Image description

ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) নেতৃত্বে ভারতের দিল্লির যন্তর মন্তরে টানা ১৯ দিন ধরে অনশনে রয়েছেন দেশটির সমাজকর্মী ও শিক্ষাবিদ সোনম ওয়াংচুক। শারীরিক অবস্থা ক্রমশ দুর্বল হলেও তার স্বাস্থ্য নিয়ে দেশটির কেন্দ্রীয় সরকারের সক্রিয়তার অভাব নিয়ে প্রকাশ্যেই উদ্বেগ জানিয়েছে দিল্লি হাইকোর্ট। আজ বৃহস্পতিবার আদালত স্পষ্ট জানিয়েছে, কোনো নাগরিকের জীবনকে অবহেলা করা যায় না। সোনমের নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা এবং জীবন রক্ষায় প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা গ্রহণের দায়িত্ব সরকারেরই।

শিক্ষা ব্যবস্থা ও পরীক্ষায় অনিয়মের অভিযোগে ভারতের শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে তিনি এই আন্দোলনে নেমেছেন সিজেপির সঙ্গে।

সোনম ওয়াংচুকের অনশনকে ঘিরে আদালতের দ্বারস্থ হয়েছিলেন সমাজকর্মী রাকেশকুমার সাইনি। তার আশঙ্কা ছিল, দীর্ঘ অনশনের ফলে যদি কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে, তবে তা দেশের গণতান্ত্রিক ভাবমূর্তি ও মানবিক মূল্যবোধের ওপর বড় আঘাত হবে। সেই আবেদনের শুনানিতেই দিল্লি হাইকোর্ট কেন্দ্রকে কার্যত সতর্ক করে দেয়।

শুনানির সময় কেন্দ্রের পক্ষে সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা জানান, সোনমের স্বাস্থ্য পরীক্ষা হচ্ছে ঠিকই, তবে তা কখনো সরকারি চিকিৎসক, কখনো বেসরকারি চিকিৎসকদের মাধ্যমে করা হচ্ছে। এই বক্তব্যের পরই আদালত প্রশ্ন তোলে, একজন দীর্ঘমেয়াদি অনশনকারীর ক্ষেত্রে সরকারি পর্যায়ে নিরবচ্ছিন্ন স্বাস্থ্য নজরদারি কেন থাকবে না?

বিচারপতির পর্যবেক্ষণ, নিয়মিত সরকারি মেডিক্যাল রিপোর্ট থাকা জরুরি, যাতে প্রয়োজন হলে প্রশাসন দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারে। আদালতের এই মন্তব্যের মধ্যেই উঠে এসেছে আরও বড় প্রশ্ন। প্রায় তিন সপ্তাহ ধরে অনশন চললেও দৃশ্যমান কোনো উচ্চপর্যায়ের উদ্যোগ নেয়নি ভারতীয় সরকার। রাজনৈতিক মহলের মতে, পরিস্থিতি এতদূর গড়ানোর পর আদালতের হস্তক্ষেপই প্রমাণ করছে বিষয়টি নিয়ে সরকারের তৎপরতা যথেষ্ট ছিল না।

এদিকে বৃহস্পতিবার প্রকাশিত চিকিৎসা বুলেটিনে সোনম ওয়াংচুকের শারীরিক অবস্থার উদ্বেগজনক ছবি সামনে এসেছে। বর্তমানে তার ওজন নেমে এসেছে প্রায় ৫৭ কেজিতে। অনশন শুরুর পর থেকে প্রায় ৮.৯ কেজি ওজন কমেছে বলে জানানো হয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টাতেই কমেছে প্রায় ৪০০ গ্রাম। রক্তচাপ ১০৫/৭৬ মিমি এইচজি, রক্তে শর্করার মাত্রা ৮০ মিলিগ্রাম প্রতি ডেসিলিটার এবং অক্সিজেনের মাত্রা ৯৭ শতাংশ। চিকিৎসকদের মতে, তিনি এখনও সচেতন ও মানসিকভাবে স্থিতিশীল থাকলেও সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন।

সোনম ওয়াংচুকের অনশন এখন শুধু একটি ব্যক্তিগত প্রতিবাদের বিষয় নয়, বরং সরকারের জবাবদিহি ও মানবিক দায়িত্বের প্রশ্নও তুলে দিয়েছে। একজন নাগরিক যখন নিজের দাবিতে জীবন বাজি রেখে অনশনে বসেন, তখন তার সঙ্গে সরকার একমত হোক বা না হোক, তার নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্য সুরক্ষার দায়িত্ব এড়াতে পারে না রাষ্ট্র।

অন্যদিকে সোনম ওয়াংচুকের পাশে দাঁড়িয়ে ক্রমশ বিস্তৃত হচ্ছে সংহতির পরিধি। অনশন মঞ্চে গিয়ে তার সঙ্গে দেখা করেছেন অভিনেতা প্রকাশ রাজ, কৌতুকশিল্পী কুণাল কামরা, অভিনেত্রী স্বরা ভাস্কর, ভীম আর্মির প্রধান তথা সাংসদ চন্দ্রশেখর আজাদ, কেরলের প্রাক্তন অর্থমন্ত্রী ড. থমাস আইজ্যাক এবং ত্রিপুরা বিধানসভার বিরোধী দলনেতা জিতেন্দ্র চৌধুরী। অভিনেতা অতুল কুলকার্নি একদিনের প্রতীকী অনশনের ঘোষণা করেছেন। পাশাপাশি অনুরাগ কাশ্যপ, বির দাস, মুনাওয়ার ফারুকি, কাম্যা পাঞ্জাবি-সহ বহু পরিচিত ব্যক্তিত্বও আন্দোলনের প্রতি প্রকাশ্যে সমর্থন জানিয়েছেন। তাদের সবার বক্তব্য, সোনম ওয়াংচুকের সঙ্গে দ্রুত আলোচনায় বসে তার অনশন ভাঙানোর উদ্যোগ নেওয়া উচিত এবং সরকারের আর নীরব থাকা উচিত নয়।

এদিকে সোনম ওয়াংচুকের শারীরিক অবস্থার অবনতির মধ্যেও আন্দোলন থামাতে নারাজ ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)। সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে বারবার অভিযোগ করেছেন, দীর্ঘদিন ধরে অনশন চললেও কেন্দ্রীয় সরকারের কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি। আন্দোলনকে আরও বিস্তৃত করতে ১৬ জুলাই অর্থাৎ আজকে দেশজুড়ে একদিনের গণ-অনশনের ডাক দিয়েছে সিজেপি। একই সঙ্গে শিক্ষা ব্যবস্থা ও পরীক্ষায় অনিয়মের অভিযোগে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতেও তারা অনড় রয়েছে।