Image description

হোটেল সংকটের এক সপ্তাহ পার হলেও কলকাতায় চিকিৎসা নিতে যাওয়া বাংলাদেশিদের আবাসন সমস্যার কোনো স্থায়ী সমাধান হয়নি। ২০০ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে নিউ মার্কেট ও মার্কুইস স্ট্রিট এলাকায় একের পর এক হোটেলে ঘুরেও থাকার জায়গা পাচ্ছেন না অনেকে। বাধ্য হয়ে কেউ ফুটপাতে অপেক্ষা করছেন, আবার কেউ চিকিৎসা শেষ হওয়ার আগেই বাড়ি ফিরে যাচ্ছেন।

আগাম চিকিৎসার অ্যাপয়েন্টমেন্ট থাকায় পরিস্থিতি জেনেও অনেক বাংলাদেশি কলকাতায় আসতে বাধ্য হয়েছেন। কিন্তু শহরে পৌঁছানোর পর তাঁদের বড় একটি অংশকে পড়তে হচ্ছে আবাসন সংকটে।

ছবি: সংগৃহীত

প্রতিদিন বাংলাদেশ থেকে বাস কলকাতার মার্কুইস স্ট্রিট এলাকায় পৌঁছাচ্ছে। বাস থেকে নামার পরই রোগী ও তাঁদের স্বজনেরা ছুটছেন হোটেলের খোঁজে। অনেককে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ফুটপাতে বসে থাকতে দেখা যাচ্ছে।

কুষ্টিয়ার বাসিন্দা সিরাজ পরিবারের সদস্যদের নিয়ে বুধবার কলকাতায় আসেন। এর আগে বেঙ্গালুরুতে চিকিৎসা করিয়ে কলকাতায় এসেছিলেন তিনি। কিন্তু হোটেলে জায়গা না পাওয়ায় শেষ পর্যন্ত পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ফুটপাতেই বসে থাকতে হয় তাকে।

সিরাজ বলেন, হোটেল পেলে কেউ ফুটপাতে বসে থাকতেন না। হোটেল না পাওয়ায় ৫ হাজার রুপি ভাড়া দিয়ে গাড়ি নিয়ে সেদিনই দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত নেন তিনি।

তিনি বলেন, হোটেল পেলে পরদিন সকালে শিয়ালদহ থেকে মাত্র ৩০ রুপি ভাড়ায় বনগাঁ হয়ে দেশে ফিরতে পারতেন। কিন্তু থাকার জায়গা না থাকায় আগেই ফিরতে হচ্ছে।

ছবি: সংগৃহীত

ঢাকার বাসিন্দা শামীমের অভিজ্ঞতা কিছুটা ভিন্ন। পাঁচ থেকে ছয়টি হোটেলে ঘোরার পর শেষ পর্যন্ত একটি হোটেলে থাকার জায়গা পেয়েছেন তিনি।

শামীম বলেন, অনেক ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে। তবে শেষ পর্যন্ত হোটেল পেয়েছেন। তার মতে, নিরাপত্তার স্বার্থে প্রশাসন যা করছে তা মেনে নেওয়া উচিত। সাময়িক এই অসুবিধা সহ্য করা সম্ভব বলেও জানান তিনি।

বাংলাদেশিদের পাশাপাশি বর্তমান পরিস্থিতিতে ক্ষতির মুখে পড়েছেন মার্কুইস স্ট্রিট এলাকার হোটেল মালিকরাও। স্থানীয় হোটেল ব্যবসায়ী মো. ইনতেজার বলেন, করোনার পর ধীরে ধীরে বাংলাদেশি পর্যটক ও রোগীরা কলকাতায় আসতে শুরু করেছিলেন। কিন্তু ৫ আগস্টের রাজনৈতিক অস্থিরতা ও পরবর্তী সময়ে ভিসা জটিলতায় ব্যবসা বারবার বাধাগ্রস্ত হয়েছে।

পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার পথে থাকতেই ঘটে যায় হোটেলে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা। ইনতেজারের মতে, দুর্ঘটনার জন্য দায়ীদের বিরুদ্ধে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। কিন্তু একটি হোটেলের ঘটনার জন্য পুরো এলাকার ব্যবসায়ীদের শাস্তি দেওয়া কতটা যুক্তিসংগত, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

তিনি উদাহরণ হিসেবে বিমান দুর্ঘটনার কথা তুলে বলেন, একটি বিমানে দুর্ঘটনা ঘটলে পুরো এয়ারলাইনসের সব ফ্লাইট বন্ধ করে দেওয়া হয় না। তাহলে একটি হোটেলে দুর্ঘটনার কারণে কেন পুরো এলাকার প্রায় সব হোটেল বন্ধ থাকবে?

ছবি: সংগৃহীত

আরেক হোটেল ব্যবসায়ী শাকিল প্রশাসনের নিরাপত্তামূলক উদ্যোগকে পুরোপুরি অস্বীকার করছেন না। তবে তার মতে, ব্যবসায়ীদের সমস্যার কথাও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।

তিনি বলেন, নিরাপত্তার জন্য সরকার যা করছে তা প্রশংসনীয়। তবে ঘটনার আশপাশের হোটেলগুলো বন্ধ করা যেত। প্রায় ২৫০টি হোটেল বন্ধ করে দেওয়ার কোনো যুক্তি নেই। বাংলাদেশ থেকে প্রতিদিন চার-পাঁচটি বাসে যে যাত্রীরা কলকাতায় আসছেন, তাঁরা থাকবেন কোথায়?

তার ভাষায়, শুধু ব্যবসার কথা নয়, বাংলাদেশ থেকে আসা মানুষগুলোর দুর্ভোগের কথাও বিবেচনা করা দরকার। হোটেল বন্ধ থাকলে বাস ও যাত্রী আসাও বন্ধ করে দেওয়া উচিত বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

তবে কলকাতার আরেক গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসাকেন্দ্রিক এলাকা মুকুন্দপুরের পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন। ‘হাসপাতাল হাব’ হিসেবে পরিচিত এই এলাকায় রয়েছে একাধিক সুপার স্পেশালিটি হাসপাতাল। বাংলাদেশ ছাড়াও পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলা ও কলকাতার বিভিন্ন এলাকা থেকে রোগীরা চিকিৎসার জন্য এখানে আসেন।

এই এলাকাতেও শতাধিক হোটেলকে প্রশাসনের পক্ষ থেকে নোটিশ দেওয়া হয়েছে। অভিযোগ, প্রয়োজনীয় নিয়মকানুন না মেনে পরিচালিত হওয়ায় এসব হোটেলকে অতিথি না রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে বাস্তবে অনেক হোটেলেই অতিথি রাখা অব্যাহত রয়েছে।

স্থানীয় হোটেল মালিকদের একাংশের দাবি, প্রশাসন মূলত নথিপত্র পরিদর্শন করে নোটিশ দিয়েছে। অতিথি রাখা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ—এমন কোনো স্পষ্ট নির্দেশ দেওয়া হয়নি।

তাদের যুক্তি, দূরদূরান্ত থেকে মানুষ চিকিৎসার জন্য আসছেন। তাদের থাকার ব্যবস্থা না থাকলে তারা যাবেন কোথায়?

ছবি: সংগৃহীত

এক হোটেল ব্যবসায়ী বলেন, মানুষ চিকিৎসার জন্য আসছে, তাদের থাকার জায়গা প্রয়োজন। যাত্রী আসা বন্ধ করতে হলে সীমান্তপথের বাস চলাচল বন্ধ করতে হবে। যতক্ষণ মানুষ আসবে, ততক্ষণ তাদের থাকার ব্যবস্থা করতেই হবে।

গত মঙ্গলবার নিউ মার্কেট এলাকার হোটেল শিখা ইনে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে সাত বাংলাদেশি ও দুই ভারতীয় নাগরিকের মৃত্যু হয়। ওই ঘটনার পর প্রশাসন কঠোর অবস্থান নিয়ে নিউ মার্কেট ও আশপাশের এলাকায় ২৫০টির বেশি হোটেল বন্ধ করে দেয়।

এর সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে চিকিৎসার জন্য কলকাতায় যাওয়া বাংলাদেশি রোগী ও তাঁদের স্বজনদের ওপর। এক সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও সংকটের স্থায়ী সমাধান হয়নি। কেউ দীর্ঘ সময় হোটেল খুঁজে অবশেষে থাকার জায়গা পাচ্ছেন, আবার কেউ আবাসন না পেয়ে চিকিৎসা বা সফরের পরিকল্পনা পরিবর্তন করে দেশে ফিরে যাচ্ছেন।

ফলে একদিকে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রশাসনের পদক্ষেপ, অন্যদিকে চিকিৎসা নিতে আসা মানুষের আবাসনের প্রয়োজন এবং স্থানীয় হোটেল ব্যবসায়ীদের জীবিকা- এই তিনটি বিষয়কে সমন্বয় করেই দ্রুত সমাধান খোঁজা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।