Image description

মাহফুজ আনামের কলাম 

ইসরায়েল এখন ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে তাই করছে, যেটা নাৎসিরা ইহুদিদের সঙ্গে করেছিল। তারা গাজা ও পশ্চিম তীরকে কার্যত বন্দিশিবিরে পরিণত করেছে। গ্যাস চেম্বারের জায়গায় প্রায় প্রতিদিন নিরস্ত্র ও অসহায় ফিলিস্তিনিদের ওপর বোমা হামলা চালাচ্ছে ইসরায়েল।

কী নির্মম পরিহাস! নাৎসি ও তাদের সহযোগীরা ইউরোপজুড়ে লাখো ইহুদিকে হত্যা করেছিল, পুরো বিশ্ব তাদের দুর্দশায় সহানুভূতিশীল হয়ে ন্যায়বিচার চেয়েছিল এবং দুর্ভাগ্যজনকভাবে সেই ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার মূল্য চুকাতে হচ্ছে ফিলিস্তিনিদের।

ইসরায়েলের অবিরাম বোমা হামলায় গাজা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। যারা এখন পর্যন্ত এই ধ্বংসযজ্ঞের মধ্যেও বেঁচে আছেন, তাদের খাবার ও জীবনধারণের ন্যূনতম সুযোগ-সুবিধা নেই, তাঁবুতে আশ্রয় নেওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। হাসপাতালগুলোতে বোমা হামলা হয়েছে, বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। এমনকি সুপেয় পানি থেকে তাদের বঞ্চিত করা হচ্ছে। সপ্তাহের পর সপ্তাহ, এমনকি মাসের পর মাস তাদের বাধ্য হয়ে সমুদ্রের পানি পান করতে হচ্ছে।

ইতোমধ্যে প্রায় ৮০ হাজার ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে ২০ হাজারেরও বেশি শিশু। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত ইতোমধ্যে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করলেও হামাসকে নির্মূল করার অজুহাতে তিনি ও তার দুষ্কর্মের সহযোগীরা এভাবেই সবচেয়ে অমানবিক ও বর্বর অপরাধ করে যাচ্ছেন।

ফিলিস্তিনে যারা এখনো বেঁচে আছেন, ভবিষ্যতের কোনো ধরনের আশা ছাড়াই কেবল টিকে থাকার লড়াই করে প্রতিটি দিন কাটছে তাদের। ইসরায়েলিরা গাজার বাসিন্দাদের অনাহারে রেখে নিশ্চিহ্ন করার চেষ্টা করছে। গোটা বিশ্বের চোখের সামনে এমন গণহত্যা সংঘটিত হচ্ছে, অথচ কেউই সেটার যথেষ্ট নিন্দা জানাচ্ছে না।

ট্র্যাজেডি হলো, বিশ্ববাসীর মনোযোগ এখন ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধের দিকে। ইতোমধ্যে প্রকাশ পেয়েছে, ইসরায়েল কৌশলে যুক্তরাষ্ট্রকে এই যুদ্ধে জড়িয়েছে। এর ফলে বৈশ্বিক সরবরাহ-ব্যবস্থায় বিশৃঙ্খলা, জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধি এবং অন্যান্য সংকট সৃষ্টি হয়েছে। এতে বিশ্ববাসীর মনোযোগ ফিলিস্তিন থেকে অনেকটাই সরে গেছে।

অনেকেই আশা করেছিলেন, ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধটি দ্রুতই শেষ হবে। কিন্তু সেটা না হওয়ায় বিশ্ববাসীর মনোযোগ অন্যদিকে থাকার সুযোগে ফিলিস্তিনে হত্যাকাণ্ড ও ভূখণ্ড দখল চালিয়ে যাচ্ছে ইসরায়েল।

এদিকে, গত ২ মার্চ থেকে দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি হামলায় ৪ হাজার ৩০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন প্রায় ১২ হাজার ৪০০ জন, আর বাস্তুচ্যুত হয়েছেন কয়েক লাখ মানুষ। দেশটির স্বাস্থ্যকর্মীদের ওপর ১৭৯ বার হামলা হয়েছে এবং এতে ১৩৫ জন স্বাস্থ্যকর্মী নিহত হয়েছেন।

গত অক্টোবরে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি শুরু হওয়ার পর থেকে গাজায় ১ হাজার ৩০০ জনের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। গাজার বিস্তীর্ণ এলাকা মাটির সঙ্গে মিশে গেলেও ইসরায়েলি বোমাবর্ষণ চলছেই। ইসরায়েলের কাছে ফিলিস্তিনিদের হত্যা করা যেন ‘বিনোদনের’ বিষয়ে পরিণত হয়েছে, যার সপক্ষে সবসময়ই কোনো না কোনো যুক্তি দাঁড় করানো হয়।

নতুন করে উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে পশ্চিম তীরে বসতি স্থাপনকারী ইসরায়েলিদের হামলা। এসব হামলায় ২০২৬ সালের ১০ আগস্ট পর্যন্ত ৭৬ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। এই বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা, স্থাপনা ধ্বংস এবং উচ্ছেদের কারণে অনেক ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।

ইসরায়েল যা-ই করছে তার নেপথ্যে রয়েছে ‘গ্রেটার ইসরায়েল’ বাস্তবায়নের পরিকল্পনা। এটি একটি রাজনৈতিক, ধর্মীয় ও জাতীয়তাবাদী ভাবনা, যা বর্তমান উগ্র ডানপন্থী সরকার বাস্তবায়ন করতে চায়। তারা বর্তমান ইসরায়েলের চেয়ে অনেক বড় একটি ভূখণ্ড চায়।

অর্থোডক্স ইহুদিদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, ‘গ্রেটার ইসরায়েল’-এর কথিত বাইবেলভিত্তিক সংস্করণের সীমানা নীল নদ থেকে ইউফ্রেটিস নদী পর্যন্ত বিস্তৃত। আরেকটি সংস্করণে ভূমধ্যসাগর থেকে জর্ডান নদী পর্যন্ত বিস্তৃত ভূখণ্ডের কথা বলা হয়। অনেক জায়নবাদী সমর্থিত একটি সংস্করণের মধ্যে রয়েছে পশ্চিম তীর ও গাজার ওপর স্থায়ী নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা। ইসরায়েল ইতোমধ্যে পূর্ব জেরুজালেম ও গোলান মালভূমি দখলে নিয়েছে।

১৯৬৭ সালের ছয়দিনের যুদ্ধের ফলাফল ইসরায়েলি নেতাদের আরও আত্মবিশ্বাসী করে তোলে, যেখানে ইসরায়েলের এমন বিজয় কেউ কল্পনাও করতে পারেনি। এরপরই তারা সিদ্ধান্তে পৌঁছায় যে, তাদের উচ্চাকাঙ্ক্ষী ‘গ্রেটার ইসরায়েল’ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন সম্ভব। সেই যুদ্ধের ১০ বছর পর ১৯৭৭ সালে মেনাখেম বেগিন ও তার লিকুদ পার্টি ক্ষমতায় এলে লিকুদ ও ইসরায়েলি ডানপন্থীদের আদর্শ গ্রেটার ইসরায়েলের ধারণা আরও দ্রুত বাস্তবায়িত হতে শুরু করে। বছরের পর বছর ধরে এই ধারণা আরও বিস্তৃত হয় এবং ক্রমেই বেশি সংখ্যক জায়নবাদী এটিকে নিজেদের পরিকল্পনা হিসেবে গ্রহণ করেন।

এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হলে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীকে শক্তিশালী হতে হতো। এর ফলে সামরিক বাহিনীর সম্প্রসারণ এবং ইসরায়েলের বিভিন্ন এলাকায় ডানপন্থী মিলিশিয়া গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হয়। যুক্তরাষ্ট্র জেনে বা না জেনে এই পরিকল্পনার অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠে।

ফলে লক্ষ্যটি স্পষ্ট—পশ্চিম তীরে ইহুদি বসতি সম্প্রসারণ করা এবং সেগুলোকে যতটা সম্ভব স্থায়ী করা, যাতে আন্তর্জাতিক চাপের কারণে পরিস্থিতির পরিবর্তন হলেও এসব বসতি সরিয়ে দেওয়া শুধু কঠিন নয়, অসম্ভব হয়ে পড়ে।

১৯৬৭ সালের ওই যুদ্ধের পর পশ্চিম তীরে বসতি স্থাপন শুরু করে ইসরায়েল। ১৯৭২ সালের মধ্যে বসতির সংখ্যা দাঁড়ায় ১৪টিতে এবং চার বছরের মধ্যে তা বেড়ে ২০টিতে পৌঁছায়, যেখানে বসতি স্থাপনকারীর সংখ্যা ছিল ৩ হাজার ২০০।

এই যুক্তি তাদের মধ্যে আরও জোরালো হয়ে ওঠে যে, জুডিয়া ও সামারিয়া কেবল কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণই নয়, ধর্মীয়ভাবেও এগুলো গ্রেটার ইসরায়েলের অংশ হওয়ার জন্য নির্ধারিত। বেগিন ক্ষমতায় আসার পর বসতি স্থাপনকারীর সংখ্যা ৩ হাজার ২০০ থেকে বেড়ে ১৭ হাজার ৪০০-তে দাঁড়ায় এবং বসতির সংখ্যাও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। ১৯৮৩ সালের মধ্যে বসতি স্থাপনকারীর সংখ্যা দাঁড়ায় ২২ হাজার ৮০০-তে এবং স্বীকৃত বসতির সংখ্যা ৭৬টিতে।

এক হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬ সালে এসে পশ্চিম তীরে বসতি স্থাপনকারীর সংখ্যা ৫ লাখ ছাড়িয়েছে। প্রাথমিক পর্যায়ে, ১৯৬৭ থেকে ১৯৭৭ সাল পর্যন্ত নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে বসতিগুলোকে ন্যায্যতা দেওয়া হতো; ১৯৭৭ থেকে ১৯৯২ সাল পর্যন্ত তা আরও বেশি আদর্শিক রূপ নেয়; আর ১৯৯৩ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত বসতি সম্প্রসারণ ব্যাপক আকার ধারণ করে। শেষ পর্যন্ত ২০০৯ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত যা ঘটেছে, তা হলো কার্যত সংযুক্তিকরণ।

এ সময়কালে শান্তিপূর্ণ সমাধানের একমাত্র বড় প্রচেষ্টা ছিল অসলো চুক্তি। ১৯৯২ সালে গোপনে এর সূচনা হয় এবং ইসরায়েল ও পিএলওর মধ্যে সরাসরি আলোচনায় রূপ নেয়। ১৯৯৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের উপস্থিতিতে আইজ্যাক রবিন ও ইয়াসির আরাফাত আনুষ্ঠানিকভাবে অসলো চুক্তিতে সই করেন।

এরপর ১৯৯৪ সালে গাজা-জেরিকো চুক্তি হয়, যার মাধ্যমে ফিলিস্তিনিদের স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠায় প্রথম বড় চুক্তি বাস্তবায়িত হয়। ১৯৯৫ সালে দ্বিতীয় অসলো চুক্তি সই হয়, যার মাধ্যমে পশ্চিম তীরকে এ, বি ও সি এলাকায় ভাগ করা হয়। লক্ষ্য ছিল ফিলিস্তিনিদের স্বায়ত্তশাসনের পরিধি বাড়ানো। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ভূখণ্ডটির ওপর ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণই আরও বেড়ে যায়। বর্তমানে পশ্চিম তীরের বিস্তৃত অবকাঠামো, সামরিক চৌকি, সড়ক, পৌর প্রশাসনের কর্তৃত্ব ও অর্থনৈতিক একীভূতকরণের কারণে বলা যায়, এটি কার্যত ইসরায়েলের সঙ্গে একীভূত হয়ে গেছে।

এমন পরিস্থিতিতে কানাডা, ডেনমার্ক, ফিনল্যান্ড, ফ্রান্স, আইসল্যান্ড, আয়ারল্যান্ড, নরওয়ে, পোল্যান্ড, পর্তুগাল, স্পেন, সুইডেন ও যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা সম্প্রতি যে যৌথ বিবৃতি দিয়েছেন, সেটি দ্বি-রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের পথে অত্যন্ত সময়োপযোগী একটি সম্মিলিত উদ্যোগ। মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী শান্তির জন্য এই দ্বি-রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানই এখন পর্যন্ত সামনে এগোনোর একমাত্র পথ।

যৌথ বিবৃতিতে দ্ব্যর্থহীনভাবে বলা হয়েছে, পশ্চিম তীরে ইসরায়েলের কর্মকাণ্ড ‘দ্বি-রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের সম্ভাবনাকে ক্ষুণ্ন করছে। বসতি স্থাপনকারীদের নজিরবিহীন মাত্রার সহিংসতা ও বসতি সম্প্রসারণের কারণে পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি ঘটছে।’

অবিলম্বে বসতি সম্প্রসারণ ও বেসামরিক প্রশাসনিক ক্ষমতা বৃদ্ধি বন্ধ করার আহ্বান জানানো হয়েছে বিবৃতিতে।

দেশগুলো আরও ঘোষণা করেছে, ন্যায়সঙ্গত ও স্থায়ী শান্তির লক্ষ্যে তারা উদ্যোগ নিতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।

বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের প্রাসঙ্গিক প্রস্তাব অনুযায়ী আমরা দ্বি-রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের প্রতি দ্ব্যর্থহীনভাবে অঙ্গীকারবদ্ধ, যা একটি সার্বভৌম, গণতান্ত্রিক ও কার্যকর ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র এবং ইসরায়েলকে শান্তি ও নিরাপত্তার সঙ্গে পাশাপাশি বসবাসের সুযোগ দেবে...’

নেতানিয়াহু ও তার উগ্র ডানপন্থী মন্ত্রিসভা ফিলিস্তিনিদের নির্মূল করার লক্ষ্য কখনো গোপন করেনি। এজন্য তারা সবসময় দ্বি-রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের ঘোর বিরোধিতা করে এসেছে। সেখানে এসব পশ্চিমা দেশের পক্ষ থেকে সেই দ্বি-রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধান পুনরুজ্জীবনের পক্ষে জোরালো সমর্থন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি।

এর আগে ইসরায়েলকে কখনো এমন ঐক্যবদ্ধ পশ্চিমা অবস্থানের মুখোমুখি হতে হয়নি। এক বছর আগে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের ব্যাপকতর স্বীকৃতির উদ্যোগ নেয় সৌদি আরব ও ফ্রান্স। যার ফলে আরও অনেক দেশও একই পথে এগিয়ে যায়। দ্বি-রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানে পশ্চিমা দেশগুলোর সর্বশেষ উদ্যোগটির আরও ব্যাপক আন্তর্জাতিক সমর্থন পাওয়া উচিত। সব আরব দেশেরই এর প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানানো উচিত, একইভাবে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়েরও।

এই সমাধানটি শুধু ফিলিস্তিনিদের জন্য নয়, বরং এমন একটি আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্যও করা উচিত, যেখানে আইনের শাসন থাকবে এবং যে ব্যবস্থা আমাদের সবার জন্য একটি উন্নততর বিশ্ব তৈরি করবে। তা না হলে আমরা এমন এক সভ্যতায় পরিণত হবো, যেখানে মূল্যবোধ, নৈতিকতা, ন্যায়বিচার এবং শান্তির কোনো স্থান থাকবে না।

মাহফুজ আনাম: সম্পাদক ও প্রকাশক, দ্য ডেইলি স্টার