হিমালয়ের কোলঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা নেপালের শান্ত জনপদগুলো এখন একেকটি জীবন্ত শ্মশান। প্রতিটি ঘরের আঙিনায় আছড়ে পড়ছে স্বজন হারানোর তীব্র হাহাকার। নুয়াকোট, রসুয়া, তানাহুন, চিতওয়ান, ধাদিং, গোরখা, নওয়ালপারসি পূর্ব ও পশ্চিম— সব ঘরেই একই দৃশ্য! প্রিয়জন হারানোর শোক, বুকফাটা কান্না, ফিরে আসার অপেক্ষা! এর মধ্যেই আবার জুড়ে বসেছে নতুন আপদ— ত্রাণসংকট। সঙ্গে ওষুধ-চিকিৎসার অভাব। নুয়াকোট, চিতওয়ান, পোখরার হাসপাতালগুলোতে উপচে পড়ছে মরদেহ। পা ফেলার জায়গা নেই ত্রিভুবন বিশ্ববিদ্যালেয়র ছোট চিকিৎসালয়েও। সবখানেই চাপা শোক; ছলছল চোখ— যেন জোট বেঁধে কাঁদছে পুরো নেপাল!
তিব্বতের ১৭ হাজার ফুটের বেশি উচু পর্বতশৃঙ্গ থেকে ধেয়ে আসা কাদামাটিতে চাপা পড়ে আছে ২০ লাখ জনপদের পুরো নেপাল সীমান্ত। নিখোঁজ স্বজনদের খুঁজতে গতকালও নুয়াকোটের সেনাক্যাম্পে ভিড় করেন শত শত মানুষ! শুধু এই এক জেলাতেই নিখোঁজ হাজার হাজার মানুষ! একই হাল বানভাসি বাকি জেলাগুলোতেও। অবর্ণনীয় সমাধিতে চাপা পড়া সন্তানের নিথর দেহের পাশে দাঁড়িয়ে কোনো মায়ের স্তব্ধ হয়ে যাওয়া, কিংবা সর্বগ্রাসী নারায়ণীর উত্তাল স্রোতে ভেসে যাওয়া বাবার হাতটা আর ধরতে না পারার যে নির্মম আকুতি— তা নেপালের আকাশ-বাতাসকে ভারী করে তুলেছে। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত হিমালয়ের হিমবাহ ধসে গত বুধবার সকালের ওই ভয়ংকর বানে নিখোঁজ ছয় শতাধিক পর্যটকের মধ্যে ২৫০ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে। এর মধ্যে ১১৮ জনই ভারতীয়। এখনো নিখোঁজ ৩২০ পর্যটক। নেপালের জাতীয় দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ গতকাল জানিয়েছে, এখনো নিখোঁজ প্রায় ২ হাজার ৪০০। মৃত বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬৭৫ জনে। এর মধ্যে শত শত মরদেহ পরিচয়হীন! জাতিসংঘের বরাতে বিবিসি জানিয়েছে, গতকাল পর্যন্ত প্রায় চার হাজার মানুষকে বন্যাকবলিত অঞ্চল থেকে উদ্ধার করেছে কর্তৃপক্ষ। যোগাযোগব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় উদ্ধার বা ত্রাণতৎপরতায়ও গতি নেই তেমন। এক্ষেত্রে নেপালের চেয়েও করুণদশা তিব্বতের। অস্থায়ী হ্রদ উপচে নতুন বন্যার আশঙ্কা ও প্রতিকূল পরিবেশের কারণে গত শুক্রবার পর্যন্ত শ্লথ ছিল উদ্ধার তৎপরতা। রাষ্ট্রীয় বিধিনিষেধের কারণে জানা যাচ্ছিল না খবরও। তবে গতকাল প্রথমবারের মতো হিমবাহ ধসের উৎসস্থল তিব্বত সীমান্তের গিরং পোর্টের কয়েকটি নতুন ভিডিও ফুটেজ প্রকাশ করেছে চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম। আকস্মিক বন্যায় ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের চিত্র ফুটে উঠেছে প্রকাশিত চিত্রে। এ দুর্যোগের ফলে তিব্বতের অন্তত নিখোঁজ ৫৫৫ এবং ৭ জনের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছে বেইজিং।
আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ সহায়তা চায় নেপাল
বিদেশি সহায়তা নেবে না— আগের সিদ্ধান্ত থেকে কিছুটা সরে এসেছে নেপাল। গতকাল সে ঘোষণাই দিলেন দেশটির অর্থমন্ত্রী ড. স্বর্ণিম ওয়াগলে। বলেছেন, অনুসন্ধান ও উদ্ধার অভিযানে অন্য কোনো দেশের সহায়তার প্রয়োজন নেই কাঠমান্ডর। তবে পুনর্গঠনের জন্য অর্থের প্রয়োজন। জানিয়েছেন, বন্যার ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে দেশ পুনর্গঠনে ৪ বিলিয়ন থেকে ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার প্রয়োজন হতে পারে। এই পুনর্গঠন ব্যয় দেশটির অর্থনীতির প্রায় এক-দশমাংশের সমান এবং এটি ২০১৫ সালের ভূমিকম্পের ক্ষয়ক্ষতির চেয়ে কম হবে। কাঠমান্ডুতে আয়োজিত এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে বিশ্বনেতাদের উদ্দেশে এ আহ্বান জানিয়েছে নেপালের অর্থ মন্ত্রণালয়, জাতীয় দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ।