Image description

ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনির দাফনস্থল মাশহাদে যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালিয়েছে বলে দাবি করেছে ইসলামিক রেভ্যুলশনারি গার্ড করপস (আইআরজিসি)। হামলায় মাশহাদের পথে দুটি সেতু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানিয়েছে ইরানের অভিজাত বাহিনীটি। বৃহস্পতিবার এই শহরেই আয়াতুল্লাহ খামেনিকে দাফন করা হবে।

এদিকে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি ভেঙে দ্বিতীয় দিনেও হামলা অব্যাহত রাখায় পাল্টা হামলার শিকার হয়েছে প্রতিবেশী বাহরাইন, কুয়েত ও কাতারে মার্কিন ঘাঁটি।

বার্তা সংস্থা এপির খবরে বলা হয়, স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার ভোরে তেহরানে নতুন করে বিমান হামলা চালিয়েছে মার্কিন বাহিনী। হরমুজ প্রণালিতে জাহাজে ইরানি হামলার জেরে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ন্যাটো সম্মেলনে যোগ দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধবিরতি শেষ করার ঘোষণার কয়েক ঘণ্টা পর তেহরানে এই বিমান হামলা হয়।

এর আগে বুধবার ভোরে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে নতুন করে হামলা-পাল্টা হামলার শুরু হয়। ইরান ওমান উপকূলে কয়েকটি বাণিজ্যিক জাহাজ লক্ষ্য করার পর যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিভিন্ন সামরিক স্থাপনা ও বন্দর এলাকায় হামলা চালায়। তবে বৃহস্পতিবারের হামলা আগের তুলনায় আরও ব্যাপক আকারের ছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এসব মার্কিন হামলার জবাবে মধ্যপ্রাচ্যের প্রতিবেশী দেশগুলোতে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি লক্ষ্য করে হামলা অব্যাহত রেখেছে ইরান। বৃহস্পতিবার সকাল থেকে বাহরাইনে অন্তত দুইবার ক্ষেপণাস্ত্র ও বিমান হামলার সতর্ক সংকেত বাজানো হয়। দেশটিতে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর পঞ্চম নৌবহরের প্রধান কার্যালয় রয়েছে।

তবে বাহরাইন, কুয়েত ও কাতারে হামলায় তাৎক্ষণিকভাবে কোনো ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি। কুয়েতের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, তারা আকাশে আসা ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করতে সক্রিয়ভাবে কাজ করছে।

 

ইরানের ইসলামিক রেভ্যুলশনারি গার্ড করপসও বাহরাইন ও কুয়েতে হামলার তথ্য নিশ্চিত করেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর কেন্দ্রীয় কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, তারা ইরানের প্রায় ৯০টি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে। এ হামলার প্রমাণ হিসেবে তারা সাদা-কালো ভিডিও প্রকাশ করেছে, যেখানে বিমানবন্দরের রানওয়ে ও ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ স্থাপনায় হামলার দৃশ্য দেখা গেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কমান্ড বলেছে, ‘কমান্ডার ইন চিফের নির্দেশ অনুযায়ী ইরানে অভিযান পরিচালনার জন্য মার্কিন বাহিনী সতর্ক রয়েছে। যেকোনো প্রাণঘাতী সক্ষমতাসম্পন্ন হামলার জন্যও আমরা প্রস্তুত।’

যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচলের স্বাধীনতার ওপর ইরানের হুমকি মোকাবিলার সক্ষমতা আরও দুর্বল করাই এসব হামলার উদ্দেশ্য। যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের মোট বাণিজ্যিক তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের এক-পঞ্চমাংশ এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ দিয়ে পরিবহন করা হতো।

ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, দেশটির বিভিন্ন এলাকায় বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ইরানের পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র থাকা বুশেহরেও হামলা হয়েছে। এ ছাড়া দক্ষিণাঞ্চলের বন্দর শহর চাবাহার, কোনারাক, বান্দার আব্বাস ও সিরিকেও বিস্ফোরণের খবর পাওয়া গেছে।

ইরানি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, একটি বিমানবন্দরে হামলায় একজন ফায়ারকর্মী নিহত হয়েছেন।

গত এপ্রিলের শেষে যুদ্ধের তীব্রতা কমে আসার পর এবারই প্রথমবারের মতো যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় ইরানের মূল যোগাযোগ সেতুও লক্ষ্যবস্তু হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় গোলেস্তান প্রদেশে একটি রেলসেতুতে হামলা হয়েছে। তবে গোলেস্তান ও মাশহাদের পথে হামলা একই কিনা সে বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।

অন্যদিকে তুরস্কে অনুষ্ঠিত ন্যাটো সম্মেলন শেষে ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে ইরানে বিস্ফোরণের কয়েকটি ভিডিও প্রকাশ করেন এবং ইরানকে নতুন করে হুঁশিয়ারি দেন।

ট্রাম্প লেখেন, ‘এটি ইরানের গতকালের জাহাজ বোমা হামলার প্রতিশোধ। যদি আবার এমন ঘটে, তাহলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হবে।’

এর আগে বুধবার ট্রাম্প বলেছিলেন, সাম্প্রতিক পাল্টাপাল্টি হামলা দীর্ঘমেয়াদি সামরিক অভিযানে পরিণত হবে না। তিনি সে সময় বলেন, ‘যা কিছু ঘটবে, তা খুব দ্রুত ঘটবে।’ অবশ্য একই সঙ্গে তিনি ইঙ্গিত দেন, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী দ্রুতই তাদের কাজ শেষ করতে পারে।

হামলার পাশাপাশি ট্রাম্প আবারও ইরানের বেসামরিক অবকাঠামো, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও লবণাক্ত পানি বিশুদ্ধকরণ কেন্দ্রকে লক্ষ্য করার হুমকি দেন। পাশাপাশি ইরানের তেল রপ্তানির প্রধান কেন্দ্র খার্গ দ্বীপ দখলের হুমকিও পুনর্ব্যক্ত করেন।

গত মঙ্গলবার হরমুজ প্রণালিতে তিনটি তেলবাহী জাহাজে ইরানের হামলার পর যুক্তরাষ্ট্র পাল্টা হামলা চালায়। এর জবাবে ইরানি বাহিনী পারস্য উপসাগরে থাকা মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলো লক্ষ্য করে হামলা চালায়।

ইরান দাবি করেছে, অন্তর্বর্তী যুদ্ধবিরতি চুক্তি অনুযায়ী হরমুজ প্রণালির নৌ চলাচল নিয়ন্ত্রণের অধিকার তাদের রয়েছে। যুদ্ধের স্থায়ী সমাপ্তি নিয়ে আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনকারী ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ বৃহস্পতিবার সকালে এক বিবৃতিতে কঠোর প্রতিক্রিয়া জানান।

তিনি বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র এখনো শেখেনি যে ভয় দেখানো এবং প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের আর কোনো মূল্য দিতে হবে না- বিষয়টি এমন নয়। আমি স্পষ্ট করে বলছি, তোমরা হামলা করলে, আঘাতের জবাব পাবে।’

এর আগেও দুই পক্ষের বিভিন্ন পাল্টাপাল্টি হামলা ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতিকে হুমকির মুখে ফেলেছিল। কিন্তু ট্রাম্পের সবশেষ মন্তব্য নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। তার বক্তব্যের পর তেলের দামও বেড়ে যায়।

ন্যাটো সম্মেলনে ট্রাম্পকে যুদ্ধবিরতির অবস্থা সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘আমার কাছে মনে হয়, এটি শেষ হয়ে গেছে। আমি তাদের সঙ্গে আর কোনো আলোচনা করতে চাই না। তারা নোংরা মানুষ। তারা অসুস্থ মানুষ। তাদের নেতৃত্বও মানসিকভাবে অসুস্থ মানুষদের হাতে।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমার দৃষ্টিতে, তাদের সঙ্গে আলোচনা করা সময়ের অপচয় মাত্র। তারা মিথ্যাবাদী। আমরা একটি চুক্তি করি… সবাই একমত হয় যে কোনো পারমাণবিক অস্ত্র থাকবে না। কিন্তু চুক্তি করার পর তারা বাইরে গিয়ে সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলে এবং বলে, আমরা এ বিষয়ে কখনো আলোচনা করিনি।’

‘তাদের মধ্যে কিছু একটা সমস্যা আছে। তারা উন্মাদ আচরণ করছে। আমার বিবেচনায়, এটি শেষ হয়ে গেছে’, যোগ করেন ট্রাম্প।

ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী ও শীর্ষ আলোচক কাজেম গরিবাবাদি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এর জবাব দিয়ে বলেন, ‘ট্রাম্পের মন্তব্য শক্তির প্রকাশ নয় বরং ইরান বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নীতির ব্যর্থতার স্বীকারোক্তি।’