ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য অরুণাচল প্রদেশে চীনের বিরুদ্ধে নতুন করে ভূমি দখলের অভিযোগ উঠেছে। সীমান্তের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি টহল পয়েন্টে ভারতীয় সেনাবাহিনীকে যেতে না দেওয়ার অভিযোগও করা হয়েছে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকারের মিত্র আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলের একটি অনুসন্ধানী দল এসব অভিযোগ তুলেছে।
এ নিয়ে নয়াদিল্লিতে রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বিরোধীরা অভিযোগ করেছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সীমান্তের বিভিন্ন এলাকায় চীনের কথিত ভূমি দখল নিয়ে মোদি সরকার নীরব থেকেছে।
অভিযোগের কেন্দ্র অরুণাচল প্রদেশের দুর্গম ও পাহাড়ি আপার সুবানসিরি জেলা। নতুন এসব তথ্য ভারত ও চীনের সম্পর্কে সাম্প্রতিক উষ্ণতার উদ্যোগে প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ভারত ও চীন দীর্ঘদিনের প্রতিদ্বন্দ্বী। ১৯৬২ সালে দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধও হয়েছিল। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বাণিজ্যযুদ্ধ ভারত ও চীন—দুই দেশকেই লক্ষ্যবস্তু করেছে। আগামী ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লিতে ব্রিকস সম্মেলন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। এতে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের ভারত সফরের সম্ভাবনা রয়েছে। এর কয়েক সপ্তাহ আগে নতুন করে সীমান্ত নিয়ে এই অভিযোগ সামনে এল।
অনুসন্ধানী দল কী পেয়েছে
অরুণাচল প্রদেশের পিপলস পার্টি অব অরুণাচল (পিপিএ) চার সদস্যের একটি অনুসন্ধানী দল দুর্গম ওই এলাকায় পাঠায়। দলটির পাঠানোর কারণ ছিল চীনের কথিত ভূমি দখল নিয়ে প্রাথমিক কিছু প্রতিবেদন।
পিপিএর ভাইস প্রেসিডেন্ট কালিং জেরাং আল-জাজিরাকে এসব তথ্য জানান।
পিপিএ উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিজেপি নেতৃত্বাধীন জোট নর্থ ইস্ট ডেমোক্রেটিক অ্যালায়েন্সের অংশ। অরুণাচল প্রদেশেও বিজেপি সরকার রয়েছে।
অনুসন্ধানী দলের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, খারাপ আবহাওয়ার কারণে অরুণাচলের তাকসিং এলাকায় এপ্রিল থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ভারতীয় সেনারা নিয়মিত টহল দিতে পারেন না। এ সময়ে আকস্মিক বন্যা, বর্ষার আগে ও বর্ষাকালের ভারী বৃষ্টি এবং ভূমিধসের ঘটনা ঘটে।
অন্যদিকে, প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, এই সময়ে সীমান্ত এলাকায় চীনা বাহিনী সক্রিয় থাকে। এতে সম্ভাব্য আগ্রাসন মোকাবিলায় ভারতীয় সীমান্ত অবকাঠামোর প্রস্তুতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
জেরাংয়ের প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, স্থানীয় বাসিন্দারা অনুসন্ধানী দলকে জানিয়েছেন, ২০২৩ সালে চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মির (পিএলএ) সঙ্গে সংঘর্ষের পর ভারতীয় বাহিনী শেরা-৫ নামের একটি সীমান্ত টহল পয়েন্ট ছেড়ে যায়।
জেরাং বলেন, চীনের কথিত অনুপ্রবেশের কারণে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে ক্ষোভ রয়েছে। তাদের পূর্বপুরুষদের শিকার করা এলাকার নিয়ন্ত্রণও তারা হারিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
জেরাংয়ের ভাষ্য, এসব অনুপ্রবেশের তথ্য অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
তার দাবি, চীনের এই কথিত ভূমি দখল হঠাৎ করে হয়নি। বছরের পর বছর ধরে ধীরে ধীরে এর বিস্তার ঘটেছে।
তিনি অভিযোগ করেন, নয়াদিল্লি ও অরুণাচল প্রদেশের বিজেপি সরকার সীমান্তের মানুষের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে।
এর আগে গত মাসে স্থানীয় একটি আদিবাসী সংগঠন নাহ ওয়েলফেয়ার সোসাইটিও (এনডব্লিউএস) সরকারি কর্মকর্তাদের কাছে চিঠি দেয়। এতে তারা অভিযোগ করে, যতটা সম্ভব জমি দখলের উদ্দেশ্যে চীনের কথিত অনুপ্রবেশ বহুগুণ বেড়েছে।
ভারত ও চীনের প্রতিক্রিয়া
ভারতীয় সেনাবাহিনী চীনা বাহিনীর কথিত ভূমি দখল নিয়ে প্রকাশিত সংবাদকে ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছে। সেনাবাহিনীর ভাষ্য, এসব প্রতিবেদন ‘ভুল ও ভিত্তিহীন’।
তবে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিষয়টি সরাসরি নাকচ করেনি।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল সাংবাদিকদের বলেন, সীমান্তের বিষয়গুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে ভারত সব সময় চীনের সঙ্গে আলোচনায় জোর দিয়ে আসছে। সীমান্ত এলাকায় শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে জানান তিনি।
জয়সওয়াল আরো বলেন, সীমান্ত পরিস্থিতি দুই দেশের সামগ্রিক দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ওপর প্রভাব ফেলবে।
চীনও নতুন করে সীমান্ত উত্তেজনার অভিযোগ নিশ্চিত বা অস্বীকার করেনি। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র গুয়ো জিয়াকুন বলেন, বর্তমানে চীন-ভারত সীমান্ত পরিস্থিতি মোটামুটি স্থিতিশীল।
তিনি জানান, গত সপ্তাহে দুই দেশ সীমান্তবিষয়ক ৩৬তম বৈঠক করেছে। কূটনৈতিক ও সামরিক চ্যানেলে যোগাযোগ বজায় রাখার বিষয়ে দুই পক্ষ একমত হয়েছে। সীমান্ত এলাকায় শান্তি ও স্থিতিশীলতা যৌথভাবে বজায় রাখার কথাও বলা হয়েছে।
সীমান্ত বিরোধের ইতিহাস
ভারত ও চীনের মধ্যে দীর্ঘদিনের সীমান্ত বিরোধ রয়েছে। দুই দেশের সম্পর্কের বড় মতপার্থক্যের কেন্দ্রেও রয়েছে এই বিরোধ।
এই বিরোধের ইতিহাসে ব্রিটিশ শাসনের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। ১৯১৪ সালে ব্রিটিশ ভারত ও তিব্বত সিমলা কনভেনশনে সই করে। তখন তিব্বত চীনের নিয়ন্ত্রণে ছিল না। ওই চুক্তিতে ম্যাকমোহন লাইন নামে একটি সীমারেখা নির্ধারণ করা হয়।
তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের পররাষ্ট্রসচিব হেনরি ম্যাকমোহন এই চুক্তির প্রধান আলোচক ছিলেন।
১৯৪৭ সালে স্বাধীনতার পর ভারত ম্যাকমোহন লাইনকে চীনের সঙ্গে নিজের সীমান্ত হিসেবে বিবেচনা করে। কিন্তু ১৯৪৯ সালে কমিউনিস্ট শাসন প্রতিষ্ঠার পর চীন এই সীমারেখা প্রত্যাখ্যান করে। বেইজিংয়ের যুক্তি, সিমলা কনভেনশনের আলোচনায় চীন অংশ নেয়নি।
চীন পুরো অরুণাচল প্রদেশের ওপরও দাবি করে। তারা অঞ্চলটিকে ‘দক্ষিণ তিব্বত’ বা ‘জাংনান’ বলে উল্লেখ করে। এ ছাড়া বিতর্কিত কাশ্মীরের আকসাই চিন অঞ্চল চীনের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। ভারত ও পাকিস্তান পুরো কাশ্মীরের ওপরই দাবি করে।
১৯৬২ সালের যুদ্ধের পর ভারত ও চীন দুই দেশের নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকা বোঝাতে লাইন অব অ্যাকচুয়াল কন্ট্রোল বা প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখাকে কার্যত সীমান্ত হিসেবে বিবেচনা করে। একই সঙ্গে বৃহত্তর সীমান্ত বিরোধ মীমাংসার আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার কথা ছিল।
তবে দুই দেশ এখনো প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখার অবস্থান নিয়েও একমত হতে পারেনি বলে জানিয়েছেন দিল্লির জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের চীনা অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক বিআর দীপক।
তার মতে, বিভিন্ন এলাকায় প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা কোথায়, তা নিয়ে ভারত ও চীনের দাবি আলাদা। ফলে দুই দেশের টহল দলই এমন এলাকায় ঢুকে পড়তে পারে, যেটিকে অন্য দেশ নিজেদের এলাকা বলে দাবি করে।
বারবার মুখোমুখি ভারত-চীন
সীমান্তের পশ্চিমাঞ্চলীয় অংশে লাদাখের পাহাড়ি এলাকায় সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভারত ও চীনের সেনারা একাধিকবার মুখোমুখি হয়েছে।
২০২০ সালের জুনে লাদাখের গালওয়ানে দুই দেশের সেনাদের মধ্যে হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। এতে অন্তত ২০ জন ভারতীয় ও ৪ জন চীনা সেনা নিহত হন।
পূর্বাঞ্চলেও উত্তেজনা রয়েছে। এই অংশে ভারতের সিকিম ও অরুণাচল প্রদেশ রয়েছে। সিকিমের নাকু লা এলাকায় ২০২০ সালের মে মাসে দুই দেশের সেনাদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। ২০২১ সালের জানুয়ারিতেও সেখানে আবার সংঘর্ষ হয়।
সীমান্তের মধ্যাঞ্চলে উত্তরাখণ্ডের বারাহোতি ও হিমাচল প্রদেশের শিপকি লা এলাকায় দুই দেশের ছোট পরিসরের বিরোধ রয়েছে।
এ ছাড়া ভারত, চীন ও ভুটানের সীমান্তসংলগ্ন ডোকলাম মালভূমিতেও বড় ধরনের উত্তেজনা হয়েছিল। ২০১৭ সালে চীন সেখানে ভারী সড়ক নির্মাণের সরঞ্জাম নিয়ে আসে। তারা একটি সামরিক সড়ক দক্ষিণ দিকে বাড়ানোর চেষ্টা করেছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। এ নিয়ে ভারতীয় সেনাদের সঙ্গে চীনের ৭৩ দিনের উত্তেজনাপূর্ণ অচলাবস্থা তৈরি হয়।
জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক দীপক বলেন, সীমান্তের ছোট কোনো ঘটনা বড় ধরনের উত্তেজনায় রূপ নেওয়ার আশঙ্কা সব সময় থাকে। অতীতে গালওয়ানের মতো ঘটনাতেও এমন পরিস্থিতি দেখা গেছে।
বাণিজ্য বাড়লেও কাটেনি অবিশ্বাস
সীমান্তে উত্তেজনা থাকলেও গত এক দশকে ভারত ও চীনের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য বেড়েছে।
বেইজিংয়ে ভারতের দূতাবাসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দুই দেশের পণ্য বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ১৫১ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলার। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে এই পরিমাণ ছিল ৭১ দশমিক ৪৫ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ এক দশকে তা দ্বিগুণের বেশি হয়েছে।
তবে এই বাণিজ্যের বড় অংশই ভারতের চীন থেকে আমদানিনির্ভর। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে চীন থেকে ভারতের আমদানির পরিমাণ ছিল ৬১ দশমিক ২৮ বিলিয়ন ডলার। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা বেড়ে ১৩১ দশমিক ৬৩ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে।
অন্যদিকে, একই সময়ে ভারতে চীনের রপ্তানি নয়, ভারতের চীনে রপ্তানি বেড়েছে ১০ দশমিক ১৭ বিলিয়ন ডলার থেকে ১৯ দশমিক ৪৭ বিলিয়ন ডলারে।
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাম্প প্রশাসন ভারতকে ‘ছায়া ট্রান্সশিপমেন্ট নেটওয়ার্ক’-এর সঙ্গে যুক্ত একটি প্রথম সারির দেশ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ, এই নেটওয়ার্কের মাধ্যমে চীন মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ও শুল্ক এড়াতে পারছে।
মুম্বাইয়ের সোমাইয়া বিদ্যাবিহার বিশ্ববিদ্যালয়ের চীনা সম্পর্কবিষয়ক সহকারী অধ্যাপক সাহেলি চট্টরাজ বলেন, সীমান্ত বিরোধের মধ্যেও কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্কের উন্নতি ভারত-চীন সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য।
তার মতে, সীমান্ত বিরোধের সমাধান না হলেও অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক যোগাযোগ বাড়তে পারে। ভারত-চীন সম্পর্ককে প্রকৃত স্বাভাবিক সম্পর্কের বদলে ‘নিয়ন্ত্রিত প্রতিযোগিতা’ হিসেবে দেখা ভালো।
চট্টরাজের মতে, বিতর্কিত সীমান্তে শক্তির ভারসাম্যে নিজেদের সুবিধাজনক অবস্থান ধরে রাখতেই চীনের আচরণকে দেখা যেতে পারে। এর মাধ্যমে তারা ভারতকে বোঝাতে চায় যে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের উন্নতি হলেও কৌশলগত শক্তির ভারসাম্যে মৌলিক পরিবর্তন হয়নি।
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক প্রবীণ দোন্ধিও মনে করেন, ভারত ও চীন দীর্ঘমেয়াদে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবেই থাকবে।
তার মতে, সীমান্ত বিরোধের সমাধান না হওয়া পর্যন্ত এই অমীমাংসিত বিরোধ দুই দেশের সম্পর্ককে তাড়িয়ে বেড়াবে।