টেলিগ্রাফের সম্পাদকীয়
গত সপ্তাহে বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নয়াদিল্লিতে সাংবাদিকদের সামনে বক্তব্য দেয়ার পর ভারতের সঙ্গে ঢাকার সম্পর্ক নতুন করে অস্থিরতার মধ্যে পড়েছে। শেখ হাসিনা, তার ছেলে এবং আওয়ামী লীগের অন্য নেতারা ভারতীয় প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে বাংলাদেশে ২০২৪ সালের আগস্টের গণঅভ্যুত্থানকে খাটো করার চেষ্টা করেছেন। ওই গণঅভ্যুত্থানে তারা ক্ষমতাচ্যুত হন। তারা ইঙ্গিত দিয়েছেন, বাংলাদেশে এখন ইসলামপন্থী উগ্রবাদী ও সন্ত্রাসীরা অবাধে তৎপরতা চালানোর সুযোগ পাচ্ছে। ভারতের প্রভাবশালী ইংরেজি দৈনিক টেলিগ্রাফের এক সম্পাদকীয়তে এসব কথা বলা হয়েছে।
এতে আরও বলা হয়- অনুমান করা যায়, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ সরকার শেখ হাসিনা ও তার মিত্রদের এসব বক্তব্যের পাশাপাশি আওয়ামী লীগের নেতাকে বক্তব্য দেয়ার সুযোগ করে দেয়ার জন্য নয়াদিল্লিরও সমালোচনা করেছে। বাংলাদেশ সরকার নয়াদিল্লির কাছে শেখ হাসিনাকে ভারত থেকে বাংলাদেশে দ্রুত প্রত্যর্পণের দাবিও জানিয়েছে। বাংলাদেশে মানবতাবিরোধী অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হয়ে শেখ হাসিনা মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত। সোমবার বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর সঙ্গে তারেক রহমানের বৈঠকেও শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের দাবি পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে।
এটা এমন এক সময়ে ঘটেছে যখন শেখ হাসিনা বাংলাদেশে ফিরে যাওয়ার সম্ভাবনার কথা জানিয়েছেন। এ সময়ে নয়াদিল্লির দৃষ্টিভঙ্গি পরিচালিত হতে হবে একটি সূক্ষ্ম ভারসাম্যের ভিত্তিতে। তাতে ভারত তার বন্ধুদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারবে না। ঢাকার সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের ওপর শেখ হাসিনাকে ভেটো দেয়ার ক্ষমতাও দেয়া যাবে না। নয়াদিল্লির জন্য এই ভারসাম্য বজায় রাখা সহজ হবে না। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে যখন পরিস্থিতি অত্যন্ত সংবেদনশীল হয়ে ওঠে, তখন কূটনীতিকেও বিশেষভাবে সতর্ক ও সংবেদনশীল হতে হয়।
শেখ হাসিনার সবচেয়ে কড়া সমালোচকদের কেউ কেউ আবার তীব্রভাবে ভারতবিরোধীও। তাদের অভিযোগ, শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসনামলে সংঘটিত নানা বাড়াবাড়ির জন্য ভারত এবং দীর্ঘদিন ধরে শেখ হাসিনাকে দেয়া ভারতের সমর্থনই দায়ী।
ফলে নয়াদিল্লি জানে, শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে দেয়ার দাবিতে যারা সোচ্চার, তাদের অনেকেই তাকে ভারতের একজন প্রক্সি বা প্রতিনিধি হিসেবে দেখেন। ভারতের পক্ষে তাদের সঙ্গে আপস করা সম্ভব নয়। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে তাদের অংশীদারে পরিণত করা সম্ভব হবে- এমন কোনো বিভ্রমেও ভারতের থাকা উচিত নয়।
অন্যদিকে, বাংলাদেশ-ভারতের গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্কও ভারত কোনোভাবেই পরিত্যাগ করতে পারে না। আশার বিষয় হলো, গত কয়েক মাসের ঘটনাপ্রবাহ দেখিয়েছে যে সামনে এগিয়ে যাওয়ার একটি পথ এখনো সম্ভব। তারেক রহমানের বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে নতুন করে টিকে থাকার একটি সুযোগ করে দিয়েছে, যার ওপর দুই দেশের সরকারই এরপর থেকে সম্পর্ক এগিয়ে নেয়ার চেষ্টা করেছে।
এখন সেই অগ্রগতির ধারাবাহিকতা নির্ভর করছে নয়াদিল্লি ও ঢাকার ওপর। তারা দু’পক্ষের সম্পর্ককে শেখ হাসিনার দীর্ঘ ছায়ার বাইরে নিয়ে যেতে পারবে কি না, সেই ধারাবাহিকতা নির্ভর করছে তার ওপর। এটি সীমান্তের দুই পাশের উত্তেজনা কমাতে পারে। কূটনৈতিক জটিলতা এড়িয়ে চলার জন্য এখন স্পষ্ট অবস্থান এবং শান্ত পরিবেশ- দু’টিই অপরিহার্য।