ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও সংশ্লিষ্ট দেশগুলোতে (ইইউ+) চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ছয় মাসে ২০ হাজার বাংলাদেশি আশ্রয় চেয়ে আবেদন করেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন এজেন্সি ফর অ্যাসাইলামের (ইইউএএ) প্রকাশিত ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী আশ্রয় প্রবণতা পর্যালোচনা প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
বৃহস্পতিবার প্রকাশিত প্রতিবেদনটিতে বলা হয়, ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী পর্যালোচনার এই তথ্য ইউরোপীয় ইউনিয়নের পুরোনো আশ্রয় নীতিমালার অধীনে সবশেষ পূর্ণাঙ্গ তথ্য।কারণ, এ বছরের ১২ জুন থেকে নতুন আশ্রয় বিধিমালা কার্যকর করেছে ইইউ।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে বাংলাদেশি আশ্রয়প্রার্থীদের আবেদন ১৩ শতাংশ বেড়েছে। একই সময়ে পুরো জোটে আশ্রয়প্রার্থীদের আবেদন কমলেও বাংলাদেশি নাগরিকদের মধ্যে আবেদন বৃদ্ধির এই প্রবণতা দেখা গেছে। এর মাধ্যমে ২০ হাজার আবেদন নিয়ে আবেদনকারী জাতীয়তার তালিকায় তৃতীয় অবস্থানে আছে বাংলাদেশ। ৩৯ হাজার আবেদন নিয়ে শীর্ষে আছে আফগানিস্তান ও ৩৩ হাজার আবেদন নিয়ে দ্বিতীয়তে ভেনেজুয়েলা।
এদিকে, বাংলাদেশি আবেদনকারীদের আন্তর্জাতিক সুরক্ষা পাওয়ার সম্ভাবনা অত্যন্ত কম। গত ১২ জুন থেকে চালু হওয়া ইউরোপীয় দেশগুলোর নতুন আশ্রয় প্রক্রিয়া বিধিমালা অনুযায়ী, যেসব দেশের নাগরিকদের আশ্রয় আবেদনের প্রথম ধাপে সুরক্ষা পাওয়ার গড় হার বা আবেদন মঞ্জুরের হার ২০ শতাংশের নিচে, তাদের জন্য দ্রুত যাচাই প্রক্রিয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এসব দেশকে ইইউ ‘নিরাপদ দেশ’ হিসেবে বিবেচনা করে থাকে এবং আশ্রয়প্রার্থীদের জন্য নিজ নিজ দেশ ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ না হওয়ায় তাদের আবেদন ফিরিয়ে দেওয়া হয়।
অর্থাৎ, যদি কোনো দেশের নাগরিকদের ১০ হাজার আশ্রয় আবেদন জমা পড়ে এবং প্রথম ধাপের সিদ্ধান্তে ৩০০ জন সুরক্ষা পান, তাহলে ওই দেশের প্রথম ধাপে সুরক্ষা হার হবে ৩ শতাংশ।
সে হিসেবে ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে বাংলাদেশি আবেদনকারীদের প্রথম পর্যায়ের স্বীকৃতির হার ভেনেজুয়েলা ও মিসরের নাগরিকদের মতো ৫ শতাংশেরও নিচে ছিল।
এই সময়ে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর প্রথম পর্যায়ের স্বীকৃতির হার ছিল ৩১ শতাংশ। কর্তৃপক্ষগুলো আশ্রয়প্রার্থীদের সহায়ক সুরক্ষার তুলনায় শরণার্থী মর্যাদা দেওয়ার প্রবণতা বেশি দেখিয়েছে।
ইউরোপের দেশগুলোর মধ্যে ইতালিতে সবচেয়ে বেশি আশ্রয় আবেদনকারী বাংলাদেশি হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। ২০২৫ সালের জুন থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত এক বছরে দেশটিতে বাংলাদেশিদের প্রায় ২৮ হাজার আবেদন জমা পড়েছে। যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় অপরিবর্তিত ছিল (৩ শতাংশ কমেছে)।
ইউরোপে বাংলাদেশি নাগরিকদের অসম্পন্ন আশ্রয় আবেদন বা অপেক্ষমাণ মামলার সংখ্যাও উল্লেখযোগ্য হারে বেশি। ২০২৬ সালের জুনের শেষ পর্যন্ত প্রথম পর্যায়ে বাংলাদেশিদের ৩৬ হাজার আবেদন নিষ্পত্তির অপেক্ষায় ছিল।
সবচেয়ে বেশি অসম্পন্ন আবেদন ছিল ভেনেজুয়েলার নাগরিকদের। তাদের এক লাখ ২৯ হাজার আবেদন ঝুলে ছিল। তালিকার দ্বিতীয় অবস্থানে আছে সিরিয়া। দেশটির প্রায় ৭৬ হাজার নাগরিকের আশ্রয় আবেদন নিষ্পত্তি হয়নি, কলম্বিয়ার ৬৪ হাজার ও পেরুর ৩৮ হাজার আবেদনও অমীমাংসিত ছিল।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও সংশ্লিষ্ট দেশগুলোতে সামগ্রিকভাবে ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে আন্তর্জাতিক সুরক্ষার জন্য প্রায় তিন লাখ ৩২ হাজার আবেদন জমা পড়েছে। ২০২৫ সালের একই সময়ের তুলনায় এ সংখ্যা ১৭ শতাংশ কম।
২০২১ সালের পর চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে এটিই সবচেয়ে কম আবেদনসংখ্যা। পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৪ সালের শেষ দিক থেকে আশ্রয়প্রার্থী আবেদনের যে নিম্নমুখী প্রবণতা শুরু হয়েছে, তা এ বছরও অব্যাহত রয়েছে।
ইইউএএ জানিয়েছে, সিরিয়ার রাজনৈতিক পরিবর্তনের অনিশ্চয়তা, ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোতে প্রবেশের ক্ষেত্রে প্রতিবেশী দেশগুলোর বাড়তি সীমান্ত নিরাপত্তা সহযোগিতার কারণে আবেদনকারীদের আশ্রয় আবেদনের ধরনে পরিবর্তন এসেছে, যা সামগ্রিক আবেদন কমাতে ভূমিকা রেখেছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, মধ্যপ্রাচ্যে সাম্প্রতিক সংঘাত বেড়ে গেলেও তা ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও সংশ্লিষ্ট দেশগুলোতে আশ্রয় আবেদনের সংখ্যা বাড়ায়নি।
প্রধান আবেদনকারী জাতীয়তাগুলোর মধ্যে আফগান নাগরিকদের আবেদন ২০২৫ সালের তুলনায় ৭ শতাংশ কমে ৩৯ হাজারে দাঁড়িয়েছে। ২০২৫ সালের শেষ দিকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও সংশ্লিষ্ট দেশগুলোতে থাকা আফগান নারীদের পুনরায় আবেদন করার কারণে এই সংখ্যা বেড়েছিল।
ভেনেজুয়েলার নাগরিকদের আবেদন প্রায় এক-তৃতীয়াংশ কমে দাঁড়িয়েছে ৩৩ হাজারে। এর মধ্যে ৯৩ শতাংশ আবেদন জমা পড়েছে স্পেনে।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আবেদন পেয়েছে ফ্রান্স। দেশটি ৬৯ হাজার আবেদন গ্রহণ করেছে, যা মোট আবেদনের এক-পঞ্চমাংশ। এর পরেই রয়েছে ইতালি ৬৬ হাজার, স্পেন ৫৫ হাজার এবং জার্মানি ৫৫ হাজার আবেদন নিয়ে। এই চার দেশ মিলে মোট আবেদনের প্রায় তিন-চতুর্থাংশ গ্রহণ করেছে।
জনসংখ্যার অনুপাতে সবচেয়ে বেশি আবেদন পেয়েছে গ্রিস। দেশটিতে ২৩ হাজার আবেদন জমা পড়েছে, যা প্রতি ৪০০ জন বাসিন্দার বিপরীতে প্রায় একজন আবেদনকারীর সমান।
সব মিলিয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও সংশ্লিষ্ট দেশগুলোতে প্রথম পর্যায়ে নিষ্পত্তির অপেক্ষায় থাকা আবেদন এক বছরে ৮ শতাংশ কমে জুনের শেষে প্রায় সাত লাখ ৭০ হাজারে দাঁড়িয়েছে। প্রশাসনিক ও বিচারিক সব পর্যায়ের আবেদন একত্র করলে মোট ঝুলে থাকা মামলার সংখ্যা প্রায় ১১ লাখ ৮০ হাজার।
চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসের বেশি সময় ধরে অপেক্ষমাণ পুরোনো আবেদনগুলো মোট ঝুলে থাকা আবেদনের ৭৩ শতাংশ। এক বছর আগে এই হার ছিল ৬৮ শতাংশ।