Image description

নেপালে বুধবারে বয়ে যাওয়া প্রলয়ঙ্করী আকস্মিক বন্যার পেছনে বড় আকারের এক টুকরো হিমবাহ ধসে গিয়ে সাময়িকভাবে নদীর গতিপথ আটকে যাওয়াকেই মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন বিজ্ঞানীরা। গবেষকদের প্রাথমিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, নদীর পানি আটকে জমতে থাকার পর কয়েক ঘণ্টা বাদে তীব্র বেগে নিম্নাঞ্চলের দিকে বয়ে যাওয়ায় এই বিপর্যয়ের সৃষ্টি হয়।

উপগ্রহ ও ভূ-পৃষ্ঠ থেকে পাওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা এই দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ উদঘাটনের চেষ্টা করছেন। এই বন্যায় শত শত মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে এবং বিদেশি পর্যটক ও তীর্থযাত্রীসহ অনেকেই নিখোঁজ রয়েছেন।

মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস) বুধবার ৫.২ মাত্রার একটি হিমবাহ ধসের খবর প্রকাশ করেছে। এর ফলে সৃষ্ট ধ্বংসাবশেষ নদীর নিম্ন অববাহিকায় ছড়িয়ে পড়ে লোকালয়ে ভয়াবহ বিপর্যয় ঘটায়। স্থানীয় সিসমিক স্টেশন, দীর্ঘমেয়াদি ভূ-কম্পন তরঙ্গ এবং স্যাটেলাইট ছবির ওপর ভিত্তি করে সংস্থাটি এই তথ্য নিশ্চিত করেছে।

বর্তমানে বাংলাদেশে অবস্থান করা অস্ট্রিয়ার গ্রাজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূ-বিজ্ঞানী জ্যাকব স্টেইনার জানান, হিমবাহের নিচের বিশাল একটি অংশ খসে পড়েছে। স্যাটেলাইট ছবি দেখলে মনে হয়, কেউ যেন এক বিশাল ছুরি দিয়ে নিচের পুরো অংশটি কেটে আলাদা করে দিয়েছে এবং তা নিচে পড়ে গেছে।

তিনি আরও জানান, অত উঁচুখণ্ড থেকে বরফের বিশাল স্তূপ নিচে আছড়ে পড়াকে বড় কোনও বোমা বিস্ফোরণের সঙ্গে তুলনা করা চলে, যার ফলেই এই সার্বিক বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয়েছে।

বিজ্ঞানীরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে এই বিপর্যয়ের সরাসরি সংযোগ টানার ক্ষেত্রে এখনও কিছুটা তাড়াহুড়ো হয়ে যাবে। তবে তেল, গ্যাস ও কয়লা পোড়ানোর মতো মানবসৃষ্ট কর্মকাণ্ডের কারণে বিশ্বের তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই ধরণের দুর্যোগের ঝুঁকি ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশেষ করে হিমালয় পার্বত্য অঞ্চলে বৈশ্বিক গড়ের চেয়ে অনেক দ্রুত গতিতে তাপমাত্রা বাড়ছে।

কাঠমান্ডুভিত্তিক জলবায়ু গবেষণা সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ইন্টিগ্রেটেড মাউন্টেন ডেভেলপমেন্ট (ইসিমোড)-এর দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস বিশেষজ্ঞ সাসওয়াত সান্যাল বলেন, আমাদের সতর্ক থাকা দরকার এবং এখনই সরাসরি কোনও সংযোগ টানা উচিত নয়। তবে ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রা হিন্দুকুশ হিমালয় অঞ্চলের পরিবেশ পরিবর্তন করছে এবং হিমবাহ গলিয়ে দিচ্ছে।

হিমালয় অঞ্চলজুড়ে শত শত মানুষ ঘরবাড়ি হারিয়েছেন এবং জলবিদ্যুৎ বাঁধ, সড়ক, ভবন ও সেতুসহ গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।

পানি বৃদ্ধি পেয়েছিল ৯ মিটারপালানোর সুযোগ মেলেনি

কাঠমান্ডুভিত্তিক গবেষণা দলের তথ্যমতে, উজান থেকে বরফ ও পাথরের মিশ্রণ ভেঙে পড়ার কারণে প্লাবিত অঞ্চলের নদীগুলোতে মাত্র ৩০ মিনিটের মধ্যে পানির উচ্চতা প্রায় ৯ মিটার (২৯.৫ ফুট) পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়।

সাসওয়াত সান্যাল জানান, এটি ছিল পানির এক বিশাল এবং আকস্মিক বৃদ্ধি।

প্রাথমিক প্রমাণ বলছে, বরফ ও পাথরের বিশাল স্তূপ ভোটে কোশি নদীর উপনদী লেন্দে খোলা-তে গিয়ে আছড়ে পড়ে। এর ফলে পানি সরে গিয়ে পলল ও বিশাল পাথর খণ্ড টেনে এনে প্রলয়ঙ্করী ঢলের সৃষ্টি করে। ধ্বংসাবশেষ জমে নদীটি সাময়িকভাবে অবরুদ্ধ হয়ে বাঁধ তৈরি হয়েছিল কি না, যার ফলে পরবর্তীতে পানি জমে ফেটে গিয়ে বন্যার মাত্রা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়, তাও খতিয়ে দেখছেন গবেষকরা।

স্টেইনার জানান, পাহাড়ি অঞ্চলের বিপজ্জনক প্রাকৃতিক দুর্যোগের ইতিহাস ওই এলাকায় নতুন নয়। ২০২৫ সালে এই উপত্যকায় একটি হিমবাহ হ্রদ থেকে সৃষ্ট বন্যা আঘাত হানে এবং ২০২৪ সালে এই অঞ্চলে অপর একটি স্থানে বরফ ও পাথরের ধস নামে। এছাড়া ২০১৫ সালের নেপাল ভূমিকম্পের সময় বৃহত্তর লাংটাং অঞ্চল জুড়ে প্রলয়ঙ্করী তুষারধস ঘটেছিল।

হিমালয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ঝুঁকি

জলবায়ু বিজ্ঞানীদের মতে, হিন্দুকুশ হিমালয়ে দ্রুত তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা হিমবাহ, বরফের আস্তরণ এবং পর্বতের ঢালে বড় ধরনের পরিবর্তন আনছে। মেরু অঞ্চলের বাইরে সবচেয়ে বেশি পরিমাণ বরফ ও তুষার রয়েছে এই পর্বতমালায়। এখানকার ৬৩ হাজারের বেশি হিমবাহ এশিয়ার অন্তত ১০টি প্রধান নদী সৃষ্টি করেছে, যা কোটি কোটি মানুষের খাদ্য, পানি, জ্বালানি ও জীবিকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করে।

তবে সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে সাড়ে চার হাজার থেকে ছয় হাজার মিটার উঁচুতে অবস্থিত ৭৮ শতাংশ হিমবাহ এলাকা উষ্ণায়নের উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে। স্টেইনার আফসোস প্রকাশ করে বলেন, গতকাল যা ঘটেছে তা দুর্ভাগ্যবশত এক নতুন স্বাভাবিক ঘটনা। পরিস্থিতি এখান থেকে আরও খারাপের দিকে যাবে।

রেকর্ড শুরু হওয়ার পর থেকে গত এক দশক ছিল বিশ্বের সবচেয়ে উষ্ণ সময় এবং ২০২৪ সাল ছিল ইতিহাসের উষ্ণতম বছর। জাতিসংঘের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০০০ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে হিমবাহগুলো থেকে প্রতি বছর ২৬৭ গিগাটন বরফ গলেছে, যা গিজার গ্রেট পিরামিডের প্রায় ৪৬ হাজার ৫০০টির সমান।

এমনকি বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি যদি ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসেও সীমাবদ্ধ রাখা সম্ভব হয়, তবুও ২১০০ সালের মধ্যে গ্রিনল্যান্ড ও অ্যান্টার্কটিকা বাদে বিশ্বের ৫০ শতাংশ হিমবাহ বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। আর বর্তমান নীতি অনুযায়ী এই শতাব্দীর শেষ নাগাদ পৃথিবীর তাপমাত্রা প্রাক-শিল্পায়নের সময়ের চেয়ে প্রায় ২.৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস বৃদ্ধি পেতে পারে।

ইসিমোডের গবেষণা অনুযায়ী, এই পর্বতগুলোর হিমবাহ মারাত্মক দ্রুত গতিতে গলছে এবং ২০০০ সালের পর থেকে বরফ গলার হার দ্বিগুণ হয়ে গেছে। গলে যাওয়া হিমবাহের পানি হিমবাহ হ্রদগুলোকে পূর্ণ ও বড় করে তোলে, যা হঠাৎ আকস্মিক বন্যার আশঙ্কা বাড়িয়ে দেয়।

হিমবাহ পিছু হটার কারণে পাহাড়ের পাথরগুলো উষ্ণ তাপমাত্রা, বৃষ্টিপাত এবং বরফ জমা ও গলার মুখোমুখি হচ্ছে। বছরের পর বছর জমাট থাকা হিমায়িত মাটি গলে পাহাড়ি দেয়াল ও ঢালকে দুর্বল করে দিচ্ছে। স্টেইনার জানান, এর ফলে পাহাড় থেকে বিভিন্ন বস্তু নিচের দিকে নেমে আসার সম্ভাবনা বেড়ে যাচ্ছে।

সান্যাল উল্লেখ করেন, নেপালে বুধবারে যা ঘটেছে তার পেছনে এই ধরনের ধারাবাহিক বিপর্যয় দায়ী থাকতে পারে, একটি তুষারধস বা হিমবাহের পতন যা পরে ধ্বংসাবশেষের ঢল, নদীর গতিপথ অবরোধ এবং ধ্বংসাত্মক বন্যার রূপ নেয়।

দ্রুত নগরায়ণ ও পূর্ব সতর্কবার্তার অভাব

স্টেইনার জানান, নেপালের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রায় ১০ শতাংশ ওই ক্ষতিগ্রস্ত উপত্যকাটিতে অবস্থিত ছিল। তিনি প্রশ্ন তোলেন, পূর্বের বন্যা ও ধসের পর থেকে স্থানীয় বাসিন্দা ও পর্যটকদের জন্য পর্যাপ্ত পূর্ব সতর্কীকরণ ব্যবস্থা বসানো হয়েছিল কি না।

দেশটির নৈসর্গিক সৌন্দর্য প্রতি বছর দশ লাখেরও বেশি বিদেশি পর্যটককে আকর্ষণ করে। তাপমাত্রা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে পাহাড়ি এলাকাগুলো বিপজ্জনক হয়ে ওঠায় জোরালো পূর্ব সতর্কীকরণ ব্যবস্থা, উন্নত নজরদারি এবং দ্রুত আন্তঃসীমান্ত তথ্য বিনিময় জরুরি বলে মনে করছেন বিজ্ঞানীরা।

তবে বিস্তৃত হিমালয় অঞ্চলের হাজার হাজার হিমবাহ, খাড়া ঢাল ও নদী উপত্যকার ওপর নজরদারি করা অত্যন্ত কঠিন কাজ। আর এই ধরনের বিপর্যয় শুরু হলে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য মাত্র কয়েক মিনিট সময় পাওয়া যায়। সান্যাল বলেন, আমাদের হাতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় থাকে না, প্রস্তুত হতে মাত্র কয়েক মিনিট সময় পাওয়া যায়।

স্টেইনার স্পষ্ট করে বলেন, নেপালের কিছু এলাকা বাস করার জন্য এখন এতটাই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে গেছে যে তারা রেড লাইন অতিক্রম করে গেছে। তিনি ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, আমরা আশা করেছিলাম আগের বিপর্যয়গুলো হিমালয় অঞ্চলের সরকারগুলোর চোখ খুলে দেবে। কিন্তু ক্ষতিগুলো এখনও তাদের যথেষ্ট চোখ খোলার জন্য উপযুক্ত বলে মনে হচ্ছে না। আগামীকাল থেকেই কোনও স্পষ্ট সমাধান আসবে বলে আমি খুব একটা আশাবাদী নই। কী করা উচিত তা আমরা জানি, তবে বিভিন্ন অংশীদারদের সমন্বয় করে কাজগুলোকে বাস্তবায়ন করতে হবে।

সূত্র: এপি