Image description

পাকিস্তানের দক্ষিণ-পশ্চিমে খনিজ সম্পদে ভরপুর একটি প্রদেশ বেলুচিস্তান। দীর্ঘ সাত দশক ধরে যা সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দু। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অসন্তোষ, জাতীয়তাবাদী আন্দোলন ও সশস্ত্র বিদ্রোহের সাক্ষী এই অঞ্চল। আর সেই বিদ্রোহের সবচেয়ে আলোচিত নাম বেলুচ লিবারেশন আর্মি (বিএলএ)। গতকাল শুক্রবার তাদের সমন্বিত হামলায় পাকিস্তানের নিরাপত্তা বাহিনীর ৪৫ সদস্য নিহত হয়েছে। শুধু এই হামলাই নয়, একের পর এক আক্রমণে নাস্তানাবুদ হয়ে পড়েছে নিরাপত্তা সংস্থাগুলো।

এক সময় পাহাড়ের আড়ালে লুকিয়ে থাকা ছোট্ট একটি স্বাধীনতাকামি সংগঠন। আজ তারা পাকিস্তানের সবচেয়ে সুসংগঠিত এবং সক্ষম একটি বিচ্ছিন্নতাবাদী সশস্ত্র দল। বিগত দুই দশকে শুধু হামলার সংখ্যা বাড়ায়নি তারা, বদলে ফেলেছে যুদ্ধের ধরণও। গেরিলা আক্রমণ থেকে আত্মঘাতী অভিযান, রেল ছিনতাই থেকে শহরে সমন্বিত হামলা সব দিক দিয়ে নিজেদের আরও বেশি সামনে নিয়ে আসছে বিএলএ। এর বিবর্তন দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের বাধ্য করেছে নতুন করে ভাবতে।

গেরিলা বৃত্ত ভেঙে বিএলএ এখন আধুনিক রণকৌশল, অত্যাধুনিক মারণাস্ত্র ও আত্মঘাতী ‘মজিদ ব্রিগেড’র এক ভয়ঙ্কর মেলবন্ধন। গোষ্ঠীটির আক্রমণ এখন আর সীমান্তের সেনা চৌকিতে সীমাবদ্ধ নেই; বরং খোদ পাকিস্তান রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব এবং সেখানে চীনের বিলিয়ন ডলারের অর্থনৈতিক সাম্রাজ্যের ভিত্তিমূলেই তারা আঘাত হানছে বারবার। গিরিখাতের অন্ধকার থেকে উঠে এসে ভেঙে চুরমার করে দিচ্ছে পারমাণবিক শক্তিধর পাকিস্তানের সামরিক অহংকার। প্রাকৃতিক ঐশ্বর্যের গরিমা স্বত্তেও চরম উপেক্ষিত ভূখন্ডের গর্ভে একদিন যে বিদ্রোহের অঙ্কুরোদ্গম হয়েছিল, তা আজ ডালপালা মেলে এক দানবীয় রূপ ধারণ করেছে- ‘স্বাধীন বেলুচিস্তান’ নামে ।

বেলুচিস্তানের স্বাধীনতার লড়াইয়ে জন্ম নেয় বিএলএ। ১৯৭০ এর দিকে সীমিত কার্যক্রম শুরু করে। তবে ১৯৯০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে আসলাম বেলুচের হাত ধরে আধুনিক পুণরুত্থান হয় বিএলএর। ২০০৬ সালে নিরাপত্তাবাহিনীর হাতে নওয়াব আকবর বুগতি নিহত হয়। এই ঘটনার ক্ষোভেই নতুন গতি পায় বিএলএ। আসলাম বেলুচের নেতৃত্বে সংগঠনটি উপজাতিভিত্তিক কাঠামো থেকে অপেক্ষাকৃত শিক্ষিত মধ্যবিত্ত তরুণদের দিকে ঝুঁকে পড়ে। তার মৃত্যুর পর নেতৃত্ব নেন বশির জেব বেলুচ। তার নেতৃত্বে বিএলএর অভিযান আরও সমন্বিত ও হাইপ্রোফাইল হয়ে ওঠে।

পরবর্তীতে বিতর্কিত সিদ্ধান্ত নেয় বিএলএ। দীর্ঘদিন আত্মঘাতী আন্দোলন থেকে দূরে থাকা সংগঠনটি চালু করে ‘মাজিদ ব্রিগেড’। আত্মঘাতী হামলাই হয়ে যায় নিয়মিত কৌশল। ২০২২ সালে করাচি বিশ্ববিদ্যালয়ের কনফুসিয়াস ইনস্টিটিউটে শারী বেলুচ নামের এক নারী আত্মঘাতী হামলা চালান। এতে নিহত হন তিন চীনা শিক্ষক। এ ঘটনা আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক আলোড়ন তোলে।

২০১৮ সালে করাচিতে চীনা কনস্যুলেটে হামলা ছিল আরেকটি বড় মোড়। এরপর ২০২০ সালে করাচি স্টক এক্সচেঞ্জ, ২০২৪ সালে করাচি বিমানবন্দরের কাছে চীনা প্রকৌশলীদের বহর এবং ২০২৫ সালে জাফর এক্সপ্রেস ট্রেন ছিনতাই। প্রতিটি হামলায় বিএলএ দেখিয়েছে, তারা আর শুধু বেলুচিস্তানের দুর্গম পাহাড়ে সীমাবদ্ধ নেই; পাকিস্তানের অর্থনীতি, অবকাঠামো এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারদেরও লক্ষ্যবস্তু করতে সক্ষম।

জাফর এক্সপ্রেস ছিনতাই সংগঠনটির সবচেয়ে আলোচিত অভিযান। ট্রেনের শত শত যাত্রীকে জিম্মি করে তারা। পরবর্তীতে নিরাপত্তাবাহিনীর দীর্ঘ অভিযানে এর অবসান ঘটে। তবে এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক স্পটলাইট নিজেদের দিকে আনতে সক্ষম হয় বিএলএ।

‘জাতীয় মুক্তি আন্দোলন’ হিসেবে নিজেদের তুলে ধরে বিএলএ। তাদের দাবি, বেলুচিস্তানের গ্যাস, স্বর্ণ, তামা ও অন্যান্য সম্পদ ‘লুট’ করা হচ্ছে। আসলাম বেলুচ একাধিকবার অভিযোগ করেছিলেন, ‘চীন ও পাকিস্তান বেলুচিস্তানের সম্পদ লুট করছে।’ তবে পাকিস্তান সরকার তাদের সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে তুলে ধরে। সরকারের দাবি, নিরীহ মানুষ, নিরাপত্তা বাহিনী এবং বিদেশি নাগরিকদের ওপর হামলা করে দেশের স্থিতিশীলতা নষ্ট করছে বিএলএ।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিএলএর কৌশল আরও সুসংগঠিত হয়েছে। উচ্চমানের ভিডিও, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ব্যবহার ও পেশাদার প্রচারণার মাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দিচ্ছে নিজেদের বার্তা। এ ছাড়া পর্দার আড়ালেই অবস্থান করা নেতা বশির জেব বেলুচ এখন প্রকাশ্য মুখ খোলা ভিডিওতে বার্তা দিচ্ছেন। যা তাদের মনস্তাত্বিক কৌশলের অংশ বলে ধারণা করা যায়।

বিশ্লেষকদের মতে,স্থানীয় ক্ষোভ, দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক অচলাবস্থা, সামাজিক মাধ্যমে প্রচারণা, সংগঠনের পুনর্গঠন এবং ছোট ছোট বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে সমন্বয় বিএলএর শক্তি বৃদ্ধির পেছনে কাজ করেছে। একই সঙ্গে পাকিস্তানের চালানো কঠোর নিরাপত্তা অভিযান এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগও সংঘাতকে আরও জটিল করেছে বলে বিভিন্ন পর্যবেক্ষক মনে করেন। তবে পাকিস্তান সরকার এসব অভিযোগের অনেকগুলো প্রত্যাখ্যান করেছে। তারা সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানকে দেশের নিরাপত্তার জন্য অপরিহার্য বলে বর্ণনা করে।

বেলুচিস্তানের ধুলিধূসর পাহাড়ে যে বিদ্রোহের জন্ম, তার প্রতিধ্বনি এখন পৌঁছেছে ইসলামাবাদ, বেইজিং এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতির করিডোর পর্যন্ত। সেই প্রতিধ্বনি কবে থামবে, আজও অনিশ্চিত তার উত্তর।