২০২৬ বিশ্বকাপের ফাইনাল ম্যাচ নিয়ে যখন ক্রীড়া বিষয়ক বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে ব্যাপক চুলচেরা বিশ্লেষণ চলছে, তখন একটি বিষয় অন্তত নিশ্চিত—বহু ভক্তের কাছে স্পেন ও আর্জেন্টিনার মধ্যকার এই ব্লকবাস্টার ম্যাচটি কেবল ফুটবলীয় শ্রেষ্ঠত্ব বা জাতীয় মর্যাদার লড়াইয়ের চেয়েও অনেক বেশি কিছু।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ভিডিও ও ট্রোলের মাধ্যমে হাজার হাজার দর্শক এটিকে গাজায় ইসরায়েলি গণহত্যার প্রতিবাদ ও ফিলিস্তিনের প্রতি সংহতি প্রকাশের ‘গণভোট’ হিসেবে দেখছেন। এক্স-এ এক ব্যবহারকারী এই ম্যাচকে সরাসরি ‘ফিলিস্তিন বনাম ইসরায়েলের’ দ্বন্দ্ব বলে আখ্যায়িত করেছেন।
ফাইনালের আগে মাঠের বাইরের উত্তেজনা বেড়ে চলেছে। আর্জেন্টিনার কট্টরপন্থি রাজনৈতিক সম্পর্কের কারণে অনেক ফিলিস্তিনপন্থী দর্শক বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের ইসরায়েলের সমর্থক হিসেবে দেখছেন। আর্জেন্টিনার কট্টর ডানপন্থী প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেই এর আগে নিজেকে ‘বিশ্বের সবচেয়ে বড় জায়নবাদী প্রেসিডেন্ট’ হিসেবে ঘোষণা করে গর্ব প্রকাশ করেছিলেন।
এমনকি গত সপ্তাহে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এক পডকাস্ট সাক্ষাৎকারে আর্জেন্টিনার প্রতি তার প্রকাশ্য সমর্থন জানান। নেতানিয়াহু বলেন, মিলেই ‘ইসরায়েলের এক পরম বন্ধু’। পাশাপাশি সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার জয়ের পর ইসরায়েলের একাধিক মন্ত্রী ও রাজনীতিবিদ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উল্লাস প্রকাশ করেন। ইসরায়েলের পরিবহণমন্ত্রী মিরি রেগেভ আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্টকে অভিনন্দন জানিয়ে বলেন, ফাইনালে আর্জেন্টিনার জন্য তার শুভকামনা থাকবে।
অন্যপক্ষে, স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজকে ইউরোপে ফিলিস্তিনের পক্ষে অন্যতম প্রধান সোচ্চার কণ্ঠস্বর হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তার সরকারের নেতৃত্বে ২০২৪ সালে স্পেন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয়, ইসরায়েলের ওপর অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা জারি করে এবং গাজায় স্থায়ী যুদ্ধবিরতির জোরালো দাবি জানিয়ে আসছে। অনেক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারী সানচেজের ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেওয়ার ভিডিও শেয়ার করে লিখেছেন, ‘বিশ্বকাপের ফাইনালে আমাদের পূর্ণ সমর্থন স্পেনের দিকেই থাকবে।’
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম টিকটকে এক ব্যবহারকারী এই জটিল রাজনৈতিক মেরুকরণ বিশ্লেষণ করে বলেন, ‘একদিকে আপনার কাছে এমন একটি দল (আর্জেন্টিনা) আছে, যাকে সরাসরি নেতানিয়াহু সমর্থন দিচ্ছেন। বিষয়টি দেখতে ভালো দেখায় না। অন্যদিকে আছে এমন একটি দল (স্পেন), যারা ইউরোপে গাজা গণহত্যার বিরুদ্ধে সবচেয়ে বেশি সোচ্চার। চার বছর আগে আমরা সবাই আর্জেন্টিনার সমর্থক ছিলাম, কিন্তু এখন অনেক খারাপ কিছু ঘটে গেছে, আর আমরা এখন আগের মতো অনুভব করছি না।’
একইভাবে এক এক্স ব্যবহারকারী লিখেছেন, ‘এই রোববারের (১৯ জুলাই) ফাইনালটি স্রেফ ফুটবলের চেয়েও অনেক বেশি কিছু। এটি আসলে ভালো আর মন্দের লড়াই। একদিকে রয়েছে ফিলিস্তিনের অন্যতম শক্তিশালী সমর্থক একটি দেশ, অন্যদিকে খোদ নিজের প্রেসিডেন্টের ভাষায় বিশ্বের সবচেয়ে বড় জায়নবাদী রাষ্ট্র।’
কিছু ভক্ত আবার বিষয়টি খেলোয়াড়দের ব্যক্তিগত অবস্থানের ওপরও বিচার করছেন। মে মাসে বার্সেলোনা এফসির লা লিগা চ্যাম্পিয়নশিপ প্যারেডে স্পেনের উদীয়মান ফুটবল তারকা লামিন ইয়ামাল ফিলিস্তিনের পতাকা ওড়াচ্ছিলেন। সেই ভাইরাল ভিডিওটি শেয়ার করে ভক্তরা তার প্রশংসা করছেন। বিপরীতে আর্জেন্টিনার কিংবদন্তি লিওনেল মেসি ফিলিস্তিন বা ইসরায়েল বিতর্ক নিয়ে খুব একটা মুখ খোলেননি। উপরন্তু, ইসরায়েলি একাধিক ব্র্যান্ডের সঙ্গে মেসির বাণিজ্যিক চুক্তির ইতিহাসও রয়েছে। ২০১৩ সালে বার্সেলোনার ‘পিস ট্যুর’ বা শান্তি সফরের সময় মেসির ওয়েস্টার্ন ওয়ালে প্রার্থনার ছবি এবং নেতানিয়াহুর সঙ্গে সাক্ষাতের ছবিগুলোও সামনে আনছেন ইসরায়েলপন্থীরা।
তবে ফিলিস্তিনপন্থীদের দাবি, ওই একই সফরে মেসি ফিলিস্তিনের পশ্চিম তীরে গিয়ে রাষ্ট্রপতি মাহমুদ আব্বাসের সঙ্গেও সাক্ষাৎ করেছিলেন। তাই দলগত সফরের দায় কেবল মেসির ওপর চাপানো ঠিক নয়।

বিশ্বকাপ জুড়ে ফিলিস্তিনের পতাকা বারবার পাদপ্রদীপে এসেছে। মিসরের জাতীয় দলের কোচ হোসাম হাসান ফিলিস্তিনের পতাকা নিয়ে মাঠে জয়ের উল্লাস করায় কিছু আর্জেন্টিনা সমর্থক তার উদ্দেশে ইসরায়েলের পতাকা নেড়েছিলেন।
অন্যদিকে, সেমিফাইনালে ফ্রান্সের বিপক্ষে স্পেনের ২-০ গোলের জয়ের সময় অস্কারজয়ী বিখ্যাত স্প্যানিশ অভিনেতা হাভিয়ের বারদেম গ্যালারিতে দাঁড়িয়ে এক ভক্তের কাছ থেকে ফিলিস্তিনের পতাকা গ্রহণ করেন। ফিলিস্তিনিদের উদ্দেশে কোনো বার্তা আছে কি না জানতে চাইলে বারদেম বুকে হাত রেখে বলেন, ‘টিকে থাকাই প্রতিরোধ।’ এছাড়া স্পেন ও পর্তুগালের মধ্যকার শেষ ১৬-এর ম্যাচের সময়ও আরেকটি ভিডিওতে তিনি ঘোষণা করেন, ‘স্পেন ফিলিস্তিনের পাশেই রয়েছে।’
ফিলিস্তিন ইস্যু ছাড়াও টুর্নামেন্ট জুড়ে ফিফার একচোখা বা পক্ষপাতিত্বমূলক আচরণের অভিযোগের কারণেও আর্জেন্টিনার প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন অনেকে।
তবে এই ক্ষোভের কারণে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কিছু আর্জেন্টাইন দর্শকও সরব হয়েছেন। তারা বোঝানোর চেষ্টা করছেন, তাদের প্রেসিডেন্টের উগ্র জায়নবাদী অবস্থান কোনোভাবেই সাধারণ আর্জেন্টাইনদের মনের প্রতিফলন নয়। অনেক আর্জেন্টাইন দর্শক উল্লেখ করেন, স্পেনের অনেক আগে ২০১০ সালেই তৎকালীন আর্জেন্টাইন প্রেসিডেন্ট ক্রিস্টিনা ফার্নান্দেজ ডি কির্চনার ফিলিস্তিনকে একটি ‘স্বাধীন ও মুক্ত রাষ্ট্র’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন।
২০১৮ সালে ইসরায়েলের সঙ্গে আর্জেন্টিনার একটি প্রীতি ম্যাচ বাতিল হওয়ার ঘটনাও মনে করিয়ে দিচ্ছেন অনেক ভক্ত, যেখানে গঞ্জালো হিগুয়াইন প্রীতি ম্যাচ বাতিল করার সিদ্ধান্তকে সম্পূর্ণ সঠিক বলে সমর্থন জানিয়েছিলেন। এছাড়া আর্জেন্টাইন ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সহ-সভাপতি উগো মোয়ানো সে সময় প্রকাশ্যে ইসরায়েলের আগ্রাসী আচরণের তীব্র নিন্দা জানিয়েছিলেন।
‘হিন্দ রজব ফাউন্ডেশন’-এর প্রেসিডেন্ট দিয়াব আবু জাহজাহ এই জটিল পরিস্থিতির ওপর একটি বিশ্লেষণমূলক মতামত প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, ‘খেলাধুলার সঙ্গে রাজনীতি সব সময় জড়িয়ে ছিল এবং থাকবে। তবে বাস্তবতা এর চেয়েও জটিল। আর্জেন্টিনা গ্লোবাল সাউথ বা বৈশ্বিক দক্ষিণের একটি দেশ, যার বিশাল জনসংখ্যা দরিদ্র এবং তারা নিজেরাও ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ (মালভিনাস) নিয়ে ব্রিটিশ উপনিবেশবাদের শিকার। তাছাড়া আর্জেন্টিনা আমাদের ডিয়েগো ম্যারাডোনাকে উপহার দিয়েছে, যিনি আজীবন ফিলিস্তিনের পক্ষে দাঁড়িয়েছেন।’
তিনি আরও যোগ করেন, ‘আর্জেন্টিনা কোনোভাবেই ইসরায়েল বা জায়নবাদী রাষ্ট্র নয়। আগামী রোববার আমি স্পেনের অভূতপূর্ব ফিলিস্তিন সংহতির প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে স্পেনকেই সমর্থন করব। তবে আমি কোনো উগ্র মতাদর্শী বা অন্ধ ভক্তের মতো ম্যাচে চোখ রাখব না। আর্জেন্টিনা যদি দুর্দান্ত খেলে জেতে, তবে জয়টা তাদেরই প্রাপ্য হবে।’
মিডল ইস্ট আই থেকে অনূদিত
লেখক: দালিয়া আনিস আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতি ও খেলাধুলা বিষয়ক একজন স্বাধীন সাংবাদিক ও বিশ্লেষক।