Image description

২০২৬ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত বিশ্বব্যাপী জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা ১১৭ দশমিক ৮ মিলিয়ন, যার মধ্যে প্রায় ৫০ দশমিক ৬ মিলিয়ন শরণার্থী।  জোরপূর্বক বাস্তচ্যুতদের মধ্যে ৬৮ দশমিক ৭ মিলিয়ন অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত ব্যক্তি—যারা  নিপীড়ন, সংঘাত এবং যুদ্ধের কারণে বাস্তচ্যুত হয়েছে।  ইউএনএইচসিআর গ্লোবাল ট্রেন্ডস রিপোর্টের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুসারে, বিশ্বের ৭০ শতাংশেরও বেশি শরণার্থীর উদ্ভব হয়েছে মাত্র ছয়টি দেশের সংঘাত থেকে।

এই ছয়টি দেশ  হচ্ছে—আফগানিস্তান, সিরিয়া, ইউক্রেন, সুদান, দক্ষিণ সুদান ও ভেনেজুয়েলা। বাকি শরণার্থীদের পরিসংখ্যান দিন দিন বাড়ছে চলমান বিভিন্ন সংঘাত এবং যুদ্ধের কারণে।

এমন পরিস্থিতির মধ্যে আজ ২০ জুন (শনিবার) পালিত হচ্ছে বিশ্ব শরণার্থী দিবস। ৭৫ বছর আগে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে, বিশ্ব প্রত্যেক মানুষের কল্যাণে একটি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল—পালিয়ে যেতে বাধ্য হওয়া লোকদের নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধান এবং বসবাসের অধিকার রয়েছে। কিন্তু নিরাপত্তা মানে শুধু সহিংসতার অনুপস্থিতি নয়। এর অর্থ আইনি সুরক্ষা, আশ্রয়, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, কাজের অধিকার এবং পুনর্গঠন এবং মর্যাদার সঙ্গে বসবাসের সুযোগ। এই বছরের মূল প্রতিপাদ্য হচ্ছে ‘যতক্ষণ না সবাই নিরাপদ থাকে’। এই বার্তা জোর দেয় যে সুরক্ষা খোঁজার অধিকার একটি মৌলিক মানবাধিকার এবং একটি অভিন্ন সামাজিক বাধ্যবাধকতা।

বিশ্ব শরণার্থী দিবস প্রতি বছর ২০ জুন পালিত হয় এবং এটি বিশ্বজুড়ে শরণার্থীদের জন্য উৎসর্গীকৃত। শরণার্থীদের অবস্থা সম্পর্কিত ১৯৫১ সালের কনভেনশনের ৫০তম বার্ষিকী স্মরণে ২০০১ সালের ২০ জুন প্রথমবারের মতো বিশ্বব্যাপী বিশ্ব শরণার্থী দিবস অনুষ্ঠিত হয়েছিল। ২০০০ সালের ডিসেম্বরে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ আনুষ্ঠানিকভাবে এটিকে আন্তর্জাতিক দিবস হিসেবে মনোনীত করার আগে এটি মূলত ‘আফ্রিকা শরণার্থী দিবস’ হিসেবে পরিচিত ছিল।

বিশ্ব শরণার্থী দিবস জাতিসংঘ কর্তৃক বিশ্বজুড়ে শরণার্থীদের সম্মান জানানোর জন্য নির্ধারিত একটি আন্তর্জাতিক দিবস। এটি প্রতি বছর সংঘাত বা নিপীড়ন থেকে বাঁচতে তাদের নিজের দেশ ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হওয়া লোকদের শক্তি এবং সাহসকে সম্মান জানায়।

এক-তৃতীয়াংশ শরণার্থী পাঁচ দেশের

জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থার (ইউএনএইচসিআর) তথ্য অনুযায়ী ৫টি দেশ থেকে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ শরণার্থী এখন বিশ্বজুড়ে। এর মধ্যে ভেনেজুয়েলার ৬ দশমিক ৫ মিলিয়ন, ইউক্রেনের ৫ দশমিক ২ মিলিয়ন, সিরিয়ার ৪ দশমিক ৯ মিলিয়ন, আফগানিস্তানের ৩ দশমিক ৭ মিলিয়ন এবং সুদানের ২ দশমিক ৮ মিলিয়ন।

৩২ শতাংশ শরণার্থীর আশ্রয়স্থল পাঁচটি দেশে

কলম্বিয়া, জার্মানি, তুরস্ক, উগান্ডা এবং ইরান বিশ্বের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ শরণার্থী এবং আন্তর্জাতিক সুরক্ষার প্রয়োজনে অন্যান্য লোককে আশ্রয় দিয়েছে। এর মধ্যে কলোম্বিয়া ২ দশমিক ৮ মিলিয়ন, জার্মানি ২ দশমিক ৭ মিলিয়ন, তুরস্ক ২ দশমিক ৪ মিলিয়ন, উগান্ডায় ১ দশমিক ৯ মিলিয়ন এবং ইরানে ১ দশমিক ৭ মিলিয়ন শরণার্থী আশ্রয় নিয়েছেন।

নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলো বিশ্বের ৬৮ শতাংশ শরণার্থী এবং আন্তর্জাতিক সুরক্ষার প্রয়োজন এমন অন্যান্য লোককে আশ্রয় দিয়েছে। স্বল্পোন্নত দেশগুলো মোট ২৬ শতাংশকে আশ্রয় দিয়েছে। এর মধ্যে ৬৫ শতাংশ শরণার্থী এবং আন্তর্জাতিক সুরক্ষার প্রয়োজনে অন্যান্য লোক তাদের জন্মভূমির প্রতিবেশী দেশগুলোতে বসবাস করছে। যার মধ্যে মিয়ানমার থেকে বাস্ত্যুচ্যুত হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীও আছে।

ছয় দেশের সংঘাত থেকে ৭০ ভাগেরও বেশি শরণার্থীর জন্ম

২০২৫ সালের শেষের দিকে ১০০টি দেশে বসবাসকারী প্রায় ৪ দশমিক ৫ মিলিয়ন রাষ্ট্রহীন ব্যক্তির তথ্য নথিভুক্ত করা হয়েছে। তবে প্রকৃত বৈশ্বিক পরিসংখ্যান উল্লেখযোগ্যভাবে আরও বেশি বলে অনুমান করা হয়। পরিসংখ্যান বলছে, ২০০০ সাল থেকে শরণার্থী সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে।

সিরিয়ার গৃহযুদ্ধের কারণে বিশ্বব্যাপী ৬ মিলিয়নেরও বেশি সিরিয়ান শরণার্থী তৈরি হয়েছে। এটি সাম্প্রতিক ইতিহাসের বৃহত্তম বাস্তুচ্যুত সংকটগুলোর মধ্যে একটি। তথ্য বলছে, প্রতি ৪ জনের মধ্যে ১ জন সিরিয়ানকে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছে।

ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের কারণে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ৬ মিলিয়নেরও বেশি শরণার্থী ইউক্রেন থেকে পালিয়ে গেছে। এটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপের দ্রুততম ক্রমবর্ধমান বাস্তুচ্যুত সংকটের সূত্রপাত করেছিল।

অন্যান্য সংঘাতের মধ্যে মিয়ানমারে কয়েক দশকের অস্থিরতা কারণে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা। এছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ লাখ লাখ মানুষকে বাস্তুচ্যুত করেছে, লেবাননে ১০ লাখেরও বেশি অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত হয়েছে এবং ইরান এবং গাজা উপত্যকার অভ্যন্তরে উল্লেখযোগ্য বাস্তুচ্যুত হয়েছে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের সংঘাতের ফলে ৩২ লাখ ইরানি অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। লাখ লাখ মানুষ অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত হলেও আন্তর্জাতিক শরণার্থীর সংখ্যা তুলনামূলকভাবে নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

ইউএনএইচসিআর হাইকমিশনার বারহাম সালিহ বলেন, ‘‘পঁচাত্তর বছর আগে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ছাই থেকে, বিশ্ব একটি মৌলিক প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল: যুদ্ধ, সংঘাত বা নিপীড়ন থেকে পালিয়ে যেতে বাধ্য হওয়া  যেকোনও ব্যক্তির সুরক্ষা এবং সুরক্ষা পাওয়ার অধিকার রয়েছে। সেই প্রতিজ্ঞা ছিল সর্বজনীন এবং স্থায়ী হওয়ার জন্য ডিজাইন করা হয়েছিল। এটি আমাদের দাদা-দাদি, আমাদের জন্য এবং আগামী প্রজন্মের জন্য নির্মিত হয়েছিল।

তিনি বলেন, ‘‘আজ সেই সুরক্ষা কবচ প্রচণ্ড চাপের মধ্যে রয়েছে। কিন্তু মানবাধিকার নিয়ে সমঝোতা করা যায় না। নিরাপত্তা কোনও বিশেষ অধিকার হওয়া উচিত নয়। আমাদের মধ্যে সবচেয়ে দুর্বলরা নিরাপদ না হওয়া পর্যন্ত কেউই সত্যিকারের নিরাপদ নয়। তরুণরা প্রতিদিনই বিশ্বকে এ কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।’’

ইউএনএইচসিআরের শুভেচ্ছা দূত এবং পাইলট হওয়া প্রথম সিরীয় নারী শরণার্থী মায়া গাজল বলেন, ‘‘কেউই তাদের পছন্দের সবকিছু পিছনে ফেলে যেতে পছন্দ করে না। এটি একটি হৃদয়বিদারক বাস্তবতা, যা যে কারও সাথে, যেকোনও মুহূর্তে ঘটতে পারে। নিরাপত্তা খোঁজার অধিকার মানবতার একটি পবিত্র প্রতিশ্রুতি এবং যতক্ষণ না সবাই নিরাপদ থাকে, ততক্ষণ আমাদের অবশ্যই একসাথে দাঁড়াতে হবে।’’

তিনি আরও বলেন, ‘‘একজন শরণার্থী হিসেবে আমি জানি যে আশ্রয় আশার একটি জীবনরেখা  এবং এটি আজকের তরুণদের সুন্দর, তীব্র সহানুভূতি, যা আমাকে বিশ্বাস দেয়, এই জীবনরেখা স্থায়ী হবে। আমরা বুঝতে পারি, আমরা সবাই সংযুক্ত এবং সবাই নিরাপদ না হওয়া পর্যন্ত আমরা কথা বলা বন্ধ করবো না।’’

ইউএনএইচসিআর বিশ্বব্যাপী তরুণ, উদ্ভাবক এবং কমিউনিটি নেতাদের তাদের কণ্ঠস্বর বাড়াতে এবং সবার জন্য নিরাপদের প্রতিশ্রুতি রক্ষায় সহায়তা করার আহ্বান জানিয়েছে,  যতক্ষণ না সবাই নিরাপদ থাকে।