Image description

সৌদি আরবের পাঠ্যবইয়ে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। ইসলামি শিক্ষার বইয়েও এখন ধর্মীয় সহনশীলতা, শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান ও ভিন্ন মতের প্রতি সম্মানের ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে ইহুদি ও খ্রিস্টানদের নিয়ে আগের নেতিবাচক ও বিদ্বেষমূলক বক্তব্যগুলো বাদ দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে যুদ্ধ, জিহাদ ও শহীদ হওয়ার বিষয়গুলোও নতুনভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে।

লন্ডনভিত্তিক শিক্ষা ও পাঠ্যক্রম পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা ইমপ্যাক্ট-এসইর জুলাই ২০২৬-এর প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। সংস্থাটি সৌদি আরবের ২০২৪-২৫ ও ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষের ১৩৬টি পাঠ্যবই পর্যালোচনা করেছে। আরবি ভাষা, ইসলামি শিক্ষা, সামাজিক শিক্ষা, ইতিহাস, ভূগোল, সাহিত্য, জীবন ও পারিবারিক দক্ষতা এবং সমালোচনামূলক চিন্তাসহ বিভিন্ন বিষয়ের বই এতে অন্তর্ভুক্ত ছিল। সংস্থাটি ইউনেসকোর শান্তি ও সহনশীলতাবিষয়ক মানদণ্ডের আলোকে বইগুলো পর্যালোচনা করেছে।

প্রতিবেদনটির সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো, ইহুদিদের নিয়ে আগের বিদ্বেষমূলক বিষয়বস্তুর অবশিষ্ট অংশও এবার বাদ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। নতুন বইয়ে মহানবী মুহাম্মদ (সা.)-এর সঙ্গে ইহুদি, খ্রিস্টান ও অন্য সম্প্রদায়ের শান্তিচুক্তি ও সহাবস্থানের ঘটনাগুলো তুলে ধরা হচ্ছে। একাদশ শ্রেণির ইসলামি শিক্ষার একটি বইয়ে মহানবী (সা.)-এর ইহুদি, খ্রিস্টান ও আরব গোত্রগুলোর সঙ্গে করা শান্তিচুক্তিকে সহাবস্থানের উদাহরণ হিসেবে দেখানো হয়েছে।

খায়বারের ইহুদি দুর্গ অবরোধের পর সমঝোতার ঘটনাকেও শান্তি প্রতিষ্ঠার উদাহরণ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। ষষ্ঠ শ্রেণির একটি বইয়ে অমুসলিমদের প্রতি মহানবী (সা.)-এর সদয় আচরণ, যার মধ্যে ইহুদিদের কথাও রয়েছে, শিক্ষার্থীদের অনুসরণ করার মতো আদর্শ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।

এ পরিবর্তনটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সৌদি পাঠ্যবইয়ে ইহুদি ও খ্রিস্টানদের উপস্থাপনা একসময় অনেক বেশি নেতিবাচক ছিল। ইমপ্যাক্ট-এসইর আগের পর্যালোচনাগুলোতে এমন পাঠের সন্ধান পাওয়া গিয়েছিল, যেখানে ইহুদি ও খ্রিস্টানদের ‘অবিশ্বাসী’ ও ‘আল্লাহর শত্রু’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল। ইহুদিদের বিরুদ্ধে আধুনিক ষড়যন্ত্রতত্ত্বও ছিল। এমনকি একটি পাঠে ইহুদিদের সঙ্গে যুদ্ধ ও তাদের হত্যার বিষয়ে একটি হাদিসের ব্যাখ্যা ছিল। এসব বিষয় পরবর্তী সংস্করণগুলো থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।

শুধু ইহুদিদের বিষয়েই নয়, ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের উপস্থাপনাতেও পরিবর্তন এসেছে। সপ্তম শ্রেণির একটি বই থেকে ইহুদি, খ্রিস্টান ও জরথুস্ত্রবাদীদের বিকৃত বা অঙ্গহীন প্রাণীর সঙ্গে তুলনা করা একটি হাদিস বাদ দেওয়া হয়েছে। আরেকটি বই থেকে ইহুদিদের জাহান্নামের জন্য নির্ধারিত বলে বোঝানো বক্তব্য সরানো হয়েছে। শিয়া ও সুফিদের নিয়েও আগের কিছু অবমাননাকর ভাষা বাদ দেওয়া হয়েছে।

এ পরিবর্তনের আরেকটি দিক যুদ্ধ ও জিহাদ নিয়ে পাঠ। নতুন বইয়ে যুদ্ধের সময় সাধারণ মানুষ ও বেসামরিক স্থাপনায় হামলা নিষিদ্ধ করার বিষয়টি আরও স্পষ্ট করা হয়েছে। নবম শ্রেণির ইসলামি শিক্ষার একটি বইয়ে আগের এমন ভাষা বাদ দেওয়া হয়েছে, যাতে বিশেষ পরিস্থিতিতে বেসামরিক মানুষ ও তাদের সম্পদের ক্ষতি করার সুযোগ তৈরি হতো। নতুন সংস্করণে যুদ্ধে অংশ না নেওয়া মানুষ ও বেসামরিক সম্পদের ক্ষতি স্পষ্টভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

তবে এখানেও পুরোপুরি পরিবর্তন হয়নি। কিছু বইয়ে জিহাদকে এখনো সামরিক অর্থে এবং রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষের অধীনে পরিচালিত বিষয় হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। অর্থাৎ ব্যক্তিগতভাবে কেউ নিজে থেকে জিহাদের ডাক অনুসরণ করতে পারবে না—এ বিষয়টি জোর দিয়ে বলা হয়েছে। ইমপ্যাক্ট-এসইর বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, জিহাদকে সহিংসতার মহিমাকীর্তন থেকে সরিয়ে রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বের অধীন করার প্রবণতা এখন স্পষ্ট।

নারীর অবস্থান নিয়েও পরিবর্তনের ছাপ রয়েছে। ষষ্ঠ শ্রেণির সামাজিক শিক্ষার বইয়ে সৌদি সমাজ ও অর্থনীতিতে নারীর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কথা বলা হয়েছে। তৃতীয় শ্রেণির একটি বইয়ে ছেলে ও মেয়েকে সমানভাবে ঘরের কাজ করতে দেখা হয়েছে। মেয়েদের শুধু পোশাক ও কেনাকাটায় আগ্রহী হিসেবে দেখানোর পুরোনো উদাহরণও বাদ দেওয়া হয়েছে। দ্বাদশ শ্রেণির একটি ইসলামি শিক্ষার বই থেকে স্বামীর আনুগত্যকে আদর্শ স্ত্রীর বৈশিষ্ট্য হিসেবে তুলে ধরা একটি হাদিসও সরানো হয়েছে।

তবে নারী-পুরুষের ভূমিকা নিয়ে ঐতিহ্যগত ধারণা এখনো পুরোপুরি বাদ যায়নি। কিছু বইয়ে নারী ও পুরুষের আচরণ নিয়ে প্রচলিত ধারণা রয়ে গেছে। ফলে পরিবর্তনটি সম্পূর্ণ সমতার দিকে যাত্রা নয়। বরং পুরোনো কাঠামোর ভেতরে ধীরে ধীরে নতুন সামাজিক মূল্যবোধ ঢোকানোর চেষ্টা বলেই বেশি মনে হয়। ইমপ্যাক্ট-এসইও বলছে, সৌদি পাঠ্যক্রমে নারীর অংশগ্রহণ ও অন্তর্ভুক্তি বাড়লেও কিছু ঐতিহ্যগত ধারণা এখনো রয়ে গেছে।

ইসরায়েল প্রসঙ্গে পরিবর্তনটি আরও জটিল। আগে কিছু বইয়ে ‘ইহুদিবাদী শত্রু’ ধরনের ভাষা ব্যবহার করা হতো।

নতুন সংস্করণে সেই শব্দবন্ধের বদলে ‘ইসরায়েলি দখলদার’ বলা হচ্ছে। কিছু মানচিত্রে ‘ফিলিস্তিন’ লেখা বাদ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু ইসরায়েলকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি। নতুন পর্যালোচনায় এমন কোনো মানচিত্র পাওয়া যায়নি, যেখানে ইসরায়েলকে রাষ্ট্র হিসেবে দেখানো হয়েছে। কিছু বইয়ে এখনো ইসরায়েলকে ‘দখলদার রাষ্ট্র’ হিসেবে উল্লেখ করা হচ্ছে।

অর্থাৎ সৌদি আরব ইহুদিবিদ্বেষ কমাচ্ছে, কিন্তু ফিলিস্তিন প্রশ্নে তার অবস্থান পুরোপুরি বদলায়নি। ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে ইহুদিদের বিরুদ্ধে নেতিবাচক ধারণা কমানো হচ্ছে। কিন্তু ইসরায়েল-ফিলিস্তিন রাজনৈতিক সংঘাতকে এখনো সৌদি পাঠ্যক্রমে আলাদা রাজনৈতিক বাস্তবতা হিসেবে দেখা হচ্ছে। এই পার্থক্যটি বোঝা জরুরি।

সৌদি আরবের এই পরিবর্তন হঠাৎ করে আসেনি। গত কয়েক বছর ধরে ধারাবাহিকভাবে পাঠ্যবই বদলানো হচ্ছে। ইমপ্যাক্ট-এসইর ২০২০ সালের পর্যালোচনায় সৌদি বইয়ে ইহুদি ও খ্রিস্টানদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ, সহিংস জিহাদের প্রশংসা এবং নারীদের নিয়ে রক্ষণশীল ধারণার উপস্থিতি পাওয়া গিয়েছিল। এরপর ধাপে ধাপে এসব বিষয় সরানো হয়েছে। ২০২২-২৩ ও ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের পর্যালোচনাতেও একই ধারার পরিবর্তন দেখা যায়।

আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমও এই পরিবর্তনকে গুরুত্ব দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সাময়িকী ‘টাইম’ কয়েক বছর আগেই সৌদি পাঠ্যবই থেকে সহিংসতা ও অমুসলিমদের বিরুদ্ধে ঘৃণামূলক শিক্ষা বাদ দেওয়ার বিষয়টি তুলে ধরেছিল। সে সময় প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, এই পরিবর্তন সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের ‘ভিশন ২০৩০’-এর বৃহত্তর আধুনিকায়ন কর্মসূচির সঙ্গেও সম্পর্কিত। তবে তখনও কিছু সমস্যাজনক বিষয় রয়ে যাওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছিল।

আরব অঞ্চলের সংবাদমাধ্যম ‘সিএনএন আরাবিক’ ২০২৩ সালে সৌদি পাঠ্যবইয়ের পরিবর্তন নিয়ে লিখেছিল। ওই প্রতিবেদনে ইমপ্যাক্ট-এসইর আগের গবেষণার উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়েছিল, ইহুদি ও খ্রিস্টানদের ‘ইসলামের শত্রু’ হিসেবে দেখানোসহ তাদের নিয়ে প্রায় সব নেতিবাচক উদাহরণ নতুন বই থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। তবে ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেওয়ার ক্ষেত্রে তখনও কোনো পূর্ণ পরিবর্তন দেখা যায়নি।

সাম্প্রতিক পরিবর্তন নিয়ে ‘জেএনএস’ও প্রতিবেদন করেছে। সেখানে ইমপ্যাক্ট-এসইর প্রধান নির্বাহী মার্কাস শেফকে উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, সৌদি পাঠ্যক্রমে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের উপস্থাপনা এবং শান্তি ও সহনশীলতার বার্তা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় ইতিবাচক হয়েছে। একই প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষের ১৩৬টি বই পর্যালোচনায় উগ্রবাদ ও অসহিষ্ণু বিষয়বস্তু আরও কমে যাওয়ার প্রমাণ পাওয়া গেছে।

এখানে সৌদি সরকারের বৃহত্তর লক্ষ্যটিও গুরুত্বপূর্ণ। ইমপ্যাক্ট-এসইর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই শিক্ষাক্রম পরিবর্তন ‘ভিশন ২০৩০’-এর সঙ্গে যুক্ত। সৌদি আরব তেলনির্ভর অর্থনীতি থেকে বেরিয়ে একটি শিক্ষিত, দক্ষ, উদ্ভাবনী ও অর্থনৈতিকভাবে সক্রিয় প্রজন্ম গড়ে তুলতে চায়। সেই লক্ষ্য পূরণে উগ্র মতাদর্শকে বাধা হিসেবে দেখা হচ্ছে। পাঠ্যবই তাই শুধু ধর্ম শেখানোর মাধ্যম নয়। এটি ভবিষ্যৎ সৌদি নাগরিক তৈরির একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার।

তবে এই পরিবর্তনকে পুরোপুরি উদারীকরণ বলার সুযোগ নেই। কারণ পাঠ্যবইয়ে সৌদি রাষ্ট্র ও শাসকের প্রতি আনুগত্যের ওপরও জোর দেওয়া হয়েছে। মুসলিম ব্রাদারহুড, হিজবুল্লাহ, ইসলামিক স্টেট, আল-কায়েদা ও হুতিদের মতো সংগঠনকে উগ্রবাদী বা সন্ত্রাসী হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। অর্থাৎ একই শিক্ষাক্রমে সহনশীলতা বাড়ানোর পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বও জোরদার করা হচ্ছে।

আরেকটি বড় সীমাবদ্ধতা হলো ইতিহাস। ইমপ্যাক্ট-এসই বলছে, সৌদি পাঠ্যবইয়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আলোচনায় এখনো হলোকাস্ট বা ইহুদিদের ওপর নাৎসি নিপীড়নের যথেষ্ট আলোচনা নেই। অর্থাৎ ইহুদিদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষমূলক বক্তব্য বাদ দেওয়া হয়েছে ঠিকই, কিন্তু ইহুদি ইতিহাস ও তাদের ওপর সংঘটিত ভয়াবহ নির্যাতনের ইতিহাসও পর্যাপ্তভাবে শেখানো হচ্ছে না।

সব মিলিয়ে সৌদি পাঠ্যবইয়ের পরিবর্তনকে একটি দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক প্রকল্প হিসেবে দেখা যায়। কয়েক বছর আগের বইয়ের সঙ্গে আজকের বইয়ের তুলনা করলে পার্থক্য স্পষ্ট। ইহুদিদের ‘শত্রু’ হিসেবে দেখানোর প্রবণতা কমেছে। মহানবী (সা.)-এর সঙ্গে ইহুদি ও খ্রিস্টানদের শান্তিপূর্ণ সম্পর্কের দৃষ্টান্ত সামনে এসেছে। যুদ্ধের মধ্যেও বেসামরিক মানুষের সুরক্ষাকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। নারীর সামাজিক ও অর্থনৈতিক ভূমিকা আরও ইতিবাচকভাবে তুলে ধরা হচ্ছে। সমালোচনামূলক চিন্তা ও ভিন্ন মতের প্রতি শ্রদ্ধাকেও পাঠের অংশ করা হচ্ছে।

তবে এটিও সত্য যে পরিবর্তনের সীমা আছে। ইসরায়েলকে এখনো রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি। কিছু ধর্মীয় ও সামাজিক বিষয়ে পুরোনো ধারণা রয়ে গেছে। হলোকাস্টের মতো গুরুত্বপূর্ণ ইতিহাস অনুপস্থিত। তাই সৌদি শিক্ষাক্রমের এই পরিবর্তনকে ‘সম্পূর্ণ উদারীকরণ’ না বলে বরং রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত আধুনিকায়ন ও সহনশীলতার দিকে ধীরগতির অগ্রযাত্রা বলা বেশি যুক্তিযুক্ত। দীর্ঘ মেয়াদে এই পরিবর্তন সৌদি সমাজের নতুন প্রজন্মের ধর্মীয় ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিতে কতটা প্রভাব ফেলে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।