Image description

ইউরোপের দক্ষিণাঞ্চলে শুরু হয়েছে ভয়াবহ দাবানল। জুলাইয়ের শেষ সপ্তাহে দুই দেশে ছড়িয়ে পড়া আগুনে আড়াই লাখেরও বেশি মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। ফ্রান্সের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল, বিশেষ করে বোর্দো এলাকার আশপাশে আগুন এত দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে যে সরকার সেনাবাহিনী মোতায়েন করেছে। অন্যদিকে স্পেনে প্রথমবারের মতো শনিবার (২৫ জুলাই) জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয়েছে এবং দেশটিতে দাবানলে একজনের মৃত্যুর খবরও পাওয়া গেছে।

চলতি বছর স্পেনে ইতিমধ্যে এক লাখ ৩০ হাজার হেক্টরের বেশি বনভূমি পুড়ে গেছে। ফ্রান্সেও প্রায় এক লাখ হেক্টর বন আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিভিন্ন দেশ যৌথভাবে অগ্নিনির্বাপণ উড়োজাহাজ ও উদ্ধারকর্মী পাঠিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের জরুরি স্যাটেলাইট পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা (কোপারনিকাস ইএমএস) ফ্রান্সের আবহাওয়া সংস্থা মেটিও ফ্রান্স এবং স্পেনের কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, দীর্ঘস্থায়ী তাপপ্রবাহ, কম আর্দ্রতা এবং প্রবল বাতাস আগুনকে দ্রুত ছড়িয়ে দিচ্ছে।

একসময় দক্ষিণ ইউরোপে বড় ধরনের দাবানল কয়েক বছর পরপর দেখা যেত। এখন প্রায় প্রতি গ্রীষ্মেই ফ্রান্স, অস্ট্রেলিয়া, স্পেন, পর্তুগাল, ইতালি ও গ্রিসে ব্যাপক দাবানল হচ্ছে। এর পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ জলবায়ু পরিবর্তন, তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং দীর্ঘস্থায়ী খরার।

এখন প্রায় প্রতিবছর দাবানল কেন হচ্ছে

ইউরোপের ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে গ্রীষ্মকালীন দাবানলের ঘটনা অস্বাভাবিক কিছু নয়। অতীতেও বনাঞ্চলে আগুন লাগত, তবে সেসময় গ্রীষ্মকাল ক্ষণস্থায়ী ছিল বলে বড় দাবানলও কয়েক বছর পরপর দেখা যেত। বনভূমিতে পর্যাপ্ত আর্দ্রতা থাকায় আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ত না। তাছাড়া শীতে তুষারপাত ও বসন্তে বৃষ্টি হওয়ায় গাছপালা শুকিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিও কম ছিল।

কিন্তু গত তিন দশকে পরিস্থিতি বদলে গেছে। ইউরোপের জলবায়ু পর্যবেক্ষণ সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল খুব দ্রুত উষ্ণ হয়ে যায়, যার ফলে এলাকাটি পৃথিবীর সবচেয়ে উষ্ণ অঞ্চলে পরিণত হয়েছে। এসব কারণে বনভূমি দীর্ঘ সময় শুকনো থাকে এবং সামান্য স্ফুলিঙ্গেও বড় দাবানলের সৃষ্টি হয়।

ইদানীং ইউরোপে ৪০ থেকে ৪৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা একটানা কয়েক সপ্তাহ স্থায়ী হচ্ছে। এতে বনভূমির গাছ, ঝোপ ও ঘাস দ্রুত শুকিয়ে যাচ্ছে। এদিকে শীত ও বসন্তের স্থায়িত্ব আগের তুলনায় কম হওয়ায় বৃষ্টিপাত কমে গেছে। আর বৃষ্টি কমে যাওয়ায় মাটির আর্দ্রতাও কমে যাচ্ছে।

এদিকে মাটিতে পানি না থাকায় গাছগুলো মরে যাচ্ছে। শুকিয়ে যাচ্ছে গাছের পাতা। ফলে বৃক্ষ-পল্লবগুলো জ্বালানিতে পরিণত হচ্ছে। তাছাড়া স্পেন ও দক্ষিণ ফ্রান্সে এসময় যে প্রবল বাতাস হয়, তা আগুনকে কয়েক কিলোমিটার পর্যন্ত ছড়িয়ে দেয়।

ইউরোপের গ্রামগুলোতে সাধারণত মানুষ কম থাকে। ফলে ঝোপঝাড়গুলোও নিয়মিত পরিষ্কার করা হয় না। এতে বনের শুকনো গাছ, ডালপালা ও পাতা জমে জৈব পদার্থে পরিণত হয় এবং আগুনের ঝুঁকি বাড়ায়।

ইউরোপে অধিকাংশ দাবানল শুরু হয় মানুষের অসাবধানতা থেকেই। যেমন, সিগারেটের অবশিষ্টাংশ, ক্যাম্পফায়ার, বৈদ্যুতিক ত্রুটি থেকে আগুন লাগে। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডাব্লিউএমও), জাতিসংঘের জলবায়ু প্যানেল (আইপিসিসি) এবং ইউরোপীয় পরিবেশ সংস্থাগুলোর (ইইএ) মতে, বৈশ্বিক উষ্ণায়ন দাবানলের মৌসুমকে দীর্ঘ করছে এবং আগুনের তীব্রতাও বাড়িয়ে দিচ্ছে।

বাংলাদেশে কি আগে দাবানল হয়েছে

বাংলাদেশে ফ্রান্স বা স্পেনের মতো বিশাল আকারের দাবানলের কোনো ইতিহাস নেই। তবে ছোট পরিসরে বনাঞ্চলে আগুন লাগার ঘটনা ঘটেছে। সবচেয়ে বেশি আলোচিত ঘটনা সুন্দরবনের অগ্নিকাণ্ড। ২০১৪, ২০১৬, ২০১৭, ২০১৮, ২০২১, ২০২৪ ও ২০২৫ সালে সুন্দরবনের বিভিন্ন অংশে আগুন লাগে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আগুনের কারণ ছিল মানুষের অসাবধানতা। যেমন মধু সংগ্রহ করতে গিয়ে অনেক সময় মৌয়ালদের ফেলে দেওয়া বিড়ি-সিগারেটের টুকরা থেকে আগুন লেগে যায়। যদিও এসব আগুন দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনা হয়। ফলে ইউরোপের মতো হাজার হাজার হেক্টর বন পুড়ে যায়নি। তবে বন্যপ্রাণি, কীটপতঙ্গ ও গাছপালা পুড়ে গেছে।

চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান ও রাঙামাটির পাহাড়ি বনেও শুষ্ক মৌসুমে মাঝে মাঝে আগুন লাগে। অনেক ক্ষেত্রে জুমচাষ, শুকনো ঘাসে আগুন বা মানবসৃষ্ট কারণে এসব অগ্নিকাণ্ড সৃষ্টি হয়।

বাংলাদেশে বড় দাবানল না হওয়ার পেছনে বেশকিছু প্রাকৃতিক কারণ রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে, উচ্চ আর্দ্রতা ও বর্ষাকাল। এছাড়া ঘন বনাঞ্চলের পরিমাণ তুলনামূলক কম থাকা। ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের মতো দীর্ঘমেয়াদি খরা না থাকা। বনাঞ্চলের ভৌগোলিক কিছু বৈশিষ্ট্য যেমন, বড় আকারের শুষ্ক পাইন বা ইউক্যালিপটাস বন কম থাকা।

বাংলাদেশে দাবানলের ঝুঁকি কতটা

২০২৫ সালে সায়েন্স ডিরেক্টের এক গবেষণায় বলা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কার্বন নিঃসরণ পরিস্থিতি (আরসিপি ৮.৫) অব্যাহত থাকলে ২০৮০ সালের মধ্যে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ বনাঞ্চলের পরিমাণ প্রায় ১৫ দশমিক ৪ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। বাংলাদেশের আবহাওয়া সাধারণত আর্দ্র। বছরে প্রায় ২,০০০ মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টিপাত হয় এবং বর্ষাকাল দীর্ঘ হওয়ায় অধিকাংশ বনভূমি স্যাঁতসেঁতে থাকে। এ কারণেই বড় দাবানল হওয়ার সম্ভাবনা তুলনামূলক কম। তবে তাপমাত্রা, বৃষ্টিপাত, বাতাসের গতি ও ভূমির উচ্চতা এসবকে প্রধান ঝুঁকির কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

অনেক সময় দেখা যায়, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে শীত ও বসন্তে আবহাওয়া দীর্ঘ সময় শুষ্ক থাকে। ফলে আগুন লাগার ঝুঁকি থাকে। পার্বত্য চট্টগ্রামে দীর্ঘ খরা দেখা দিলে বনভূমিতে আগুনের ঝুঁকি বাড়তে পারে। সুন্দরবনে লবণাক্ততা বৃদ্ধি ও খরার কারণে কিছু এলাকায় গাছপালা দুর্বল হয়ে পড়ছে। পর্যটন বৃদ্ধ ও বনাঞ্চলে মানুষের প্রবেশ ভবিষ্যতে আগুন লাগার ঝুঁকি বাড়তে পারে। আইপিসিসির মূল্যায়ন অনুযায়ী, দক্ষিণ এশিয়ায় তাপপ্রবাহের তীব্রতা ও স্থায়িত্ব বাড়বে। ফলে বাংলাদেশের বনাঞ্চলেও আগুনের ঝুঁকি আগের তুলনায় কিছুটা বাড়তে পারে।

বন ও জলবায়ু বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের বনাঞ্চলে দাবানলের ঝুঁকি কমাতে হলে স্যাটেলাইট ও ড্রোনের মাধ্যমে আগুন দ্রুত শনাক্তের ব্যবস্থা জোরদার, পর্যটক ও স্থানীয় জনগণের সচেতনতা বৃদ্ধি, বন বিভাগকে আধুনিক অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম ও প্রশিক্ষণ প্রদান এবং জলবায়ু সহনশীল বন ব্যবস্থাপনা জোরদার করা প্রয়োজন।

তথ্যসূত্র: এপি, রয়টার্স, রয়টার্স, ইউএনবি ও সায়েন্স ডিরেক্ট