Image description

২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর। নতুন সহস্রাব্দের শুরুতেই বিশ্বমানবতাকে কাঁপিয়ে দিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রে আল-কায়েদার আত্মঘাতী বিমান হামলা। ৯/১১ হিসেবে পরিচিতি পাওয়া সেই ঘটনার ২৫ বছর পূর্তি আজ (শুক্রবার)।

সিকি শতাব্দি পর পেছনে ফিরে তাকালে স্পষ্ট হয় যে, ঘৃণ্য সেই সন্ত্রাসী হামলা কেবল যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকেই বদলে দেয়নি, একই সঙ্গে বিশ্বরাজনীতি, সামরিক কৌশল, গোয়েন্দা কার্যক্রম ও সন্ত্রাসবিরোধী নীতির গতিপথও পাল্টে দিয়েছিল।

একটি রাষ্ট্রের প্রথম ও অপরিহার্য দায়িত্ব হলো নাগরিকদের জীবনের নিরাপত্তা দেওয়া। কিন্তু ৯/১১ ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্র সেই দায়িত্ব পালনে ভীষণভাবে ব্যর্থ হয়েছে। বিশ্বের অন্যতম পরাশক্তির গোয়েন্দা ব্যবস্থার দুর্বলতাও সামনে এনেছিল সেই ঘটনা। হামলার আগে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর হাতে আল-কায়েদা ও ওসামা বিন লাদেন সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ছিল। কিন্তু বিক্ষিপ্ত তথ্যগুলোকে এক করে সম্ভাব্য হামলার বিষয়ে সতর্কতামূলক পদক্ষেপ নিতে পারেনি তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের প্রশাসন।

১১ সেপ্টেম্বরের সেই সকালে ছিনতাই করা চারটি যাত্রীবাহী বিমান নিয়ে একযোগে তিন জায়গায় হামলা চালায় আল-কায়েদা। দুটি বিমান আঘাত হানে নিউইয়র্কের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের টুইন টাওয়ারে। আরেকটি ওয়াশিংটনে মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগের সদরদপ্তর পেন্টাগনে। চতুর্থ বিমানটি পেনসিলভানিয়ায় বিধ্বস্ত হয়। যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ সেই সন্ত্রাসী হামলায় মোট ২ হাজার ৯৭৭ জন প্রাণ হারান।

মার্কিন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ অনেক বছর ধরেই আল-কায়েদা ও ওসামা বিন লাদেনের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে অবগত ছিল। লাদেনকে অনুসরণের জন্য পৃথক টাস্কফোর্সও ছিল। এফবিআই ও সিআইএর কাছে এমন কিছু তথ্য ছিল, যেগুলো যথাযথভাবে বিনিময় ও বিশ্লেষণ করা গেলে হামলার ষড়যন্ত্র প্রতিহতের সুযোগ তৈরি হতে পারত।

কিন্তু তা হয়নি। মানবিক সেই বিপর্যয়ের পর গঠন করা হয় ৯/১১ কমিশন। তাদের তদন্ত প্রতিবেদনে হামলা ঠেকাতে সরকারের ব্যর্থতার পেছনে গোয়েন্দা ব্যবস্থায় ‘চিন্তার ঘাটতি’ এবং নীতি, সক্ষমতা ও ব্যবস্থাপনার ত্রুটিকে দায়ী করা হয়।

হামলার ৯ দিন পর ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ ঘোষণা করেন বুশ। ২০০১ সালে আফগানিস্তানে এবং ২০০৩ সালে ইরাকে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে সামরিক অভিযান আন্তর্জাতিক রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে। সন্ত্রাসবিরোধী লড়াইয়ে পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মধ্যে তথ্য বিনিময় বাড়ানো হয়। যুক্তরাষ্ট্রে গড়ে ওঠে ন্যাশনাল কাউন্টার টেররিজম সেন্টার ও ডিরেক্টর অব ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্স। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের ‘ফাইভ আইজ’ জোটও গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়ের গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়।

৯/১১-এর ঘটনায় সারা বিশ্বের কাছ থেকে সহানুভূতি পেয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু পরবর্তী সময়ে যে তাদের ‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ’ সব মহলের ইতিবাচক সমর্থন পেয়েছে, তা নয়। ইরাকে ‘গণবিধ্বংসী অস্ত্র’ থাকার অভিযোগ এনে সেখানে সামরিক অভিযান চালায় যুক্তরাষ্ট্র ও মিত্র বাহিনী। কিন্তু সেই গোয়েন্দা তথ্য ত্রুটিপূর্ণ ছিল বলে ব্যাপক সমালোচনা তৈরি হয়। যুক্তরাজ্যের তদন্তেও ইরাকের অস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে মার্কিন গোয়েন্দা তথ্যকে গুরুতরভাবে ত্রুটিপূর্ণ উল্লেখ করা হয়।

৯/১১-এর ঘটনা ও পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্রের তৎপরতা মানবাধিকার নিয়েও ব্যাপক বিতর্ক তৈরি করেছে। সম্ভাব্য নতুন হামলা ঠেকাতে যুক্তরাষ্ট্র ও মিত্রদের ব্যাপক ধরপাকড়, আটক ও জিজ্ঞাসাবাদ কার্যক্রম সমালোচিত হয়। গুয়ানতানামো বে কারাগারে বিনা বিচারে দীর্ঘমেয়াদে আটক রাখা এবং ইরাক ও আফগানিস্তানে বন্দিদের সঙ্গে দুর্ব্যবহারের ঘটনা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলোর সমালোচনার কারণ হয়ে ওঠে।

এরই মধ্যে বিশ্বরাজনীতির আরেকটি বড় পরিবর্তন ঘটে। সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের দিকে পশ্চিমা দেশগুলোর দীর্ঘ মনোযোগের মধ্যে রাশিয়া ও চীন সামরিক ও কৌশলগত সক্ষমতা বাড়াতে থাকে। শব্দের চেয়ে দ্রুতগতির দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রসহ নতুন প্রযুক্তিতে অগ্রগতি এবং সামরিক আধুনিকায়ন পশ্চিমা দেশগুলোর দীর্ঘদিনের কৌশলগত সুবিধাকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দেয়। একই সঙ্গে চীনের উত্থান ঘটেছে শুধু সামরিক শক্তির দৃষ্টিতে নয়, একই সঙ্গে অর্থনৈতিক পরিমণ্ডলেও। সেমিকন্ডাক্টর, বিরল খনিজ, ব্যাটারি, বন্দর, টেলিযোগাযোগের মতো খাতে পরাশক্তি হয়ে উঠেছে তারা।

৯/১১-পরবর্তী ২৫ বছরকে কেবল সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের ইতিহাস হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। একই সঙ্গে তা গোয়েন্দা ব্যবস্থার সংস্কার, নিরাপত্তা নীতির পরিবর্তন, সামরিক হস্তক্ষেপের বিতর্ক ও বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্য বদলে যাওয়ারও ইতিহাস।

সূত্র: বিবিসি