Image description

যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে ইসরায়েলপন্থী লবির প্রভাব নিয়ে আলোচনা নতুন নয়। কয়েক দশক ধরে ওয়াশিংটনের নীতিনির্ধারণ, কংগ্রেসের ভোটাভুটি এবং নির্বাচনি প্রচারে অন্যতম শক্তিশালী সংগঠন হিসেবে পরিচিত আমেরিকান ইসরায়েল পাবলিক অ্যাফেয়ার্স কমিটি অথবা আইপ্যাক। সম্প্রতি এক নজিরবিহীন রাজনৈতিক ধাক্কার মুখে পড়েছে সংস্থাটি। আর এই ধাক্কার কেন্দ্রে রয়েছেন নিউইয়র্ক সিটির তরুণ মেয়র জোহরান মামদানি। তিনি প্রকাশ্যেই আইপ্যাককে ‘দানব’আখ্যা দিয়ে সংগঠনটির বিরুদ্ধে সরাসরি রাজনৈতিক লড়াইয়ে নেমেছেন।

কী এই আইপ্যাক

১৯৫১ সালে প্রতিষ্ঠিত আইপ্যাক যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে প্রভাবশালী ইসরায়েলপন্থি লবি সংগঠনগুলোর একটি। সংগঠনটি সরাসরি কোনো প্রার্থীকে অনুদান দিত না। তবে ২০২১ সালে তারা রাজনৈতিক অ্যাকশন কমিটি (প্যাক) এবং সুপার প্যাক গঠন করে। এরপর থেকে নির্বাচনে বিপুল অর্থ ব্যয়ের মাধ্যমে প্রার্থীকে সমর্থন বা বিরোধিতা করা শুরু করে।

২০২২ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনী আইপ্যাক-সমর্থিত সুপার প্যাক শত শত মিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছে। বিশেষ করে ডেমোক্রেটিক পার্টির অভ্যন্তরীণ প্রাইমারি বা প্রাথমিক বাছাই নির্বাচনে ইসরায়েলের সমালোচক বা যুদ্ধবিরোধী প্রার্থীদের পরাজিত করতে তারা বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় করেছে।

কেন মামদানি আলোচনায়?

নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যের আইনপ্রণেতা জোহরান মামদানি ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রগতিশীল রাজনীতিক হিসেবে পরিচিত। তিনি গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের কঠোর সমালোচক। পাশাপাশি ইসরায়েলে যুক্তরাষ্ট্রের নিঃশর্ত সামরিক সহায়তার বিরোধিতা করে আসছেন।

মামদানি ‘বয়কট, ডিভেস্টমেন্ট অ্যান্ড স্যাংশনস’ আন্দোলনের প্রতি সহানুভূতিশীল অবস্থান নিয়েছেন। একারণে তিনি দীর্ঘদিন ধরে ইসরায়েলপন্থী সংগঠনগুলোর সমালোচনার মুখে রয়েছেন।

তাঁর বিরুদ্ধে আইপ্যাক-সমর্থিত বিভিন্ন সংগঠন বিপুল অর্থ ব্যয় করে প্রচার চালিয়েছে। মামদানি বারবার দাবি করেছেন, তিনি বড় করপোরেট দাতাদের নয়, সাধারণ মানুষের ছোট ছোট অনুদান এবং স্বেচ্ছাসেবকদের ওপর নির্ভর করেন।

যা ঘটেছে নিউইয়র্কের প্রাইমারিতে

গত ২৩ জুন যুক্তরাষ্ট্রের ডেমোক্র্যাটিক পার্টির প্রাইমারি নির্বাচনে নিউইয়র্ক সিটিতে যে ফলাফল এসেছে, তাকে অনেক বিশ্লেষক ‘রাজনৈতিক ভূমিকম্প’ বলে বর্ণনা করছেন। মামদানি সমর্থিত তিনজন প্রার্থী— ব্র্যাড ল্যান্ডার, ক্লেয়ার ভালদেজ এবং দারিয়ালিজা আভিলা শেভালিয়ার— কংগ্রেসের প্রাইমারিতে জয়ী হয়েছেন। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা ঘটেছে নিউইয়র্কের ১৩তম কংগ্রেসনাল ডিস্ট্রিক্টে। যেখানে পাঁচবারের কংগ্রেসম্যান ও কংগ্রেশনাল হিস্পানিক ককাসের চেয়ারম্যান আদ্রিয়ানো এসপাইয়াতকে ভোটে পরাজিত করেন শেভালিয়ার। একইভাবে ১০তম ডিস্ট্রিক্টে সাবেক কম্পট্রোলার ব্র্যাড ল্যান্ডার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ ভোট পেয়ে কংগ্রেসম্যান ড্যান গোল্ডম্যানকে পরাজিত করেন।

এই দুই পরাজিত প্রার্থীর সাথে আইপ্যাকের সরাসরি সংযোগ ছিল। গোল্ডম্যানকে সমর্থন দিয়েছিল আইপ্যাক ও অপেক্ষাকৃত উদারপন্থী ইসরায়েলপন্থী গোষ্ঠী জে স্ট্রিট। পরাজিত প্রার্থী এসপাইয়াতও দীর্ঘদিন ধরে আইপ্যাকের সমর্থন পেয়ে এসেছেন। বিপরীতে বিজয়ী শেভালিয়ার নির্বাচনী প্রচারে বারবার এসপাইয়াতকে আইপ্যাকের অর্থ নেওয়ার জন্য আক্রমণ করেছেন।

আইপ্যাককে ‘দানব’বলা যেভাবে বিতর্কের জন্ম দেয়

নির্বাচনের কিছুদিন আগে ব্রুকলিনে এক নির্বাচনী সমাবেশে সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্সের পাশে দাঁড়িয়ে মামদানি আইপ্যাক সম্পর্কে বলেন, সংগঠনটি লাখ লাখ ডলার ‘ডার্ক মানি’ দিয়ে একটিমাত্র লক্ষ্য অর্জন করতে চায়। আর তা হলো মানুষকে একে অপরের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দেওয়ার জন্য ক্ষমতা টিকিয়ে রাখা। তিনি ইতালীয় মার্কসবাদী দার্শনিক আন্তোনিও গ্রামসির একটি উদ্ধৃতি ব্যবহার করে বলেন, ‘পুরনো বিশ্ব মরে যাচ্ছে, নতুন বিশ্ব জন্ম নিতে সংগ্রাম করছে। এখন দানবদের সময়।’

এই মন্তব্যে ইহুদি নেতৃবৃন্দ তীব্র প্রতিক্রিয়া প্রদর্শন করে। তাদের কেউ কেউ এই বক্তব্যকে ‘বিশুদ্ধ উস্কানি’ বলে আখ্যা দেন। তারা সতর্ক করেন যে এটি সহিংসতাকে উস্কে দিতে পারে। কংগ্রেসম্যান জশ গটহাইমারও একই সুরে সমালোচনা করে বলেন, ‘আইপ্যাক’ শব্দের জায়গায় ‘ইহুদি’ বসিয়ে দিলে এটি পুরনো ইহুদিবিদ্বেষী ষড়যন্ত্র তত্ত্বেরই নতুন রূপ হয়ে দাঁড়ায়।

তবে মামদানি পিছু হটেননি। তিনি সিটি হলে সাংবাদিকদের বলেন, আইপ্যাক এমন একটি সংগঠন যা ফিলিস্তিন ও গোটা অঞ্চলে ‘অনৈতিকতার স্থিতাবস্থা’ টিকিয়ে রাখতে সহায়তা করেছে।

আইপ্যাকের প্রভাব সত্যিই কি কমছে

আইপ্যাক দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে অন্যতম শক্তিশালী লবি গোষ্ঠী হিসেবে পরিচিত। যা কংগ্রেসনাল প্রাইমারিতে কোটি কোটি ডলার ব্যয় করে ইসরায়েলপন্থি প্রার্থীদের সমর্থন দেয় এবং সমালোচকদের বিরুদ্ধে লড়ায়।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, আইপ্যাকের সুপার প্যাক এই বছরের কংগ্রেসনাল প্রাইমারিতে ইসরায়েলপন্থী প্রার্থীদের পক্ষে লাখ লাখ ডলার ব্যয় করেছে। কিন্তু নিউইয়র্কের ফলাফলে দেখা যাচ্ছে, ডেমোক্র্যাটিক পার্টির ভোটারদের মধ্যে বিশেষত তরুণ ও প্রগতিশীল অংশে এই প্রভাব প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে উঠছে।

এপ্রিলে ডেমোক্র্যাটিক ন্যাশনাল কমিটি আইপ্যাক ও ‘ডার্ক মানি’ গোষ্ঠীর প্রভাব সীমিত করার একটি প্রতীকী প্রস্তাব পাসে ব্যর্থ হয়। এই প্রস্তাবটি প্রমাণ করছে যে দলের মধ্যে ইসরায়েল প্রশ্নে কীভাবে ভোটারদের সঙ্গে কথা বলা হবে তা নিয়ে গভীর বিভক্তি ফুটিয়ে তোলে।

কংগ্রেসনাল প্রগ্রেসিভ ককাস পিএসির সহ-চেয়ার প্রমীলা জয়পাল বলেন, মামদানির সমর্থন ও তাঁর ভোটার সংগঠন প্রক্রিয়া সত্যিই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তারা আইপ্যাক সমর্থিত প্রার্থীর বিরুদ্ধে দাঁড়াতে প্রস্তুত।

তবে এই বিজয়কে সরাসরি ‘আইপ্যাকের পতন’ বলা অতি-সরলীকরণ হবে। বিশ্লেষকরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন যে নিউইয়র্ক সিটির এই আসনগুলো অত্যন্ত প্রগতিশীল ও ডেমোক্র্যাটিক অধ্যুষিত এলাকায়। সেখানে জাতীয়ভাবে রিপাবলিকান নিয়ন্ত্রিত বা প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আসনে আইপ্যাকের প্রভাব এখনো যথেষ্ট শক্তিশালী। তারপরও, বহাল থাকা হিস্পানিক ককাস চেয়ারম্যান ও একজন প্রভাবশালী কংগ্রেসম্যানের পরাজয় ওয়াশিংটনের প্রতিষ্ঠানবিরোধী রাজনীতিতে বার্তা দিয়েছে। কংগ্রেসের এক জ্যেষ্ঠ ডেমোক্র্যাট এই ফলাফলকে দলের নেতৃত্বের জন্য এক ‘বড় পরাজয়’ বলে অভিহিত করেন।

গাজা ও ইরান যুদ্ধ বিতর্ককে আরও তীব্র করেছে

এই রাজনৈতিক লড়াইয়ের পেছনে রয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক ভয়াবহ যুদ্ধ-পরিস্থিতি। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে বড় ধরনের সামরিক অভিযান শুরু করে। যাতে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা খামেনিসহ একাধিক শীর্ষ কর্মকর্তা নিহত হন। এরপর মাসের পর মাস ধরে চলা এই যুদ্ধে ইরান হরমুজ প্রণালি অবরুদ্ধ করে বৈশ্বিক তেল সরবরাহে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে। আর যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ফোর্দো, নাতাঞ্জ ও ইস্পাহানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালায়। জুনের মাঝামাঝি পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় একটি সমঝোতা স্মারক সই হলেও, সংঘাত পুরোপুরি থামেনি। জুনের শেষ সপ্তাহেও ইরানের ওপর নতুন মার্কিন হামলার খবর পাওয়া গেছে।

জাতিসংঘের শিশু তহবিল ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, অক্টোবরের যুদ্ধবিরতির পর থেকেও গাজায় প্রতিদিন গড়ে একজন করে শিশু নিহত হচ্ছে। এই বাস্তবতা মামদানির মতো রাজনীতিকদের জন্য আইপ্যাক সমালোচনার নৈতিক ভিত্তি তৈরি করেছে। মামদানি নিজে বলেছেন, তিনি যখন এই ‘স্থিতাবস্থা’র কথা বলেন, তখন তিনি সরাসরি গাজায় ইসরায়েলি সামরিক অভিযানের দিকেই ইঙ্গিত করেন।

সিনেটেও এর প্রতিফলন দেখা গেছে। ২৩ জুন মার্কিন সিনেট একটি যুদ্ধক্ষমতা প্রস্তাব পাস করে। প্রস্তাবটি ট্রাম্পের ইরানবিরোধী যুদ্ধ বন্ধের আহ্বান জানায়। ৫০-৪৮ ভোটে পাস হওয়া এই প্রস্তাবে চারজন রিপাবলিকান সিনেটরও ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে যোগ দেন। এটি ছিল ইরান যুদ্ধ নিয়ে কংগ্রেসের সবচেয়ে জোরালো প্রতীকী প্রতিবাদ।

সম্ভাব্য যা হতে পারে

মামদানি সমর্থিত তিন প্রার্থীই আগামী নভেম্বরের সাধারণ নির্বাচনে জয়ী হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। তাঁদের আসনগুলো ডেমোক্র্যাট ঘেঁষা। এর মানে কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাটিক সোশ্যালিস্টস অব আমেরিকা (ডিএসএ)-সংশ্লিষ্ট সদস্য প্রায় দ্বিগুণ হতে যাচ্ছে।

এইসব ঘটনা থেকে নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে যে, ইসরায়েল-ফিলিস্তিন প্রশ্ন এখন যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির মধ্যে এর প্রভাব পড়ছে বেশি। আইপ্যাক এখনো যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে প্রভাবশালী লবি গোষ্ঠীগুলোর একটি। কিন্তু নিউইয়র্কের এই নির্বাচন প্রমাণ করেছে যে তার অপ্রতিরোধ্যতার মিথ এখন আর নিরঙ্কুশ নয়। গাজা ও ইরান যুদ্ধের প্রভাব আমেরিকান জনমতকে ক্রমশ নতুনভাবে গড়ে তুলছে।