মৃত্যুর মিছিল, ধ্বংসস্তূপ আর স্বজনহারাদের আহাজারির মধ্যেও ভেনেজুয়েলায় জেগে উঠছে আশার আলো। ভয়াবহ দুই ভূমিকম্পের পর ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে কান্নারত এক নবজাতক ও ১১ বছর বয়সী দুই কিশোরকে জীবিত উদ্ধার করেছেন উদ্ধারকর্মীরা। এখন পর্যন্ত অন্তত ৩৩ জনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। হাজারো মানুষ এখনো নিখোঁজ থাকায় বহুজাতিক উদ্ধার অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
গত বুধবার উত্তর ভেনেজুয়েলায় ৭ দশমিক ২ ও ৭ দশমিক ৫ মাত্রার পরপর দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানে। এতে রাজধানী কারাকাস ও উপকূলীয় লা গুয়াইরা রাজ্যে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ ঘটে। এখন পর্যন্ত অন্তত ১ হাজার ৪৫০ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছে কর্তৃপক্ষ। ৭৭৪টির বেশি ভবন আংশিক বা পুরোপুরি ধসে পড়েছে এবং হাজারো মানুষ এখনো নিখোঁজ রয়েছেন।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত লা গুয়াইরায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে উদ্ধারকারী দল পৌঁছেছে। তবে প্রায় দুই হাজার বিদেশি উদ্ধারকর্মী পৌঁছানোর আগেই স্থানীয় বাসিন্দা ও স্বেচ্ছাসেবকেরা ভারী যন্ত্রপাতি ছাড়াই দিনের পর দিন ধ্বংসস্তূপে জীবিত ও মৃত মানুষের খোঁজ চালিয়েছেন। শত শত পরাঘাতের কারণে উদ্ধারকাজ আরও কঠিন হয়ে উঠেছে।
অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজের সরকার শুরুতে লা গুয়াইরায় ত্রাণ নিয়ে যাওয়া স্বেচ্ছাসেবকদের ধন্যবাদ জানালেও পরে জরুরি যান চলাচল নির্বিঘ্ন রাখতে ওই সড়কে কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে। সরকার জানিয়েছে, অতিরিক্ত যানজটের কারণে উদ্ধারকাজ ব্যাহত হচ্ছিল। যদিও সরকার নিখোঁজ মানুষের সংখ্যা কয়েক শ বলে জানিয়েছে, বিরোধী দলগুলোর পরিচালিত একটি ওয়েবসাইটে রবিবার পর্যন্ত প্রায় ৫০ হাজার মানুষকে নিখোঁজ হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে।
ধ্বংসস্তূপের মাঝেও সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা ছিল একটি নবজাতককে জীবিত উদ্ধারের মুহূর্ত। শনিবার মার্কিন উদ্ধারকারী দল ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে কম্বলে মোড়ানো কান্নারত শিশুটিকে উদ্ধার করে। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর এক্সে সেই ভিডিও প্রকাশ করে, যেখানে হেলমেট পরা উদ্ধারকর্মীদের শিশুটিকে নিরাপদে বের করে আনতে দেখা যায়।
একই সময়ে কলম্বিয়ার উদ্ধারকারী দল প্রায় ৩ মিটার গভীর ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে থাকা ১১ বছর বয়সী মোইসেসকে জীবিত উদ্ধার করে। স্ক্যানারের মাধ্যমে তার অবস্থান শনাক্ত করা হয়। উদ্ধারের সময় তার একটি হাত ভাঙা ছিল। দিনের আলোর তীব্রতা থেকে চোখ রক্ষা করতে কাপড় দিয়ে ঢেকে স্ট্রেচারে করে তাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। এই ভূমিকম্পে তার মা ও বোন মারা গেছেন।
অন্যদিকে মেক্সিকোর উদ্ধারকারী দল কারাবালেদা শহরের একটি ধসে পড়া ভবনের নিচ থেকে ১১ বছর বয়সী আরেক কিশোর রদ্রিগেজকে জীবিত উদ্ধার করে। শনিবার গভীর রাতে প্রকাশিত এক ভিডিওতে দেখা যায়, উদ্ধারকারীরা তাকে স্ট্রেচারে করে ধ্বংসস্তূপ থেকে বের করে আনছেন।
রবিবার সকালে যুক্তরাষ্ট্র ও ফ্রান্সের যৌথ উদ্ধারকারী দল ধ্বংসস্তূপ থেকে এক বাবা ও তার ছেলেকে জীবিত উদ্ধার করে। ধুলোয় ঢাকা ওই দুজনকে সতর্কতার সঙ্গে অ্যাম্বুলেন্সে তোলা হয়। ঘটনাস্থলে উপস্থিত মানুষেরা করতালির মাধ্যমে তাদের স্বাগত জানান। উদ্ধার হওয়ার পর তাদের শিরায় তরল দেওয়া শুরু হয়।
জাতিসংঘ জানিয়েছে, শনিবারের মধ্যে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে ২ হাজার ২০০-এর বেশি উদ্ধারকর্মী ভেনেজুয়েলায় পৌঁছেছেন। ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে থাকা স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারা জেসন মারকানো নামে এক স্বেচ্ছাসেবক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, 'এটি অবিশ্বাস্য রকমের কঠিন কাজ ছিল, কিন্তু আমরা শক্ত আছি। আমরা কখনো আশা হারাইনি।'
ধসে পড়া ভবনের পাশে এখনো অসংখ্য মানুষ প্রিয়জনের নাম ধরে ডাকছেন। কেউ যদি সাড়া দেন, সেই আশায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করছেন তারা। উপকূলীয় এলাকায় ধুলোর সঙ্গে মিশে গেছে পচনশীল মরদেহের গন্ধ। অনেকেই মাস্ক পরে ধ্বংসস্তূপের পাশে অবস্থান করছেন।
লা গুয়াইরার একটি হাসপাতালের পার্কিং এলাকায় উদ্ধারকারীরা সাদা ট্রাকে করে মরদেহ সরিয়ে নিচ্ছেন। কিছু মরদেহ ব্যাগে রাখা হলেও অনেকগুলো খোলা অবস্থায় শনাক্তের জন্য রাখা হয়েছে। প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা সরঞ্জাম না থাকায় অনেক স্বেচ্ছাসেবক মোটরসাইকেলের হেলমেট পরে ধ্বংসস্তূপে স্বজনদের খুঁজছেন।
সরকারি উদ্ধারকাজের ধীরগতিতে ক্ষুব্ধ হয়ে কিছু মানুষ একটি এক্সকাভেটরকে দুর্ঘটনাস্থল ছাড়তে বাধা দেন এবং চালককে কেবিন থেকে নামিয়ে দেন। এর আগে কিছু সরকারি কর্মীকে ধসে পড়া ভবনের সামনে ছবি তুলে সাহায্য না করেই চলে যেতে দেখা যায়।
রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে প্রচারিত এক ভিডিওতে ডেলসি রদ্রিগেজকে আন্তর্জাতিক উদ্ধারকারী দলগুলোর সঙ্গে বৈঠক করতে দেখা গেছে। তিনি জানান, ৩ হাজারের বেশি মানুষ আহত হয়েছেন এবং সমসংখ্যক মানুষ বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান করছেন।
কারাবালেদায় মার্কিন উদ্ধারকারীরা স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবকদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করেছেন। উদ্ধারকারীরা ধ্বংসস্তূপের ওপর ভবনের নাম লিখে চিহ্নিত করার পর সন্ধ্যার দিকে বিশেষ কোড এঁকে জানান দেন, সেখানে আর কোনো জীবিত মানুষ নেই।
মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস) আশঙ্কা করছে, এই দুই ভূমিকম্পে শেষ পর্যন্ত মৃতের সংখ্যা ১০ হাজার ছাড়িয়ে যেতে পারে। সেটি হলে এটি গত শতাব্দীর লাতিন আমেরিকার অন্যতম ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগে পরিণত হবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে থাকা মানুষদের জীবিত উদ্ধারের সময় দ্রুত শেষ হয়ে আসছে। সুইজারল্যান্ডের উদ্ধারকারী দলের নেতা সেবাস্তিয়ান ইুগস্টার রয়টার্সকে বলেন, 'সাধারণত ভূমিকম্পের পর প্রায় তিন দিন বা ৭২ ঘণ্টার একটি সময়সীমা থাকে, যার পর জীবিত মানুষ উদ্ধারের সম্ভাবনা অনেক কমে যায়।'
তিনি জানান, ৮০ সদস্যের সুইস দলটি তাদের আটটি প্রশিক্ষিত অনুসন্ধানী কুকুরের মাধ্যমে কয়েকজন জীবিত মানুষের অবস্থান শনাক্ত করলেও সময়মতো তাদের বের করে আনা সম্ভব হয়নি। শনিবার সন্ধ্যার মধ্যে ৭২ ঘণ্টা অতিক্রম করায় স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে কবে উদ্ধার অভিযান সমাপ্ত ঘোষণা করা হবে, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। তবে ত্রাণ কার্যক্রমে তারা কাজ চালিয়ে যাবেন।
আন্তর্জাতিক উদ্ধারকারী দলগুলোর আগমন অনেকের কাছেই নতুন আশার সঞ্চার করেছে। ইয়োনাহি রেগালাদো নামে এক নারী জানান, ভূমিকম্পের পরদিন রাত একটা থেকে তিনি তার বোন, এক বছর বয়সী ভাগনে ও ধর্মপুত্রের নাম ধরে ডাকতে থাকেন, যতক্ষণ না উদ্ধারকারীরা সেখানে পৌঁছান। তিনি বলেন, 'কে আপন আর কে পর, তা বড় কথা নয়। যদি কেউ বেঁচে থাকে, তবে আসুন আমরা সবাই মিলে তাকে বের করে আনি।'
ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে থাকা এক বৃদ্ধাকে সান্ত্বনা দেওয়ার একটি ভিডিওও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। ছাদ ভেঙে পড়ার ভয়ে আতঙ্কিত ওই নারীকে এক উদ্ধারকর্মী বলছিলেন, 'ছাদ ধসে পড়বে না। যদি পড়েও যায়, আমি এখানেই আপনার সাথে থাকব।'
এদিকে দুর্যোগ মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহায়তা বাড়ছে। রোমে অ্যাঞ্জেলাস প্রার্থনার সময় পোপ লিও বলেন, 'সাম্প্রতিক ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত ভেনিজুয়েলার ভাই ও বোনদের প্রতি আমি আমার গভীর সহানুভূতি প্রকাশ করতে চাই।' একই সঙ্গে তিনি উদ্ধারকর্মীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রনীতি প্রধান কাজা কালাস জানিয়েছেন, ইইউ ৫০ লাখ ইউরো জরুরি সহায়তা বরাদ্দ করেছে। পাশাপাশি ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ ও ত্রাণ কার্যক্রমে সহায়তার জন্য কোপার্নিকাস স্যাটেলাইট সিস্টেম ব্যবহার করা হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, আগে ঘোষিত ১৫০ মিলিয়ন ডলারের সহায়তার বাইরে আরও কয়েক শ মিলিয়ন ডলারের অতিরিক্ত তহবিল শিগগিরই ঘোষণা করা হতে পারে।
এই দুর্যোগ ডেলসি রদ্রিগেজ সরকারের জন্যও বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সরকার জানিয়েছে, লা গুয়াইরায় ১৪ হাজারের বেশি সেনা ও পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। নিরাপত্তার স্বার্থে এলাকায় সাধারণ মানুষের প্রবেশ সীমিত করা হয়েছে এবং বিশেষ অনুমতি ছাড়া সেখানে প্রবেশ করা যাচ্ছে না।