বসনিয়া যুদ্ধের সময় গণহত্যার দায়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড পাওয়া সার্বীয় জেনারেল রাতকো ম্লাদিচ মারা গেছেন। নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। মৃত্যুর সময় তার বয়স হয়েছিল ৮৩ বছর।
জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনাল বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। আন্তর্জাতিক অবশিষ্ট ট্রাইব্যুনাল মেকানিজম এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, দ্য হেগের হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় দিনের শুরুতে ম্লাদিচের মৃত্যু হয়। বিচারক গ্রাসিয়েলা গাত্তি সান্তানা তার মৃত্যুর পরিস্থিতি জানতে পূর্ণাঙ্গ তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন।
‘বসনিয়ার কসাই’ নামে পরিচিত ম্লাদিচ দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ ছিলেন। তার একাধিকবার স্ট্রোক হয়েছিল।
চলতি মাসে জাতিসংঘের একজন চিকিৎসক জানিয়েছিলেন, যেকোনো সময় তার মৃত্যু হতে পারে। এমনকি কয়েক সপ্তাহের মধ্যেও তা ঘটতে পারে বলে আশঙ্কা করা হয়েছিল। তবে তার মুক্তির আবেদন আবারও নাকচ করা হয়।
১৯৯০-এর দশকে বসনিয়া যুদ্ধের সময় জাতিগত নিধন অভিযানের অন্যতম প্রধান পরিকল্পনাকারী ছিলেন ম্লাদিচ। ১৯৯৫ সালে জাতিসংঘ ঘোষিত ‘নিরাপদ এলাকা’ স্রেব্রেনিৎসায় অন্তত ৮ হাজার মুসলিমকে হত্যার ঘটনায় তাকে গণহত্যার দায়ে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপে এটিই ছিল সবচেয়ে ভয়াবহ গণহত্যা।
যুদ্ধটিতে এক লাখের বেশি মানুষ নিহত হন। বাস্তুচ্যুত হন ১০ লাখের বেশি মানুষ। সাবেক জাতিসংঘ মানবাধিকারপ্রধান জেইদ রা’দ আল-হুসেইন ম্লাদিচকে তার সাজা ঘোষণার পর ‘অশুভের প্রতিমূর্তি’ হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন।
ম্লাদিচ তার সেনাদের বসনিয়ার মুসলিম জনগোষ্ঠীর ‘মস্তিষ্ক পুড়িয়ে’ দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন। নিজেকে ‘সার্বদের ঈশ্বর’ বলেও তিনি গর্ব করতেন।
স্রেব্রেনিৎসার হত্যাযজ্ঞ
বসনিয়া যুদ্ধ তিন বছরের বেশি সময় ধরে চলেছিল। এই সময়ে ম্লাদিচের বাহিনী রাজধানী সারায়েভো অবরোধ করে। শহরটিতে প্রতিদিন কামান, ট্যাংক ও স্নাইপার হামলা চালানো হতো। এতে প্রায় ১০ হাজার মানুষ নিহত হন।
স্রেব্রেনিৎসার হত্যাযজ্ঞ ছিল ওই যুদ্ধের সবচেয়ে ভয়াবহ অধ্যায়। ডাচ জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী বাহিনী সেখান থেকে সরে যাওয়ার পর হাজারো বসনীয় মুসলিম পুরুষ ও কিশোরকে ধরে নিয়ে হত্যা করা হয়। পরে তাদের লাশ বুলডোজার দিয়ে গণকবরে চাপা দেওয়া হয়।
ম্লাদিচ ওই অবরোধ ও অভিযানের ভিডিও ধারণ করিয়েছিলেন। ভিডিওতে তাকে নিজের সেনাদের প্রশংসা করতে এবং জাতিসংঘের শান্তিরক্ষীদের ভর্ৎসনা করতে দেখা যায়। ওই সময় শান্তিরক্ষীরা তার দেওয়া আশ্বাসে বিশ্বাস করেছিলেন যে তার নিয়ন্ত্রণে থাকা মানুষজন নিরাপদ থাকবে।
এক ভিডিওতে ম্লাদিচ বলেন, ‘আমরা এই শহর সার্ব জনগণকে উপহার হিসেবে দিলাম।’ মুসলিম তুর্কিদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নেওয়ার কথাও তিনি বলেন। অটোমান সাম্রাজ্যের অংশ হিসেবে ওই এলাকা একসময় মুসলিম তুর্কিদের নিয়ন্ত্রণে ছিল।
পরদিন ম্লাদিচের বাহিনী শিশুদের মিষ্টি বিতরণ করে। তাদের নিরাপদে চলে যাওয়ার আশ্বাসও দেওয়া হয়। একই সময়ে হাজারো পুরুষ ও কিশোরকে হত্যার জন্য প্রস্তুত করা হচ্ছিল।
১৯৯৫ সালে ন্যাটো ম্লাদিচের বাহিনীকে নিয়ন্ত্রণে আনতে সীমিত বিমান হামলার হুমকি দিলে তার সেনারা জাতিসংঘের শান্তিরক্ষীদের জিম্মি করে। সম্ভাব্য হামলার লক্ষ্যস্থলে তাদের শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা হয়।
‘বৃহত্তর সার্বিয়া’ গঠনের পরিকল্পনা
সাবেক যুগোস্লাভিয়ার জন্য গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের (আইসিটিওয়াই) মতে, ম্লাদিচ সার্বীয় নেতৃত্বের একটি পরিকল্পনা বাস্তবায়নের দায়িত্বে ছিলেন। পরিকল্পনার লক্ষ্য ছিল বসনীয় মুসলিম, ক্রোয়াট ও অন্যান্য অ-সার্ব জনগোষ্ঠীকে জোর করে তাদের এলাকা থেকে বিতাড়িত করা। এর মাধ্যমে বসনিয়ার ভূমিতে বৃহত্তর সার্বিয়া প্রতিষ্ঠার পথ তৈরি করা।
ট্রাইব্যুনাল বলেছিল, ম্লাদিচ, তৎকালীন সার্বিয়ার প্রেসিডেন্ট স্লোবোদান মিলোশেভিচ এবং বসনীয় সার্ব রাজনৈতিক নেতা রাদোভান কারাদজিচ ওই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে একটি অপরাধমূলক ষড়যন্ত্রের অংশ ছিলেন।
২০১৪ সালে আইসিটিওয়াইয়ের শুনানিতে ম্লাদিচ বলেছিলেন, ‘আমি এই আদালতকে স্বীকার করি না।’ ২০১৭ সালে সাজা ঘোষণার সময়ও তিনি চিৎকার করে বলেছিলেন, ‘এসব মিথ্যা, আপনারা সবাই মিথ্যাবাদী।’
যেভাবে উত্থান
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় পার্টিজান যোদ্ধা হিসেবে লড়াই করা তার বাবা ১৯৪৫ সালে নিহত হন। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, ম্লাদিচ ১৯৪৩ সালের মার্চে বসনিয়ার ছোট্ট গ্রাম বোজিনোভিচিতে জন্মগ্রহণ করেন। সে হিসাবে মৃত্যুর সময় তার বয়স ৮৩ বছর। তবে সরকারি নথিতে তার জন্মসাল ১৯৪২ উল্লেখ করা হয়েছিল।
১৯৯১ সালে যুগোস্লাভিয়া ভেঙে পড়ার প্রক্রিয়া শুরু হলে ম্লাদিচ কমিউনিস্ট যুগোস্লাভ পিপলস আর্মির কর্মকর্তা ছিলেন।
১৯৯২ সালে বসনিয়ার মুসলিম নেতৃত্বাধীন বিচ্ছিন্নতার বিরুদ্ধে বসনীয় সার্বরা বিদ্রোহ শুরু করলে নতুন বসনীয় সার্ব বাহিনীর কমান্ডার করা হয় ম্লাদিচকে। তার বাহিনী দ্রুত বসনিয়ার প্রায় ৭০ শতাংশ এলাকা দখল করে নেয়।
ভারী অস্ত্র দিয়ে অসংখ্য শহর অবরুদ্ধ করা হয়। এসব অস্ত্রের অনেকগুলোই সাবেক যুগোস্লাভ সেনাবাহিনীর ছিল। গ্রামগুলোতে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। ওই সময় জাতিসংঘের সুরক্ষা বাহিনীর ২২ হাজার সেনা ঘটনাস্থলে থাকলেও পক্ষ না নেওয়ার নির্দেশ থাকায় তারা অনেকটা অসহায় অবস্থায় ছিল।
পশ্চিমা চাপ, ন্যাটোর বিমান হামলা এবং ক্রোয়াট ও মুসলিম বাহিনীকে যুক্তরাষ্ট্রের গোপন অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ দেওয়ার ফলে ধীরে ধীরে ম্লাদিচের বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধের মোড় ঘুরে যায়।
যুদ্ধ শেষে ম্লাদিচ আত্মগোপনে চলে যান। যুদ্ধ-পরবর্তী সার্বিয়ায় ক্ষমতায় থাকা সংস্কারপন্থি নেতারা তাকে গ্রেপ্তার করার সাহস দেখাননি। কারণ জাতীয়তাবাদী সার্বদের একটি অংশের কাছে তিনি তখনো নায়ক ছিলেন।
ম্লাদিচ অবশ্য সব সময় দাবি করতেন, তিনি একজন ‘সাধারণ মানুষ’। নিজের জনগণকে রক্ষা করার জন্য তাকে বেছে নেওয়া হয়েছিল বলেও দাবি করতেন।
২০১১ সালে গ্রেপ্তারের সময় তিনি কোনো প্রতিরোধ করেননি। ২০১৩ সালে তার হার্ট অ্যাটাক হয়। এরপর তাকে বয়সের তুলনায় অনেক বেশি বৃদ্ধ দেখাত। নিজের ভাষায়, তিনি নিজেকে একজন দুর্বল বৃদ্ধ মানুষ মনে করতেন।
যাবজ্জীবন কারাদণ্ড
বসনিয়া যুদ্ধের সময় গণহত্যা ও যুদ্ধাপরাধের দায়ে ২০১৭ সালে জাতিসংঘের ট্রাইব্যুনাল ম্লাদিচকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়। এর ছয় বছর আগে ২০১১ সালে সার্বিয়ায় গ্রেপ্তার হন তিনি। গ্রেপ্তারের আগে ১৬ বছর তিনি পলাতক ছিলেন।
ম্লাদিচের মৃত্যুর খবর প্রথম প্রচার করে সার্বিয়ার রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন। এর আগে তার ছেলে দারকো বাবার শারীরিক অবস্থার অবনতির কথা জানিয়েছিলেন।
স্রেব্রেনিৎসার ‘মাদার্স অব স্রেব্রেনিৎসা’ সংগঠনের সদস্য মুনিরা সুবাসিচ ম্লাদিচের মৃত্যুতে দুঃখ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, বসনীয় সার্বদের অনেকে এখনো ম্লাদিচের অপরাধ অস্বীকার করেন।
সুবাসিচ বলেন, ‘আজ একজন বড় যুদ্ধাপরাধী মারা গেলেন, বলকানের অপরাধী।’
তিনি বলেন, ৩১ বছর পরও নিহতদের মায়েরা ‘আমাদের আত্মায় সেই কষ্ট বহন করছি’। একই সঙ্গে তারা এখনো ম্লাদিচকে সার্বদের নায়ক বলা এবং তার অপরাধ অস্বীকার করার কথা শুনছেন।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের আন্তর্জাতিক বিচারবিষয়ক পরিচালক এলিজাবেথ ইভেনসন বলেন, গণহত্যার দায়ে দোষী সাব্যস্ত ম্লাদিচের মৃত্যু পশ্চিম বলকানে ন্যায়বিচার, সত্য এবং ক্ষতিপূরণের প্রয়োজনীয়তার কথা আবারও মনে করিয়ে দেয়।
তিনি বলেন, বসনিয়া ও অন্যত্র সংঘটিত ভয়াবহ অপরাধের পূর্ণ জবাবদিহি নিশ্চিত করতে ঘটনাগুলোর কয়েক দশক পরও সরকারগুলোর ন্যায়বিচারের প্রতি অঙ্গীকার প্রয়োজন।