Image description

বিদ্রোহী বাহিনীর তীব্র আক্রমণের মুখে ২০২৪ সালের ৮ ডিসেম্বর প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের দেশত্যাগের মধ্য দিয়ে সিরিয়ায় আসাদ পরিবারের দীর্ঘ ৫৩ বছরের শাসনের অবসান ঘটে। তবে আসাদ যুগের পতনের পর থেকেই সিরিয়া ভূখণ্ডে ইসরায়েলি বাহিনীর সামরিক আগ্রাসন ও অনুপ্রবেশের মাত্রা আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। আসাদ শাসনের সমাপ্তি থেকে শুরু করে চলতি বছরের ১৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দক্ষিণ সিরিয়ায় ১ হাজারের বেশি বার সামরিক অনুপ্রবেশ চালিয়েছে ইসরায়েল।

 

শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) সিরিয়ান অবজারভেটরি ফর হিউম্যান রাইটসের (এসওএইচআর) প্রকাশিত প্রতিবেদনের বরাতে এ তথ্য জানিয়েছে ইরানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম প্রেসটিভি। এই পরিসংখ্যান সিরিয়ার ভূখণ্ডে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর অব্যাহত উপস্থিতি ও চলতি বছরজুড়ে এ ধরনের উদ্বেগজনক তৎপরতা বৃদ্ধির বিষয়টি উঠে এসেছে।

 

ব্রিটেনভিত্তিক যুদ্ধ পর্যবেক্ষণকারী সংস্থাটি প্রতিবেদনে জানায়, সিরিয়ার ভূখণ্ডে ইসরায়েলি অনুপ্রবেশের মধ্যে তল্লাশি, গ্রেপ্তার, ভূমি পরিষ্কার এবং দুর্গ ও সামরিক অবস্থান স্থাপনের মতো কার্যক্রম রয়েছে। ২০২৫ সালে মোট ৪৬০টি ইসরায়েলি অনুপ্রবেশের ঘটনা নথিভুক্ত করা হয়েছে। মাসভিত্তিক হিসাবে জানুয়ারিতে চারটি, ফেব্রুয়ারিতে ১৯টি, মার্চে ৩০টি, এপ্রিলে ৩০টি, মে মাসে ৩০টি, জুনে ৩৮টি, জুলাইয়ে ৩২টি, আগস্টে ৩৫টি, সেপ্টেম্বরে ৩৬টি, অক্টোবরে ৪০টি, নভেম্বরে ৯০টি এবং ডিসেম্বরে ৭৬টি অনুপ্রবেশ ঘটে।

 

২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে ১৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মোট ৫৯৪টি ইসরায়েলি অনুপ্রবেশ নথিভুক্ত করেছে পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রটি। মাসভিত্তিক হিসাবে জানুয়ারিতে ৫১টি, ফেব্রুয়ারিতে ৫১টি, মার্চে ৬৮টি, এপ্রিলে ৬২টি, মে মাসে ৭৮টি, জুনে ৭৩টি, জুলাইয়ে ৬৪টি, আগস্টে ৯৫টি এবং সেপ্টেম্বরে প্রায় ৫২টি অনুপ্রবেশের ঘটনা ঘটেছে।

 

এ ছাড়া ২০২৪ সালের ৮ ডিসেম্বর আল-আসাদ সরকারের পতনের পর ওই মাসের শেষ পর্যন্ত আরও ১৪টি অনুপ্রবেশ নথিভুক্ত করা হয়। এতে সরকার পতনের পর থেকে চলতি বছরের ১৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নথিভুক্ত মোট ইসরায়েলি অনুপ্রবেশের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৬৮টি।

 

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ইসরায়েলি সামরিক তৎপরতা স্থল অনুপ্রবেশের বাইরেও বিস্তৃত হয়েছে। ২০২৬ সালের শুরু থেকে এসওএইচআর সিরিয়ার ভূখণ্ডে ৭৮টি ইসরায়েলি সামরিক হামলা নথিভুক্ত করেছে। এর মধ্যে ৬টি বিমান হামলা এবং ৭২টি স্থল হামলা। এসব অভিযানে সামরিক পরিবহন যান ছাড়াও অবশিষ্ট অস্ত্র ও গোলাবারুদের মজুতকেন্দ্র, প্রশাসনিক সদর দপ্তর ও অভিযান কেন্দ্রসহ প্রায় ১৩টি স্থান লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে।

 

গত আগস্ট জর্ডানে একটি উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হলেও দক্ষিণ সিরিয়ায় ইসরায়েলি সামরিক অভিযান অব্যাহত রয়েছে। ওই বৈঠকে সিরিয়ার শাসক দল হায়াত তাহরির আল-শামের (এইচটিএস) প্রধান কূটনৈতিক প্রতিনিধি আসাদ আল-শাইবানি এবং ইসরায়েলি গুপ্তচর সংস্থা মোসাদের পরিচালক রোমান গোফম্যান অংশ নেন।

 

বার্তা সংস্থা এএফপিকে দেওয়া দুটি নির্ভরযোগ্য সূত্রের মতে, বৈঠকে একাধিক বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল সিরিয়ায় সম্ভাব্য সামরিক সংঘাত প্রতিরোধে জর্ডানে যুক্তরাষ্ট্রের পরিচালনায় একটি ‘বিশেষ অভিযান কেন্দ্র’ প্রতিষ্ঠার বিষয়টি। বিশেষ করে তুরস্ক জড়িত থাকতে পারে এমন সংঘাত প্রতিরোধের বিষয়টি আলোচনায় আসে।

গত ১৮ আগস্ট সিরিয়ার উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় ইদলিব প্রদেশের আবু আল-দুহুর সামরিক বিমানঘাঁটির রানওয়ে লক্ষ্য করে ইসরায়েলি সামরিক বিমান আটটি বিমান হামলা চালায়। এতে ঘাঁটির অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষতি হয়। ওই সময় ঘটনাস্থলে একটি তুর্কি সামরিক প্রতিনিধিদল উপস্থিত ছিল।

 

২০২৪ সালের ডিসেম্বরের শুরুতে আসাদ সরকারের পতনের পর থেকে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী সিরীয় সশস্ত্র বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে থাকা সামরিক স্থাপনা, ঘাঁটি ও গোলাবারুদের মজুতকেন্দ্রে ধারাবাহিক বিমান হামলা চালিয়ে আসছে। সিরিয়ার সঙ্গে ১৯৭৪ সালের যুদ্ধবিরতি চুক্তি বাতিল ও সংঘাতকবলিত দেশটির অস্থিতিশীলতাকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের সাম্রাজ্যবাদী উচ্চাকাঙ্ক্ষা সম্প্রসারণের অভিযোগে ইসরায়েল ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েছে।

 

ইসরায়েলি সামরিক হামলাগুলো প্রধানত দক্ষিণ সিরিয়ার কুনেইত্রা, দারা ও দামেস্ক প্রদেশকে লক্ষ্য করে চালানো হয়েছে। যাচাইকৃত সব ইসরায়েলি হামলার প্রায় ৮০ শতাংশই এসব অঞ্চলে সংঘটিত হয়েছে।