প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে চলা তীব্র বিক্ষোভ ও সহিংসতার পাকিস্তান-শাসিত আজাদ কাশ্মীরে এখন পর্যন্ত অন্তত ২৪ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। বর্তমানে প্রদেশজুড়ে ধর্মঘট চলছে। ফলে সেখানকার স্বাভাবিক জীবনযাত্রা পুরোপুরি স্থবির হয়ে পড়েছে। বছরের পর বছর ধরে চলা আন্দোলনের মধ্যে এটিই সবচেয়ে মারাত্মক রূপ নিয়েছে।
বছরের পর বছর ধরে চলা আন্দোলনের মধ্যে এটিই সবচেয়ে মারাত্মক রূপ নিয়েছে। গত ৬ জুন থেকে ১৪ জুনের মধ্যবর্তী সময়েই অন্তত ২০ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত ও কয়েক ডজন মানুষ আহত হয়েছেন। অন্যদিকে, বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে সংঘর্ষে চারজন পুলিশ কর্মকর্তা নিহত, ৯৭ জন আহত এবং ৫১৫ জনকে আটক করা হয়েছে।
সম্প্রতি নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন জয়েন্ট আওয়ামী অ্যাকশন কমিটির (জেএএসি) হাজার হাজার সমর্থক এখন আঞ্চলিক রাজধানী মুজাফফারাবাদের কাছে রাওয়ালকোটে অবস্থান নিয়ে এই ধর্মঘট পরিচালনা করছে। তাদের মূল ক্ষোভের অন্যতম কারণ হলো উদ্বাস্তু আসনগুলো, যেখানে কাশ্মীরের বাইরের প্রার্থীরা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে অন্যায্য প্রভাব খাটায়।
মূলত অঞ্চলটির ৪৫ আসনের আইনসভার ২৭ জুলাইয়ের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এই অস্থিরতার সূত্রপাত। নির্বাচনে শরণার্থীদের জন্য ১২টি আসন সংরক্ষণ করার প্রতিবাদে ৯ জুন ধর্মঘটের ডাক দেয় জেএএসি। তবে বিক্ষোভ তার আগেই শুরু হয়ে যায়।
এই শরণার্থীরা মূলত ভারত-শাসিত কাশ্মীর থেকে বাস্তুচ্যুত হয়ে পাকিস্তানের বিভিন্ন এলাকায় বসবাস করছেন। জেএএসির মতে, এই ব্যবস্থার কারণে কাশ্মীরের বাইরে থাকা ব্যক্তিরা স্থানীয় রাজনীতিতে অন্যায্য ও অসামঞ্জস্যপূর্ণ প্রভাব খাটানোর সুযোগ পাচ্ছেন।
এই বিক্ষোভ দমাতে সরকার প্রধান সড়কগুলো বন্ধ করে দিয়েছে, ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেছে এবং গণমাধ্যমের প্রবেশাধিকার সীমিত করেছে। তবে এই উত্তপ্ত পরিস্থিতির মাঝেই স্কুল বাসে হামলায় পাঁচজন নিহত হওয়ার ঘটনায় ভারতকে দায়ী করেছেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ।
সরকারের এই কড়া পদক্ষেপের কারণে আঞ্চলিক অর্থনীতি ও জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। ইন্টারনেট ও স্যাটেলাইট পরিষেবা বন্ধ থাকায় ব্যাংক ও এটিএম বুথগুলো কাজ করছে না, এবং সরকারি আদেশে পেট্রোল পাম্পগুলোও বন্ধ রয়েছে।
মুজাফফারাবাদের যে এলাকাগুলো সাধারণত মুদি দোকান ও খাবারের স্টলে ভরপুর থাকে, সেগুলো এখন নিস্তব্ধ। যদিও ওষুধের দোকান ও কিছু ফলের দোকান সীমিত সময়ের জন্য খুলছে, কিন্তু অন্যান্য ব্যবসা প্রতিষ্ঠান সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে। ফলে তীব্র সংকটে পড়েছেন সাধারণ দিনমজুরেরা।
মোটরসাইকেলে রাইড শেয়ার করা আসিফ নাজের বলেন, ‘যাদের সামর্থ্য আছে তারা হয়তো টিকে থাকতে পারবে, কিন্তু আমাদের মতো সাধারণ শ্রমিকদের জন্য এটা আত্মহত্যা।’
এই সংঘাত ইসলামাবাদের জন্য একটি বড় কূটনৈতিক ও অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। পাকিস্তান সাধারণত ভারত-শাসিত কাশ্মীরে দিল্লির ভূমিকার তীব্র সমালোচনা করে থাকে। কিন্তু এখন তারা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে থাকা ভূখণ্ডেই তীব্র রোষের মুখে পড়েছে।
১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ শাসন থেকে স্বাধীনতার পর থেকেই হিমালয় অঞ্চলের এই কাশ্মীর ভূখণ্ড নিয়ে পাকিস্তান ও ভারতের মধ্যে বিরোধ চলমান। এ নিয়ে দেশ দুটি এর আগে দুটি যুদ্ধেও জড়িয়ে পড়েছিল।
সূত্র: রয়টার্স, স্কাই নিউজ, গালফ টুডে