গাজা যুদ্ধ চতুর্থ বছরে পা দিতে যাচ্ছে। এ উপলক্ষে চলতি সপ্তাহে গার্ডিয়ান গাজার পাঁচজন সাধারণ ফিলিস্তিনির দৈনন্দিন জীবনের গল্প তুলে ধরছে। চলমান যুদ্ধ কীভাবে তাদের জীবনকে ভয়াবহভাবে বদলে দিয়েছে, তারা নিজেরাই বলছেন সেই দিনের গল্প।
আলা হেসি প্রতিটি পদক্ষেপ খুব সাবধানে ফেলেন। পা তুলে সিঁড়ির ওপরের ধাপে ভার দিয়ে রাখেন, একটু শ্বাস নেন, তারপর রেলিংয়ে হাত রেখে নিজেকে টেনে নেন। ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড় করানো কাঠের সিঁড়িটি প্রতিটি পদক্ষেপে কেঁপে ওঠে। আট মাসের অন্তঃসত্ত্বা আলার ভারী পেট তার চলার গতি আরো ধীর করে দিয়েছে।
সিঁড়ির ওপরে উঠে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে শ্বাস নেন তিনি। এরপর এগিয়ে যান সেই জায়গাটিতে, যেখানে একসময় ছিল তাদের পরিবারের বাড়ির ওপরের তলা। এখন সেখানে একটি তাঁবু। পায়ের নিচে পড়ে আছে সেই বাড়ির ধ্বংসাবশেষ, যেখানে তিনি তার তিন সন্তান—১০ বছরের ওয়াসিম, ৭ বছরের মোহান্নাদ এবং ৫ বছরের খাওলাকে বড় করেছেন। আর যেখানে তারা তিনজনই প্রাণ হারিয়েছে। একটি ইসরাইলি বিমান হামলায় বাড়িটি ধ্বংস হয়ে গেলে তিন সন্তানই নিহত হয়।
আর প্রায় এক মাস পর আবারো মা হতে চলেছেন আলা।
ভোর
“সকালে যে শব্দে আমার ঘুম ভাঙে, তা হলো তাঁবুর ভেতরে মাছির ভনভনানি আর প্রতিবেশীদের কোলাহল। তাঁবুতে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা বলতে কিছু নেই, নিরাপত্তাও নেই। এখানে সবাই সবার গোপন কথা শুনতে পায়। কেউ যখন শৌচাগারে যায়, সেই শব্দও আমরা শুনি। এমনকি কারও শ্বাস নেওয়ার শব্দও শোনা যায়। আমার তাঁবুর জানালা সরাসরি হলুদ রেখার দিকে। এখান থেকে ইসরাইলি সেনাদের অবস্থান দেখা যায়। কখনো কখনো তারা আমাদের লক্ষ্য করে গুলি চালায়।
আমি আর আমার স্বামী সকালে চা পান করতে ভালোবাসি। কিন্তু এখন চা বানানোও কঠিন হয়ে গেছে। ইসরাইল গাজায় রান্নার গ্যাস ঢুকতে দিচ্ছে না, ফলে গ্যাসের তীব্র সংকট চলছে। তাই রান্না ও গরম পানীয় তৈরিতে আমাদের এখনো কাঠ আর খোলা আগুনের ওপর নির্ভর করতে হয়। কাঠ সংগ্রহ করা এবং আগুন জ্বালানোই আমাকে ক্লান্ত করে ফেলার জন্য যথেষ্ট।
চা খাওয়ার পর আমি তাঁবু গোছাই। সূর্যের তাপ খুব বেশি হওয়ার আগেই যতটা সম্ভব দ্রুত রান্না করার চেষ্টা করি। স্বামী ও নিজের কাপড়ও হাতে ধুয়ে নিই। এখন আট মাসের গর্ভবতী হওয়ায় এসব কাজ শারীরিকভাবে খুবই কষ্টকর।”
সকাল
আলা তাঁবুর পাশের জানালা খুলে দেন। সেটি আসলে ত্রিপলের একটি অংশ, যা সরিয়ে বাইরে তাকানোর মতো একটি ফাঁক তৈরি করা হয়েছে। চোখ আলোয় অভ্যস্ত হওয়ার পর স্পষ্ট দেখা যায়—যতদূর চোখ যায়, সবকিছু ধ্বংস হয়ে আছে। চারপাশজুড়ে শুধু ভাঙা কংক্রিট আর পেঁচিয়ে যাওয়া লোহার কাঠামো।
“আজ আমার গর্ভকালীন পরীক্ষা করানোর দিন। শিশুটির বেড়ে ওঠা ঠিকভাবে হচ্ছে কি না, সেটি দেখতে যেতে হবে।
জায়গাটি অনেক দূরে। আমি হেঁটেই সেখানে যাই। সাধারণত আমাকে নিয়ে যাওয়ার মতো কোনো যানবাহন পাওয়া যায় না। তাপমাত্রা ৩৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস। দিনের প্রচণ্ড গরমে বোমায় বিধ্বস্ত, ধ্বংসস্তূপে ভরা এবং পোকামাকড়ে পূর্ণ রাস্তায় হাঁটা অত্যন্ত কঠিন। যেখানে আমি গর্ভকালীন চিকিৎসা নিই, সেটিও কোনো হাসপাতাল বা যথাযথ স্বাস্থ্যকেন্দ্র নয়—একটি তাঁবু।
চিকিৎসকেরা আমার গর্ভাবস্থার জন্য পুষ্টিকর কিছু খাবারের পরিপূরক দিয়েছেন। এর আগে আমি গর্ভবতী হয়েছি। তাই বুঝতে পারছি, এবারের গর্ভাবস্থা একেবারেই আলাদা। যুদ্ধের মধ্যে যে অপুষ্টি ও খাবারের সংকটের মধ্য দিয়ে গিয়েছি, তা কাটিয়ে উঠতে চেষ্টা করি, আমার শরীর এখনো ভীষণ ক্লান্ত।
খাবারের তীব্র সংকট চলছে। আমার স্বামী আমার জন্য ফল ও সবজি কিনে আনেন। কিন্তু তিনি নিজে সেগুলো খান না। কারণ তিনি খুব অল্প পরিমাণ খাবারই কিনতে পারেন।
আমি যখন জানতে পারলাম আমি গর্ভবতী, তখন একই সঙ্গে দুটি সম্পূর্ণ বিপরীত অনুভূতি কাজ করছিল। একদিকে সন্তান আসছে বলে আমি আনন্দিত হয়েছিলাম। অন্যদিকে আমার সন্তান ওয়াসিম, মোহান্নাদ ও খাওলার কথা মনে পড়ে আমি অনবরত কাঁদতাম। সবকিছুই আমাকে তাদের কথা মনে করিয়ে দেয়। কোনো নির্দিষ্ট খাবার খেতে ইচ্ছা হলে ওয়াসিমের কথা মনে পড়ে। কারণ তাকে যখন গর্ভে ধারণ করেছিলাম, তখন ওই খাবারগুলো আমার খুব প্রিয় ছিল।
ক্লিনিকের নার্সদের আমি আমার পরিস্থিতি কিংবা মারা যাওয়া সন্তানদের কথা বলি না। কারণ স্বাস্থ্যকর্মীরাও মানসিকভাবে ভীষণ ক্লান্ত। তারা সান্ত্বনা বা মানসিক সহায়তা দেওয়ার মতো অবস্থায় নেই। গাজায় আমার গল্প কোনো ব্যতিক্রম নয়। এখানকার বহু নারী তাদের সন্তান হারিয়েছেন।
পুষ্টিবিদের সঙ্গে সাক্ষাতের পর মাতৃত্বকালীন মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের সঙ্গেও আমার দেখা হয়। তারা আমাকে শ্বাস-প্রশ্বাসের দিকে মনোযোগ দিতে বলেন—গভীরভাবে শ্বাস নিতে, কিছুক্ষণ ধরে রাখতে এবং ধীরে ধীরে ছেড়ে দিতে।
এরপর আমি হেঁটে বাড়ি ফিরি।”
বিকেল
আবার সেই সিঁড়ি বেয়ে উঠছেন আলা। একটি নীল ব্যাকপ্যাক তুলে নিয়ে তাঁবুর দিকে যাচ্ছেন তিনি। ব্যাগের ভেতরে রয়েছে তার মৃত সন্তানদের কিছু কাপড়। তিনি আশা করেন, একদিন নতুন সন্তান হয়তো সেগুলো পরতে পারবে।
বোমার বিস্ফোরণে কাপড়গুলোর অনেকটাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে—কোথাও ছিঁড়ে গেছে, কোথাও প্রান্ত পুড়ে গেছে। তবুও সেগুলো এখনো পরার উপযোগী। আলা যত্ন করে একটি স্নুপি-ছাপের টি-শার্ট এবং দুটি তুলতুলে পমপম লাগানো একটি টুপি বের করেন। এরপর বের করেন আয়ারল্যান্ডের কর্কের ছোট ফুটবল ক্লাব ক্যাসলভিউ এএফসির একটি স্কার্ফ, যেটি তার ছেলে ওয়াসিম খুব ভালোবাসত।
“ও সব সময় এটা পরত, এমনকি গরমের সময়ও। আমি বলতাম, ‘ওয়াসিম, অনেক গরম, এটা খুলে ফেলো।’ আর সে বলত, ‘না, আমি এটা ভালোবাসি।’”
“বিকেলটা আমি আমার ভাইয়ের সঙ্গে কাটাই। নতুন শিশুর জন্য কাপড়গুলো কীভাবে সংরক্ষণ করা যায়, আমরা সেটি নিয়ে ভাবি।
ভাই একটি শক্ত কার্ডবোর্ডের বাক্স অথবা কাঠের বাক্স ব্যবহারের পরামর্শ দেয়। কিন্তু আমাদের সবচেয়ে বড় চিন্তা ইঁদুর নিয়ে। এখানে সর্বত্র ইঁদুর। প্রতি রাতে আমরা তাদের শব্দ শুনি। তারা কোনো না কোনোভাবে তাঁবুর ভেতরে ঢুকেই পড়ে। যে জায়গা দিয়ে তারা ঢুকেছিল, আমি সেটি সেলাই করে বন্ধ করে দিয়েছিলাম। কিন্তু তারা নতুন জায়গা তৈরি করে আবার ঢুকেছে। আজ তাঁবুর পাশের দিকে আমরা আরেকটি গর্ত পেয়েছি।
আমরা ভাবছি ইঁদুর মারার বিষ ব্যবহার করা যায় কি না। কিন্তু আমার ভাইয়ের ভয়, এতে ইঁদুরগুলো তাঁবুর ভেতরেই মারা যেতে পারে এবং রোগ ছড়িয়ে পড়তে পারে। আসন্ন শিশুটির জন্য আমি শুধু এমন একটি নিরাপদ জায়গা চাই, যেখানে ইঁদুর পৌঁছাতে পারবে না। শিশুটি খুব ছোট হবে, আর আমি তার নিরাপত্তা নিয়ে আতঙ্কিত। আমি তার জন্য একটি ভালো শিশুশয্যা চাই। কিন্তু এখন গাজায় শিশুশয্যা পাওয়া কঠিন। তার ওপর তাঁবুটিও ইতোমধ্যে অতিরিক্ত ভিড়ে ঠাসা।
গাজার বাইরে থাকা মানুষদের কাছে আমি চাই তারা বুঝুক, একটি তাঁবুতে জীবনযাপন কতটা অপমানজনক। এটি কঠিন, মর্যাদাহীন এবং গভীরভাবে অমানবিক। চারদিকেই এখনো মৃত্যু আমাদের ঘিরে আছে।”
সন্ধ্যা
বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামার সময় আলা তার সন্তানদের ছবি দেখতে মোবাইল ফোনে স্ক্রল করেন। গাজার আরো অনেক মানুষের মতো তার ফোনটিও পুরোনো। পর্দা ফেটে গেছে। দীর্ঘ অবরোধের পর নতুন স্মার্টফোন এখন গাজায় আসছে, কিন্তু সেগুলোর দাম বেশি হওয়ায় অনেক পরিবারের পক্ষেই তা কেনা সম্ভব নয়।
ফোনের স্পিকার থেকে ক্ষীণ শব্দে ভেসে আসে শিশুদের কণ্ঠ। খাওলা তার বড় ভাইকে খুনসুটি করছে।
“মা, আমি সবচেয়ে সুন্দর!” চিৎকার করে খাওলা।
মোহান্নাদ হেসে জবাব দেয়, “না—আমিই সবচেয়ে সুন্দর!”
“আমি শুধু আমার স্বামীর সঙ্গেই সন্তানদের নিয়ে কথা বলি। তিনিই একমাত্র মানুষ, যিনি একই ধরনের কষ্ট বয়ে বেড়াচ্ছেন এবং আমার হৃদয়ের ভেতরের কথাগুলো সত্যিই বোঝেন।
আমি যখন দুর্বল হয়ে পড়ি, তিনি আমাকে শক্তি দেন। তিনি যখন কষ্ট পান, আমি তাকে সান্ত্বনা দেওয়ার এবং মানসিকভাবে পাশে থাকার চেষ্টা করি। আমরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা আমাদের সন্তানদের নিয়ে কথা বলি—তাদের স্বভাব, তারা কী ভালোবাসত, কীভাবে আচরণ করত। আমরা একসঙ্গে তাদের কবরেও যাই।
এই জায়গাটির প্রতিটি অংশ এখনো আমার সন্তানদের স্মৃতি ধরে রেখেছে। এটি আমাকে আমাদের আগের সুন্দর জীবনের কথা মনে করিয়ে দেয়। এই ধ্বংসস্তূপের দিকে তাকালেই আমার সন্তানদের কথা মনে পড়ে—তাদের সঙ্গে কাটানো জীবন, তাদের বড় করে তোলা, তাদের জন্য খাবার তৈরি করা এবং তাদের শেখানোর দিনগুলোর কথা।
তারা চলে যাওয়ার পর সব সুন্দর কিছুই যেন হারিয়ে গেছে।
কখনো কখনো ভয় আমাকে গ্রাস করে। কারণ আমি আমার সন্তানদের হারিয়েছি, আবারো আমার শিশুকে হারানোর ভয় হয়। আমি আশা করি, আমার নতুন সন্তান তার ভাই-বোনদের চেয়ে ভালো জীবন পাবে। সে নিরাপদে থাকবে।”
দ্য গার্ডিয়ানে এই প্রতিবেদন প্রকাশের কিছুক্ষণ পর আলা একটি সুস্থ পুত্রসন্তানের জন্ম দেন। বড় ভাইয়ের স্মরণে তিনি শিশুটির নাম রাখেন ওয়াসিম।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান