Image description
অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেন বাজলেই হাসপাতাল চত্বরে ছুটে আসছেন একদল মানুষ। কারও চোখে উৎকণ্ঠা, কারও চোখে শেষ আশার ঝিলিক। অ্যাম্বুলেন্সের দরজা খোলার আগেই স্ট্রেচারের দিকে তাকিয়ে থাকছেন তারা— ভেতরে থাকা মানুষটি যদি হন তাদের নিখোঁজ স্বজন!
 
কিন্তু দরজা খুলে যখন অপরিচিত কোনো কাউকে বের করে আনা হচ্ছে, তখন ভেঙে পড়ছেন তারা। কিছুক্ষণ পর আবার পরের অ্যাম্বুলেন্সের অপেক্ষা। এভাবেই নেপালের কাঠমান্ডুর হাসপাতালগুলোতে কাটছে বন্যায় নিখোঁজদের স্বজনদের সময়।
 
বুধবার ভুটো কোশি নদীর ভয়াবহ বন্যার পর বৃহস্পতিবার ত্রিভুবন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষণ হাসপাতালে এমনই হৃদয়বিদারক দৃশ্য দেখা যায়। নিখোঁজ স্বজনের খোঁজে হাসপাতালের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে ঘুরছেন পরিবারের সদস্যরা। আহতদের তালিকায় নাম খুঁজছেন, দেয়ালে টাঙানো ছবি দেখছেন, পুলিশের কাছে জানতে চাইছেন কোনো খবর পাওয়া গেছে কি না। কেউ প্রকাশ্যে কাঁদছেন। কেউ আবার এতটাই স্তব্ধ যে চোখে নেই পানি। 
 
দোলখা থেকে আসা বিজুলা কার্কিও ছিলেন তাদের একজন। বুধবার সকালে ২৪ বছর বয়সী ছেলের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর তিনি ছুটে এসেছেন কাঠমান্ডুতে। হাসপাতালের দেয়ালে টাঙানো আহতদের তালিকার সামনে বারবার গিয়ে ছেলের নাম খুঁজেছেন। কিন্তু সেখানে তাঁর ছেলের নাম নেই।
 
পুলিশের ডেস্কে ছেলের নাম ও ফোন নম্বর দিয়ে রেখেছেন তিনি। পুলিশ তাঁকে জানিয়েছে, ছেলে হাসপাতালে এলে তাঁকে খবর দেওয়া হবে।
 
তবু মায়ের মন মানছে না। প্রতিবার অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেন শুনলেই ছুটে যাচ্ছেন তিনি। আশা— এই বুঝি তার ছেলে ফিরে এল।
 
‘সে কাপড় আনতে গিয়েছিল। আমাকে বলেছিল, শিগগিরই ফিরে আসবে। গতকাল সকাল থেকে তার ফোনে আর যোগাযোগ করা যাচ্ছে না,’ কান্না চেপে বলছিলেন কার্কি। বন্যার খবর শোনার পর থেকে তার চোখের পানি যেন থামছেই না।
 
বৃহস্পতিবার বিকেল ৫টা পর্যন্ত ত্রিভুবন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষণ হাসপাতালের পুলিশ ডেস্কে বন্যার পর নিখোঁজ স্বজনের খোঁজে এক হাজারের বেশি মানুষ নাম নিবন্ধন করেছেন, জানিয়েছে পুলিশ।
 
হাসপাতাল থেকে হাসপাতালে ছুটছেন স্বজনরা
 
নিখোঁজদের সন্ধান শুধু একটি হাসপাতালেই সীমাবদ্ধ নেই। কাঠমান্ডুর এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে ছুটছেন অনেকেই।
 
সিন্ধুপালচকের বারহাবিসে এলাকার বাসিন্দা গোমা থাপা এখন স্বয়ম্ভুতে থাকেন। বুধবার সকাল থেকে তাঁর ৪০ বছর বয়সী স্বামীর সঙ্গে যোগাযোগ নেই। বৃহস্পতিবার ভোর থেকেই হাসপাতালগুলোতে ঘুরছেন তিনি।
 
‘মাত্র ১০-১২ দিন আগে তিনি সেখানে গিয়েছিলেন। গতকাল সকাল ৮টার দিকে ফোন করে বলেছিলেন, কাস্টমস পার হয়ে বের হয়েছেন, বাড়ি ফিরছেন। এরপর আর যোগাযোগ হয়নি,’ বলেন থাপা। 
 
আহতদের তালিকায় স্বামীর নাম না পেয়ে তিনি বিমানবন্দর, বীর হাসপাতাল এবং আবার শিক্ষণ হাসপাতালে ছুটে বেড়িয়েছেন। কোথাও যদি জীবিত অবস্থায় তার স্বামীর সন্ধান মেলে— এই আশাতেই চলছে খোঁজ। 
 
এক পরিবারের ১৫-১৬ জনই নিখোঁজ 
 
বন্যার ভয়াবহতা কতটা গভীর, তার আরেকটি চিত্র পাওয়া যায় রাসুয়ার বাসিন্দা গণেশ লামার কথায়। তার পরিবারের একসঙ্গে ১৫ থেকে ১৬ জনের কোনো খোঁজ নেই।
 
তার নিখোঁজ স্বজনদের মধ্যে রয়েছেন বোন, ভাগনে-ভাগনি ও ভগ্নিপতিসহ পরিবারের আরও সদস্য।
 
‘আমরা খুবই অসহায় হয়ে পড়েছি। কাকে জানাব, কী করব—কিছুই বুঝতে পারছি না,’ বলেন লামা।
 
স্বজনদের খোঁজে পরিবারটি ভাগ হয়ে গেছে। কেউ বিমানবন্দরে, কেউ বীর হাসপাতালে, আর গণেশ লামা অবস্থান করছেন ত্রিভুবন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষণ হাসপাতালে।
 
‘বন্যার খবর পাওয়ার পর থেকেই তাদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করছি। কোথাও থেকে কোনো খবর আসছে না,’ বলেন তিনি।
 
 
 
বীর হাসপাতাল ও পাশের ট্রমা সেন্টারেও ছিল একই চিত্র। পুলিশের ডেস্কের সামনে অপেক্ষা করছেন স্বজনরা। কেউ ছবি দেখাচ্ছেন, কেউ নিখোঁজ ব্যক্তির নাম লিখে দিচ্ছেন। আর অ্যাম্বুলেন্স এলেই সবার চোখ চলে যাচ্ছে সেদিকে।
 
ছবি হাতে হাসপাতাল থেকে হাসপাতালে 
 
সিন্ধুপালচকের ভোতালা সাধাও তার ৩২ বছর বয়সী ভগ্নিপতি রাজ কুমার শ্রেষ্ঠের খোঁজে ছুটছেন। পোশাকের ব্যবসার জন্য মঙ্গলবার তিব্বতে গিয়েছিলেন শ্রেষ্ঠ। বুধবার সকাল থেকে তার ফোন বন্ধ।
 
‘গতকাল সকাল থেকে তাঁর কোনো খবর নেই,’ বলেন সাধা। 
 
রাজ কুমার শ্রেষ্ঠের ছবি বীর হাসপাতাল ও ত্রিভুবন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষণ হাসপাতালের দেয়ালে টাঙিয়ে দেওয়া হয়েছে। পরিবারের সদস্যরাও ভাগ হয়ে খুঁজছেন তাঁকে।
 
এক ভাই অপেক্ষা করছেন বিমানবন্দরে— যেখানে মরদেহ আসতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। আর সাধা ঘুরছেন হাসপাতালগুলোতে।
 
‘আমার ছোট ভাই বিমানবন্দরে আছে। যেখানে মরদেহগুলো আনা হচ্ছে, সেখানে অপেক্ষা করছে। আর আমি এখানে আছি—যদি তাকে এখানে আনা হয়,’ বলেন তিনি। 
 
তবু হাল ছাড়েননি সাধা। হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে তার পরবর্তী গন্তব্য কাঠমান্ডু মেডিকেল কলেজ।
 
‘এখন কাঠমান্ডু মেডিকেল কলেজে যাব। সেখানেও তার ছবি দেব। খুঁজতে থাকব।’ 
 
ভুটেকোশি নদীর আকস্মিক বন্যায় নেপালের বিভিন্ন এলাকায় প্রাণহানি ও ব্যাপক ধ্বংসের পাশাপাশি শত শত মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। আর তাদের স্বজনদের কাছে প্রতিটি অ্যাম্বুলেন্স যেন একই সঙ্গে আশা ও আতঙ্কের নতুন বার্তা— হয়তো এবার পাওয়া যাবে প্রিয়জনের খবর, আবার হয়তো অপেক্ষা আরও দীর্ঘ হবে
 
সময়ের আলো/