ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলার পর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দেয় ইরান। এতে প্রায় স্থবির হয়ে পড়ে বিশ্বজুড়ে মধ্যপ্রাচ্যের তেল সরবরাহ। তৈরি হয় জ্বালানি সংকটের আশঙ্কা। জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা ধারণা করেছিলেন, ইরান যুদ্ধে তৈরি হওয়া সংকটে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ২০০ ডলার পর্যন্ত উঠতে পারে। তবে বিশ্ববাজারে তেলের দাম আশঙ্কার মাত্রায় বাড়েনি। এর পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে যুদ্ধের টেবিলে সম্পূর্ণ অনুপস্থিত একটি দেশ—চীন।
বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অপরিশোধিত তেল আমদানিকারক দেশ চীন। ইরানে যুদ্ধ চলাকালে দেশটি এমন কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে, যার ফলে তেল সরবরাহে বড় ঘাটতি তৈরি হলেও সেই চাপ সরাসরি বৈশ্বিক বাজারে পড়েনি। তেলের কৌশলগত মজুতের ব্যবহার, আমদানি কমানো এবং বৈদ্যুতিক গাড়ির দ্রুত বিস্তারের মাধ্যমে বেইজিং বাজারে একধরনের ‘বাফার’ বা সুরক্ষা বলয় হিসেবে কাজ করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধের কারণে বিশ্ব-বাজারে দৈনিক ১ কোটি ১০ লাখ ব্যারেলের বেশি তেল সরবরাহ ব্যাহত হয়েছে। তবুও তেলের দাম নিয়ন্ত্রণের বাইরে যায়নি মূলত চীনের পূর্ব-প্রস্তুতির কারণে। জ্বালানি গবেষণা প্রতিষ্ঠান এমবারের বিশ্লেষক ডান ওয়াল্টারের ভাষায়, ‘চীন-এশিয়া ও বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য একটি ঢালের মতো কাজ করেছে।’
যুদ্ধ চলাকালীন গত মে মাসে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ১২০ ডলার পর্যন্ত উঠেছিল। তবে বর্তমানে আবারও তা ৮০ ডলারের নিচে নেমে এসেছে। সাম্প্রতিক ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের শান্তি সমঝোতা স্বাক্ষরের পর, হরমুজ প্রণালি আবার স্বাভাবিক হওয়ার প্রত্যাশাও বাজারে চাপ কমিয়েছে।
চীনের ‘অদৃশ্য হাত’
ফরাসি ব্যাংক সোসিয়েতে জেনারেলের বিশ্লেষকেরা এক গবেষণায় দেখিয়েছেন, ১৯৭৩ সালের আরব তেল অবরোধের সময় বৈশ্বিক তেল সরবরাহ মাত্র ৭ শতাংশ কমেছিল। কিন্তু তখন তেলের দাম বেড়েছিল ১৩৪ শতাংশ। অথচ বর্তমান সংঘাতে বৈশ্বিক সরবরাহের প্রায় ১৪ শতাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হলেও দাম সেই অনুপাতে বাড়েনি।
বিশ্লেষকদের মতে, এর বড় কারণ চীনের পদক্ষেপ। দেশটি প্রতিদিন প্রায় ৩০ লাখ ব্যারেল তেল আমদানি কমাতে সক্ষম হয়েছে। যা জাপানের মোট দৈনিক তেল চাহিদার প্রায় সমান।
চীনের এই সক্ষমতার পেছনে রয়েছে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ। যুদ্ধের আগে থেকেই রাশিয়া ও ইরান থেকে তুলনামূলক কম দামে তেল কিনে বিশাল মজুত গড়ে তুলেছিল চীন। বর্তমানে দেশটির বাণিজ্যিক ও কৌশলগত মজুতে ১০০ কোটি ব্যারেলের বেশি তেল রয়েছে বলে ধারণা করা হয়।
গত মে মাস থেকে সেই মজুত থেকে তেল ব্যবহার শুরু করেছে বেইজিং। ফলে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে অতিরিক্ত তেল কেনার প্রয়োজন কমেছে। এমবারের ডান ওয়াল্টারের মতে, ‘চীনের এই পদক্ষেপ শুধু নিজেদের বাজার নয়, পুরো বৈশ্বিক অর্থনীতিকেই বড় ধাক্কা থেকে রক্ষা করেছে।’
একই সঙ্গে চীন সরকার ডিজেল ও পেট্রলের মতো পরিশোধিত জ্বালানি রপ্তানিতে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছে। এতে দেশের অভ্যন্তরীণ সরবরাহ নিশ্চিত হয়েছে এবং চীনের তেল শোধনাগারগুলোর আন্তর্জাতিক বাজার থেকে অতিরিক্ত অপরিশোধিত তেল কেনার আগ্রহ কমেছে।
বৈদ্যুতিক গাড়ির প্রভাব
চীনের জ্বালানি কৌশলের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বৈদ্যুতিক গাড়ির দ্রুত বিস্তার। দেশটিতে নতুন বিক্রি হওয়া প্রতি দুইটি গাড়ির মধ্যে একটি এখন ‘নিউ এনার্জি ভেহিকল’ বা বৈদ্যুতিকচালিত গাড়ি। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) হিসাব অনুযায়ী, শুধু বৈদ্যুতিক গাড়ির কারণেই গত বছর চীনের তেলের ব্যবহার দৈনিক প্রায় ১০ লাখ ব্যারেল কমেছে।
চীনের এই পরিবর্তন বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলছে। কারণ দেশটি বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অপরিশোধিত তেল আমদানিকারক হলেও, নিজেদের জ্বালানি ব্যবহারের ধরন দ্রুত বদলে ফেলছে।
তেল কি এবার উদ্বৃত্ত থাকবে
কয়েক মাস আগেও বিশ্ববাজারে সবচেয়ে বড় উদ্বেগ ছিল জ্বালানি তেলের ঘাটতি। কিন্তু এখন পরিস্থিতি উল্টো দিকে যাচ্ছে। হরমুজ প্রণালিতে পুরোদমে জাহাজ চলাচল শুরু হলে আগামী বছর বাজারে তেল উদ্বৃত্ত থাকতে পারে বলে সতর্ক করেছে আইইএ।
সংস্থাটির পূর্বাভাস অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যের তেল উৎপাদন স্বাভাবিক হলে আগামী বছর বিশ্ববাজারে বিপুল পরিমাণ তেল উদ্বৃত্ত থাকতে পারে। সে ক্ষেত্রে চাহিদার তুলনায় দৈনিক প্রায় ৫০ লাখ ব্যারেল তেল বেশি সরবরাহ হওয়ার সম্ভাবনার কথা জানিয়েছে আইইএ।
বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি চালু হলে বর্তমানে আটকে থাকা বিপুল পরিমাণ তেল বাজারে ফিরে আসবে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা শিথিল হলে ইরানও দ্রুত নিজেদের তেলের উৎপাদন বাড়াতে পারে। ফলে নতুন প্রশ্ন তৈরি হয়েছে, এই অতিরিক্ত তেল কিনবে কে?
অনেক দেশের গ্রীষ্মকালীন তেলের চাহিদা ইতিমধ্যে পূরণ হয়েছে। তাই বাজারের ভারসাম্য ধরে রাখতে আবারও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে চীন। তবে পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে বেইজিং কতটা তেল কিনবে, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তা।
চীনের সীমাবদ্ধতা
তবে বিশ্লেষকেরা বলছেন, অনন্তকাল ধরে চীন এই ভূমিকা পালন করতে পারবে না। কৌশলগত মজুত ব্যবহার সাময়িক সমাধান, স্থায়ী নয়। চীনের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের বিশেষজ্ঞ ডেভিড ফিশম্যান মতে, তেলের দাম কমে গেলে চীন আবার মজুত বাড়াতে শুরু করতে পারে। এতে বাজারে নতুন করে চাহিদা তৈরি হবে।
অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা থেকে বেরিয়ে এলে চীনের কাছে ইরানি তেলের আকর্ষণ কমে যেতে পারে। কারণ এত দিন নিষেধাজ্ঞার কারণে তুলনামূলক কম দামে ইরানি তেল কিনতে পেরেছে বেইজিং। একই সঙ্গে বৈদ্যুতিক গাড়ির প্রসার ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ায় দীর্ঘমেয়াদে দেশটির জ্বালানি চাহিদার ধরনও বদলে যাচ্ছে।
নতুন বাস্তবতা
ইরান যুদ্ধের আগে বৈশ্বিক তেলবাজারের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ ছিল সরবরাহ সংকট। কয়েক মাসের ব্যবধানে সেই চিত্র বদলে গিয়ে এখন সামনে এসেছে সম্ভাব্য উদ্বৃত্ত সরবরাহের আশঙ্কা। এই পরিবর্তনের পেছনে চীনের কৌশলগত প্রস্তুতি, বিশাল তেল মজুত এবং জ্বালানি ব্যবহারের পরিবর্তন বড় ভূমিকা রেখেছে।
তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের আলোচনার ফলাফল তেলের বাজারে তাৎক্ষণিক প্রভাব ফেললেও দীর্ঘমেয়াদে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে থাকছে, চীনের সিদ্ধান্ত।
বেইজিং যদি নতুন করে তেলের মজুত বাড়ায়, তবে বাজারে চাহিদা তৈরি হবে। আর যদি আমদানি কমিয়ে দেয়, তাহলে অতিরিক্ত সরবরাহের কারণে দাম আরও কমার চাপ তৈরি হতে পারে।
সূত্র : সিএনএন বিজনেস