্য অনুযায়ী, যাত্রীরা চিৎকার শুনতে পান। একপর্যায়ে প্লেনটি প্রায় ৯০ ডিগ্রি কোণে নিচের দিকে নেমে যাচ্ছিল। তখন তারা বুঝতে পারেন, প্লেনের নিয়ন্ত্রণে বড় ধরনের সমস্যা হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

ককপিটের দরজা খোলা দেখতে পান যাত্রীরা। ভেতরে রক্ত দেখতে পেয়ে কয়েকজন যাত্রী সেখানে ছুটে যান। রাজুয়ান জানান, জভিকা মানেস নামে আরেক যাত্রী তার আগেই ককপিটে ঢুকেছিলেন।

পরে আরও কয়েকজনের সঙ্গে তিনিও অভিযুক্ত সহকারী পাইলটকে নিয়ন্ত্রণে আনতে চেষ্টা করেন। শেষ পর্যন্ত তারা সফল হন।

বিজ্ঞাপন

ক্রু সদস্যদের সহায়তায় অভিযুক্ত ব্যক্তিকে প্রায় ৫০ মিনিট নিয়ন্ত্রণে রাখা হয়। এরপর প্লেনটি সৌদি আরবে নিরাপদে অবতরণ করে।

জভিকা মানেস

জভিকা মানেসও ছিলেন প্রথম দিকে ককপিটে ছুটে যাওয়া যাত্রীদের একজন। তিনি ব্যাংক লিউমির একটি প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা।

প্লেনটি যখন দ্রুত নিচের দিকে নামছিল, তখন তিনি অন্যদের সঙ্গে মিলে অভিযুক্ত সহকারী পাইলটকে নিয়ন্ত্রণে আনেন।

মানেস জানান, প্লেনের মাল্টিমিডিয়া হেডফোনের তার ব্যবহার করে তারা ওই ব্যক্তিকে বেঁধে ফেলেন।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, প্লেনে তখন প্রচুর রক্ত ছিল। যাত্রীরা আতঙ্কে চিৎকার করছিলেন। প্লেনটি দ্রুত মাটির দিকে নেমে যাচ্ছিল।

মানেস বলেন, অভিযুক্ত ব্যক্তি প্লেনটিকে মাটির দিকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিলেন। তারা পরে শারীরিক শক্তি প্রয়োগ করে তাকে নিয়ন্ত্রণে আনেন।

শোটা মুসায়েভ

প্লেনটিতে থাকা দন্ত চিকিৎসক শোটা মুসায়েভও প্রথমে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে আটকাতে এগিয়ে যান। তাকে নিয়ন্ত্রণে আনার পর মুসায়েভ আহত পাইলটের চিকিৎসায় মন দেন।

জানা গেছে, প্লেনটিতে তিনিই একমাত্র চিকিৎসক ছিলেন। তিনি দেখেন, পাইলট মাচ্ছারের মাথা ও হাত থেকে প্রচুর রক্তক্ষরণ হচ্ছে। মুসায়েভ দ্রুত রক্তপাত বন্ধ করার চেষ্টা করেন।

তিনি জানান, গুরুতর আহত হলেও মাচ্ছার তখনও সচেতন ছিলেন। তিনি যাত্রীদের সঙ্গে কথা বলছিলেন। তবে অবতরণের কিছুক্ষণ আগে তার শারীরিক অবস্থার কিছুটা অবনতি হয়।

মুসায়েভ পরে মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনকে বলেন, পাইলটের মাথা ও হাতে গভীর ক্ষত ছিল। প্রচুর রক্তক্ষরণের কারণে তার অবস্থা গুরুতর হয়ে উঠেছিল।

বড় দুর্ঘটনা এড়ানো গেল

প্লেনটি যখন দ্রুত নিচের দিকে নামছিল, তখন যাত্রী ও ক্রুদের কয়েকজন নিজেদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ককপিটে ঢুকে পড়েন। তারা অভিযুক্ত সহকারী পাইলটকে নিয়ন্ত্রণে আনেন।

আহত পাইলটকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়। এরপর প্লেনটি সৌদি আরবের তাবুকে নিরাপদে অবতরণ করে।

ইসরায়েলি কর্মকর্তারা এই যাত্রীদের সাহসিকতার প্রশংসা করেছেন। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুও তাদের প্রশংসা করেছেন।

ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে প্লেনের ভেতরে আহত ও রক্তাক্ত দুই ব্যক্তিকে মেঝেতে পড়ে থাকতে দেখা যায়।

সূত্র: এনডিটিভি