ক্যানসার চিকিৎসায় নতুন সম্ভাবনার ইঙ্গিত মিলেছে। ত্বকের ক্যানসারে আক্রান্ত রোগীদের অস্ত্রোপচারের পর নির্দিষ্ট ওষুধের সঙ্গে টিকা প্রয়োগে রোগীদের দীর্ঘ সময় ক্যানসারমুক্ত রাখা এবং শরীরের অন্য অংশে ক্যানসার ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিও কমেছে বলে দেখা গেছে। প্রাথমিক এই ফলাফলকে বড় অগ্রগতি হিসেবে দেখছেন ক্যানসার বিশেষজ্ঞরা।
সংবাদমাধ্যম বিবিসি বলছে, ত্বকের ক্যানসারে আক্রান্ত রোগীদের শরীরে অস্ত্রোপচারের পর আবার ক্যানসার ফিরে আসা ঠেকাতে সক্ষম হয়েছে রোগীভেদে তৈরি টিকা।
একটি ওষুধের সঙ্গে এই টিকা ব্যবহার করে চালানো পরীক্ষায় এমন ফল পাওয়া গেছে। ক্যানসারের চিকিৎসায় এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
মার্ক ও মডার্না ওষুধ কোম্পানি যৌথভাবে টিকাটি তৈরি করেছে। এই টিকাটি রোগীর টিউমারের নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী তৈরি করা হয়।
উচ্চঝুঁকির মেলানোমা তথা ত্বকের ক্যানসারে আক্রান্ত রোগীদের অস্ত্রোপচারের পর এই টিকা দেয়া হয়। প্রাথমিক ফলাফলে দেখা গেছে, টিকাটি নেয়া রোগীরা দীর্ঘ সময় ক্যানসারমুক্ত ছিলেন। তবে কতদিন পর্যন্ত এই সুফল থাকবে, তা এখনও স্পষ্ট নয় বলে জানিয়েছে দুই কোম্পানি।
এদিকে ক্যানসার বিশেষজ্ঞরা এটিকে বড় ধরনের অগ্রগতি হিসেবে দেখছেন।
তবে তারা সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন। কারণ পরীক্ষার পূর্ণাঙ্গ ফল এখনও প্রকাশিত হয়নি এবং স্বাধীন বিশেষজ্ঞদের দিয়ে ফলাফল যাচাই বা পর্যালোচনাও করা হয়নি।
এমনকি পরীক্ষার সব ধাপ শেষ হওয়ার পরও চিকিৎসাটি সাধারণ রোগীদের জন্য ব্যবহারের আগে নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন নিতে হবে। এরপর যুক্তরাজ্যের জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা (এনএইচএস) ব্যবস্থায় এটি ব্যবহারের জন্য আরও একটি অনুমোদন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হবে।
ইন্টিসমেরান নামের এই টিকাটি ইতোমধ্যে ক্যানসারের চিকিৎসায় ব্যবহৃত ইমিউনোথেরাপি ওষুধ কিট্রুডার সঙ্গে দেয়া হয়েছে। কোম্পানি দুটির দাবি, শুধু কিট্রুডা ব্যবহারের তুলনায় টিকা ও ওষুধ একসঙ্গে ব্যবহার করলে রোগীরা উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি সময় ক্যানসারমুক্ত রয়েছেন। একই সঙ্গে শরীরের অন্য অঙ্গে ক্যানসার ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিও কমেছে।
বিবিসি বলছে, তৃতীয় ধাপের এই পরীক্ষায় এক হাজারের বেশি রোগী অংশ নেন। তাদের সবারই উচ্চঝুঁকির দ্বিতীয়, তৃতীয় বা চতুর্থ পর্যায়ের মেলানোমা ছিল। অর্থাৎ কারও শরীরের নির্দিষ্ট জায়গায় বড় টিউমার ছিল, আবার কারও ক্যানসার শরীরের অন্য অংশেও ছড়িয়ে পড়েছিল।
মার্ক ও মডার্না এটিকে ব্যক্তিকেন্দ্রিক টিকা বলছে। কারণ প্রতিটি রোগীর ক্যানসারের ধরন অনুযায়ী টিকাটি তৈরি করা হয়। এই টিকা তৈরিতে বিজ্ঞানীরা এমআরএনএ প্রযুক্তি ব্যবহার করেছেন। কোভিড-১৯-এর কিছু টিকাতেও এই প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছিল।
টিকা তৈরির জন্য অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে রোগীর টিউমারের সামান্য অংশ সংগ্রহ করা হয়। এরপর সেটির ডিএনএ পরীক্ষা করে ক্যানসার কোষের নির্দিষ্ট জিনগত পরিবর্তন শনাক্ত করা হয়। এর ভিত্তিতে রোগীর টিউমারের জন্য বিশেষভাবে তৈরি করা হয় ক্যানসারের বিরুদ্ধে কাজ করা টিকাটি। এর মাধ্যমে রোগীর রোগপ্রতিরোধী ব্যবস্থাকে শরীরে থাকা ক্যানসার কোষ শনাক্ত করে সেগুলো ধ্বংস করার নির্দেশ দেয়া হয়।
ফুসফুস, মূত্রথলি ও কিডনির ক্যানসারের জন্যও একই ধরনের ব্যক্তিকেন্দ্রিক টিকা নিয়ে পরীক্ষা চালাচ্ছে কোম্পানি দুটি। মডার্নার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা স্টেফান বানসেল বলেন, এই ফলাফল ক্যানসার গবেষণার ক্ষেত্রে ‘গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি’ হিসেবে সামনে এসেছে।
এদিকে ফলাফল প্রকাশের পর মডার্না ও মার্ক— দুটি কোম্পানির শেয়ারের দামও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
ক্যানসার বিশেষজ্ঞরাও খবরটিকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। তবে তারা জোর দিয়ে বলছেন, এই ফলাফল এখনও প্রাথমিক পর্যায়ের। ক্যানসার রিসার্চ ইউকের প্রতিরোধ ও প্রাথমিক শনাক্তকরণ বিভাগের প্রধান ডা. তালিসিয়া কোয়ালো বলেন, গবেষণাটি ‘আশাব্যঞ্জক ফল দেখিয়েছে’। তবে এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্য পুরোপুরি পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, এ ধরনের গবেষণায় অর্থায়ন অব্যাহত রাখা জরুরি, যাতে ক্যানসারে আক্রান্ত আরও বেশি মানুষ ব্যক্তিকেন্দ্রিক চিকিৎসার সুযোগ পান এবং দীর্ঘ ও ভালো জীবনযাপন করতে পারেন।
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল অনকোলজিস্ট ও সহযোগী অধ্যাপক ডা. লেনার্ড লি বলেন, মেলানোমায় আক্রান্ত রোগীদের জন্য এটি অবশ্যই ভালো খবর। তবে এর প্রভাব আরও বিস্তৃত। তার মতে, ব্যক্তিকেন্দ্রিক ক্যানসারের টিকা যে কার্যকর হতে পারে তা এই গবেষণায় প্রমাণ হয়েছে।
শীর্ষনিউজ