Image description

বছরের পর বছর ধরে নিজের শক্তিশালী, গম্ভীর ইমেজ গড়ে তুলেছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। স্ক্রিপ্টেড ভাষণ, আনুষ্ঠানিক সম্প্রচার আর সতর্কভাবে কথাবার্তার মাধ্যমে তিনি নিজেকে ‘স্ট্রংম্যান’ হিসেবে তুলে ধরেছেন।

মাসখানেক আগেও এই ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছিলেন মোদি। কিন্তু সম্প্রতি ইনস্টাগ্রামে জেন-জি স্টাইলে রিলস বানাতে শুরু করেছেন তিনি। প্রশ্ন উঠছে কেন?

ভারতের তরুণ প্রজন্মের অনেকেই ঠিকভাবে গ্রহণ করছেন না মোদিকে। তবুও ৭৫ বছর বয়সী প্রধানমন্ত্রী তাদের সঙ্গে বন্ধুর মতো কথা বলার চেষ্টা করছেন।

জেন-জিদের সঙ্গে কানেক্টিভিটি বাড়াতে ‘গেট রেডি উইথ মি’ স্টাইলের রিলস, সেলফি ভিডিও আর তরুণদের ‘ফ্রেন্ডস’ বলে সম্বোধন করে চলেছেন দীর্ঘদিন ধরে ভারতের ক্ষমতায় থাকা এ রাজনীতিবিদ।

মোদির ইনস্টাগ্রামে রয়েছে ১০ কোটিরও বেশি ফলোয়ার, যা কোনো রাজনৈতিক নেতা হিসেবে সর্বোচ্চ। এর আগে তার কিংবা ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) সোশ্যাল মিডিয়ার কৌশলে ইনস্টাগ্রামের স্টাইল খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল না। তবে গত মাসে ছাত্র জনতার আন্দোলনের পর এ ধারায় পরিবর্তন এসেছে। ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) নামের ব্যঙ্গাত্মক আন্দোলন মিম, লাইভস্ট্রিম আর রিলসের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এক পর্যায়ে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ ঘটিয়ে আন্দোলন শেষ হয়। এতে একটু অবাকই হয়েছে বিজেপি।

লেখক ও আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক অনুরাগ মিনাস ভারমা বলেছেন, এক দশকেরও বেশি সময় ধরে ‘হিন্দু জাতীয়তাবাদী দলটি’ তাদের বার্তা প্রচারের জন্য হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ, ফেসবুক পেজ এবং এক্স অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে অনলাইনে ভারতের অন্যতম শক্তিশালী রাজনৈতিক শক্তি গড়ে তুলেছে।

ভারতের ৬০ শতাংশের বেশি মানুষ ৩৫ বছরের নিচে। জেন-জি ২০২৯ সালের নির্বাচনে বড় ভোটার গোষ্ঠী হতে চলেছে। তাদের কাছে পৌঁছাতে ইনস্টাগ্রামের মতো প্ল্যাটফর্মে ব্যক্তিগত ও অনানুষ্ঠানিক কনটেন্ট দরকার বলে মনে করছে বিজেপি।

মোদির প্রথম দিককার সেলফি রিলগুলোতে তরুণরা ব্যঙ্গ করেছে। বিশেষ করে ‘ফ্রেন্ডস’ বলার পরের লম্বা নীরবতা নিয়ে মিম তৈরি হয়েছে। পরে মোদির টিম ক্যামেরা অ্যাঙ্গেল, লাইটিং ও ব্যাকড্রপ বদলানোর চেষ্টা করেছে।

এসব বিপত্তি এড়িয়ে ‘স্ট্রংম্যান’ মূলত তরুণ ভোটারদের কাছে পৌঁছাতেই বানাচ্ছেন রিলস। বিষয়টি ধরতে পেরেছেন এ প্রজন্মের রাজনীতি সচেতন তরুণরা।

গিন্নি মালিয়া তাদেরই একজন। তিনি জানিয়েছেন, তিনি বুঝতে পেরেছেন বিজেপি কেন জেন-জিদের সঙ্গে সম্পৃক্ত হতে চাইছে। কিন্তু এই সময়ে তাদের আকস্মিক সম্পৃক্ততার বিষয়টি আমাদের বিশেষভাবে খতিয়ে দেখা দরকার।

তিনি আরও বলেছেন, মোদির ভিডিওগুলোতে জেন-জি প্রজন্মের ভাষা ও আঙ্গিক ব্যবহার করা হলেও যে উদ্বেগগুলো ককরোচ আন্দলনকে উসকে দিয়েছিল সেগুলো সমাধানে ব্যর্থ হয়েছে।

কিছু তরুণ একে ইতিবাচক মনে করলেও অনেকে সন্দিহান। তরুণরা বলেছেন, সময়টাই সন্দেহের। মূল সমস্যাগুলো নিয়ে কথা না বলে শুধু স্টাইল বদলানো হয়েছে। বিজেপির অন্য পেজেও মিম, স্ল্যাং আর পপ-কালচার ব্যবহার করা হচ্ছে। কিন্তু অনেক রিলসকে জেন-জিরা ক্রিনজ বা হাস্যকর বলে মনে করছেন।

মন্ত্রীদের এখন সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাক্টিভিটি বাড়ানোর নির্দেশ দিয়েছে বিজেপি। অন্যদিকে কংগ্রেসের রাহুল গান্ধীও ‘সেলফি ও অ্যাস্ক মি অ্যানিথিং’ কার্যক্রমের মাধ্যমে তরুণদের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করছেন।

ইনস্টাগ্রাম, এক্স বা হোয়াটসঅ্যাপের মতো নেটওয়ার্ক-কেন্দ্রিক নয়। এখানে এনগেজমেন্টই মুখ্য। মোদির এক রিল ৪০ কোটির বেশি ভিউ পেলেও তরুণরা সেটিকে ব্যঙ্গাত্মক এডিট করে ছড়িয়ে দিয়েছে। ইনস্টাগ্রামে আয়রনি ও ট্রলের জায়গা বেশি। তাই গম্ভীর রাজনৈতিক বার্তাও সহজেই উপহাসের শিকার হতে পারে।

মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জয়জিত পাল বলেছেন, বিজেপি দীর্ঘদিন ধরে সমর্থকদের ওপর নিজেদের বয়ান তৈরি করতে এক্স এবং হোয়াটসঅ্যাপের মতো প্ল্যাটফর্মে নির্ভর করে আসছে। কিন্তু ইনস্টাগ্রামে তা কাজ করছে না। প্ল্যাটফর্মটি এমন কন্টেন্টকে প্রাধান্য দেয় যা বেশি এনগেজমেন্ট তৈরি করে।

পাল বলেছেন, ২০০ ফলোয়ার থাকা কোনো অ্যাকাউন্ট থেকে পোস্ট করা ১০ মিলিয়ন ভিউ পাওয়া একটি রিল খুঁজে পাওয়া খুব একটা কঠিন কিছু নয়, অথচ বিশাল অনুসারী থাকা ব্যক্তিদের পোস্ট করা কিছু ভিডিওতে হয়তো মাত্র কয়েক হাজার ভিউ হয়।

তিনি আরও বলেছেন, এটি বিজেপির জন্য একটি চ্যালেঞ্জ। তাদের কৌশল তৈরি হয়েছিল নেটওয়ার্ক-কেন্দ্রিক ইন্টারনেটের জন্য। কিন্তু ইনস্টাগ্রামের মতো আজকের প্ল্যাটফর্মগুলো অনেক বেশি আবেগ-কেন্দ্রিক।

‘নির্বাচনে জেতা আর সোশ্যাল মিডিয়া ন্যারেটিভ জেতা এক কথা নয়। বিজেপির সংগঠন ও আনুগত্যশীল ভোটার বেস এখনও অনেক শক্তিশালী। পার্টি আগেও নতুন মাধ্যমে মানিয়ে নিয়েছে। ইনস্টাগ্রামে তারা নতুন করে শিখছে, কিন্তু সময়ও লাগছে’, যোগ করেন এই অধ্যাপক।