ভারতের কলকাতার নিউমার্কেটের মির্জা গালিব স্ট্রিটের একটি বহুতল ভবনের হোটেলে আগুনে ৯ বাংলাদেশির মৃত্যু হয়েছে। মৃতদের মধ্যে ছয়জন পুরুষ, দুজন মহিলা এবং একটি শিশু রয়েছে।
মঙ্গলবার রাত সোয়া ৪টার দিকে ভবনটির তৃতীয় তলায় থাকা একটি হোটেল থেকে আগুনের সূত্রপাত বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে। ওই বহুতল ভবনের প্রায় প্রতিটি তলাতেই আলাদা হোটেল বা গেস্ট হাউস রয়েছে।
ঘরগুলো ছোট এবং যাতায়াতের জায়গাও অত্যন্ত সঙ্কীর্ণ। ভবনে ঢোকার এবং বের হওয়ার মূল পথ একটিই। আপৎকালীন নির্গমন ব্যবস্থাও ছিল না বলে অভিযোগ অতিথিদের। আগুন লাগার পর বহু মানুষ ঘর থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করে।
কিন্তু ধোঁয়ায় করিডর ও বারান্দা ঢেকে যাওয়ায় দিকনির্ণয় করা কঠিন হয়ে পড়ে। কয়েকজন অতিথি শৌচাগারে আশ্রয় নিয়ে জানলা ভেঙে বের হওয়ার চেষ্টা করেন। পরে দমকলকর্মীরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে ভবনের ভেতরে আটকেপড়া অতিথিদের উদ্ধার করেন। রামপুরহাট থেকে মঙ্গলবার রাতে নিউমার্কেটে এসেছিলেন ইজাজ আহমেদ ও তার এক বন্ধু। তারা বহুতল ভবনের চতুর্থ তলার একটি গেস্ট হাউসে উঠেছিলেন।
ইজাজের দাবি, রাত সাড়ে ১২টা নাগাদ খাওয়ার পর তারা ঘুমিয়ে পড়েন। রাত প্রায় ২টা ১৫ মিনিটে দুই মহিলার চিৎকারে তাদের ঘুম ভাঙে। দরজা খোলার সঙ্গে সঙ্গেই ঘরে ধোঁয়া ঢুকে পড়ে। বাইরে বেরিয়ে তারা দেখেন, সরু বারান্দাটিও ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন।
অতিথিদের একাংশের অভিযোগ, আগুন লাগার পর হোটেল কর্তৃপক্ষের কাউকে তারা দেখতে পাননি। অগ্নিনির্বাপণের পর্যাপ্ত ব্যবস্থাও ছিল না বলে অভিযোগ। এক অতিথি বলেন, দমকলকর্মীরা দ্রুত ঘটনাস্থলে না পৌঁছালে আরো বড় বিপদ ঘটতে পারত। বহুতলের সর্বোচ্চ তলায় থাকা একটি পরিবারকেও পরে উদ্ধার করা হয়।
পরিবারের এক মহিলার অভিযোগ, হোটেলে অগ্নিনিরাপত্তার ব্যবস্থা করার জন্য আগেও কর্তৃপক্ষকে সতর্ক করা হয়েছিল। প্রশাসনের কাছে অভিযোগ জানিয়েও কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি বলে তার দাবি। ঘটনাকে কেন্দ্র করে প্রশ্ন উঠেছে, প্রয়োজনীয় অগ্নিনিরাপত্তাব্যবস্থা না থাকা সত্ত্বেও কিভাবে ওই ভবনে একাধিক হোটেল ও গেস্ট হাউস চলছিল। সংশ্লিষ্ট হোটেলের দমকলের প্রয়োজনীয় ছাড়পত্র ছিল কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
বিজেপি নেতা সন্তোষ পাঠক অভিযোগ করেন, ‘এগুলো মূলত আবাসিক ভবন ছিল। সেটাকে বেআইনিভাবে বাণিজ্যিক করা হয়েছে।’
তার দাবি, হোটেলের ঘর বাড়ানোর জন্য ভবনের পিলার পর্যন্ত কাটা হয়েছিল। এতে কাঠামোগতভাবে ভবনটি দুর্বল হয়ে পড়ে থাকতে পারে বলে অভিযোগ তার। অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় এখন মূল তদন্তের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে ভবনের অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা, হোটেলগুলোর বৈধতা এবং দমকলের অনুমোদন।
পাশাপাশি, ঘটনার আগে নিরাপত্তা সংক্রান্ত অভিযোগ প্রশাসনের কাছে পৌঁছেছিল কি না, পৌঁছে থাকলে কেন ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি তা নিয়েও উঠছে প্রশ্ন।
হোটেলগুলি গলির মধ্যে। ফলে দমকলের গাড়ির বেশি ভিতরে ঢোকার অবকাশ ছিল না। প্রথমে বাইরে থেকে আগুন নেবানোর চেষ্টা করেন দমকলকর্মীরা। পরে তারা হোটেলের ভিতরে ঢুকে উদ্ধারকাজ শুরু করেন। কী ভাবে আগুন লাগল, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে? দমকলের প্রাথমিক অনুমান, শর্ট সার্কিট থেকে আগুন লাগতে পারে। তবে বিষয়টি নিয়ে তদন্ত হয়েছে। ঘটনাস্থলে যাবেন ফরেনসিক বিশেষজ্ঞেরা।
হাসপাতাল সূত্রে খবর, মৃতদের শরীরে দগ্ধ হওয়ার বা ঝলসে যাওয়ার চিহ্ন তেমন নেই। চিকিৎসকদের প্রাথমিক অনুমান, শ্বাসরোধ হয়ে তাদের মৃত্যু হয়েছে। তবে ময়নাতদন্তের পরই মৃত্যুর আসল কারণ স্পষ্ট হবে। কয়েক জনের অবস্থা এখনও আশঙ্কাজনক।
দমকল প্রতিমন্ত্রী কৌশিক চৌধুরী বলেন, ‘কী করে এই হোটেলগুলো পারমিট পেল, ট্রেড লাইসেন্স পেল, সেটা তদন্ত করে দেখা খুবই প্রয়োজন। আমরা সব খতিয়ে দেখে কড়া ব্যবস্থা নেব। দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। মুখ্যমন্ত্রী ঘটনার দিকে নজর রেখেছেন।’
সূত্র: আনন্দবাজার ও এই সময়