সৌদি আরবের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের স্বাক্ষরিত বেসামরিক পরমাণু সহযোগিতা চুক্তি কংগ্রেসে পাঠিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। গেল সোমবার চুক্তিটি কংগ্রেসে পাঠানো হয়েছে বলে সিএনএনকে জানিয়েছেন প্রশাসনের এক কর্মকর্তা ও কংগ্রেসের একাধিক সহযোগী।
চুক্তিটি সৌদি আরবকে দেশটির মাটিতে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার সুযোগ দিতে পারে। পারমাণবিক শক্তি আইনের আওতায় কংগ্রেসের উভয় কক্ষ ৯০ দিনের মধ্যে চুক্তিটির অনুমোদন করলে এটি কার্যকর হবে। ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক না করলে সৌদির ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধের এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের চুক্তিটি অনুমোদন হবে না বলে মনে করা হচ্ছে।
এ প্রসঙ্গে হোয়াইট হাউস জুলাইয়ে বলেছিল, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘অ্যাব্রাহাম অ্যাকর্ডস’ উদ্যোগে সৌদি আরব যোগ না দিলে চুক্তিটি কার্যকর হবে না। এই উদ্যোগের মাধ্যমে ইসরায়েলের সঙ্গে আরব দেশগুলোর কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নেয়া হয়। তবে সিএনএনের আগের প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, সৌদি-যুক্তরাষ্ট্র পরমাণু চুক্তির মূল পাঠে সৌদি আরবকে অ্যাব্রাহাম অ্যাকর্ডসে যোগ দেয়ার বাধ্যবাধকতা রাখা হয়নি।
এক প্রশাসনিক কর্মকর্তা বলেন, ‘ট্রাম্পের অবস্থান পরিবর্তন হয়নি... সৌদি আরব অ্যাব্রাহাম অ্যাকর্ডসে যোগ দিলেই চুক্তিটি এগিয়ে যাবে।’ তবে ৯০ দিন পর স্বাক্ষরিত চুক্তিটি কার্যকর হওয়া থেকে প্রশাসন কীভাবে প্রতিরোধ করবে, সে বিষয়ে হোয়াইট হাউস কোনো প্রশ্নের উত্তর দেয়নি। বুধবার আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার প্রধানের সঙ্গে এক সংবাদ সম্মেলনে মার্কিন জ্বালানিমন্ত্রী ক্রিস রাইট বলেন, ‘পরমাণু চুক্তি এবং অ্যাব্রাহাম অ্যাকর্ডসে যোগ দেয়ার আলোচনা সমান্তরালভাবে চলবে।’
সৌদি এক কর্মকর্তা সিএনএনের প্রশ্নের জবাবে বলেন, ‘সৌদি-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক ক্রমাগত বিকশিত হচ্ছে এবং বছরের পর বছর ধরে তা আরও বিস্তৃত ও গভীর হয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘অংশীদারত্ব আরও শক্তিশালী করার উপায় নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসন ও কংগ্রেসের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার জন্য সৌদি আরব উন্মুখ।’
সিএনএনের সঙ্গে কথা বলা এক সূত্র জানিয়েছে, সোমবার কংগ্রেসে পাঠানো চুক্তির খসড়া গোপনীয় রাখা হয়েছে। ওই সূত্র এটিকে ‘অত্যন্ত অস্বাভাবিক’ বলে বর্ণনা করেছে। জুলাইয়ে প্রশাসনের এক কর্মকর্তা সিএনএনকে জানিয়েছিলেন, চুক্তিতে ‘সাইড লেটার’ রয়েছে, যেগুলো ‘বাণিজ্যিক বা অন্য কোনো দিক থেকে সংবেদনশীল’।
ফাউন্ডেশন ফর ডিফেন্স অব ডেমোক্রেসিসের গবেষক আন্দ্রেয়া স্ট্রিকার বলেন, ‘সাধারণত বেসামরিক পরমাণু সহযোগিতা চুক্তির খুব সামান্য অংশই গোপন রাখা হয়। এর মধ্যে পরমাণু অস্ত্র বিস্তার রোধ বিষয়ে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের বিস্তারিত বিশ্লেষণসংবলিত একটি সংযোজনী থাকে।’
মার্কিন পরমাণু চুক্তি প্রক্রিয়ার সঙ্গে পরিচিত আরও দুই সূত্র জানিয়েছে, ১২৩ চুক্তি নামে পরিচিত একটি বেসামরিক পরমাণু চুক্তির পুরো খসড়া গোপনীয় করা ‘নজিরবিহীন’। বুধবার রাইট আরও নিশ্চিত করেন যে, চুক্তিতে সৌদি আরবের নিজ ভূখণ্ডে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার সুযোগের একটি পথ রাখা হয়েছে। তবে তিনি বলেন, এমন ব্যবস্থা কার্যকর হতে অনেক বছর সময় লাগতে পারে।
সিএনএনের আগের প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, চুক্তিতে একটি যৌথ যুক্তরাষ্ট্র-সৌদি গবেষণা ব্যবস্থা রয়েছে, যার মাধ্যমে সৌদি আরব বেসামরিক পারমাণবিক চুল্লির জন্য নিজস্ব ইউরেনিয়াম জ্বালানি সমৃদ্ধ করতে পারবে। এ ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিকভাবে প্রচলিত অতিরিক্ত সুরক্ষা ব্যবস্থা বা ‘অ্যাডিশনাল প্রটোকল’ গ্রহণ না করার সুযোগও থাকতে পারে।
রাইট বলেন, সমৃদ্ধকরণ বাণিজ্যিকভাবে যুক্তিসংগত এবং যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, সে বিষয়ে দুই দেশকে পারস্পরিকভাবে একমত হতে হবে। আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার সঙ্গে যেসব দেশ এই প্রটোকলে স্বাক্ষর করে, সেখানে সংস্থাটি সন্দেহভাজন পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচির স্থাপনা শনাক্ত করতে বিস্তৃত ক্ষমতা পায়।
তবে রাইট প্রটোকলটির গুরুত্ব কমিয়ে বলেন, আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার সহযোগিতায় তৈরি দ্বিপক্ষীয় সুরক্ষা ব্যবস্থাই সৌদি আরবের পারমাণবিক অস্ত্র উন্নয়ন ঠেকাতে যথেষ্ট হবে। এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার মহাপরিচালক রাফায়েল গ্রোসি বলেন, সৌদি-যুক্তরাষ্ট্রের সুরক্ষা চুক্তিটি সংস্থাটির পর্যালোচনা ও অনুমোদনের প্রয়োজন হবে।
তিনি বলেন, ‘মূল ধারণাটি হলো, আমরা বেশ কিছু অতিরিক্ত ব্যবস্থা নেব… অত্যন্ত কঠোর যাচাই-বাছাইয়ের আরও কয়েকটি স্তর যুক্ত করব। আমি এমন কোনো চুক্তি কখনোই প্রস্তাব করব না যা পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধের নিশ্চয়তা দেবে না।’
চুক্তি বিবেচনার সময় অ্যাব্রাহাম অ্যাকর্ডসে সৌদি আরবকে যুক্ত হওয়ার শর্তটি আইনপ্রণেতারা কীভাবে দেখবেন, তা এখনও স্পষ্ট নয়। ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে শুরু হওয়া এই উদ্যোগের মাধ্যমে কয়েকটি আরব দেশ ইসরায়েলের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্বাভাবিক করেছিল। চুক্তি স্বাক্ষরের পর ট্রাম্প ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের এই কূটনৈতিক শর্ত ঘোষণা করায় প্রশাসনের নিজস্ব পরমাণু আলোচকদেরও বিস্মিত করেছিল বলে বিষয়টি সম্পর্কে অবগত দুই সূত্র সিএনএনকে জানিয়েছে।
এর আগে ২০০৮ সালে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের প্রশাসন রাশিয়ার সঙ্গে একটি ১২৩ চুক্তি কংগ্রেসের বিবেচনা থেকে প্রত্যাহার করেছিল। সে সময় রাশিয়া জর্জিয়ায় আক্রমণ চালানোর পর বুশ বলেছিলেন, ওই হামলার কারণে তিনি আর নিশ্চিত হতে পারছেন না যে চুক্তিটি যুক্তরাষ্ট্রের ‘সাধারণ প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তার’ জন্য ঝুঁকি তৈরি করবে না।
ফেডারেল রেজিস্টার অনুযায়ী, ট্রাম্প গত ১৬ জুলাই আনুষ্ঠানিকভাবে চুক্তিটির বিষয়ে নিজের প্রত্যয়ন জারি করেন। নিউক্লিয়ার থ্রেট ইনিশিয়েটিভের পারমাণবিক উপকরণ নিরাপত্তা কার্যক্রমের দায়িত্বে থাকা স্কট রোকার বলেন, প্রশাসন চাইলে চুক্তিটি চূড়ান্ত নাও করতে পারে। সৌদি ১২৩ চুক্তির ক্ষেত্রে আমরা এমন এক অজানা ভূখণ্ডে প্রবেশ করছি, যেখানে কংগ্রেসের পর্যালোচনা শেষ হওয়ার পরও প্রশাসনকে এটি চূড়ান্ত করতেই হবে- এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই।’
তিনি আরও বলেন, ‘সম্ভবত সৌদি আরব ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে সম্মত না হওয়া পর্যন্ত প্রশাসন চূড়ান্ত পদক্ষেপটি স্থগিত রাখতে পারে।’