Image description

বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার ঘুমধুম, তুমব্রু ও ফুলতলী পর্যন্ত বিস্তৃত ২৮ কিলোমিটার সীমান্ত করিডোর এখন ‘মৃত্যুফাঁদে’ পরিণত হয়েছে। সীমান্তের ওপারে চলমান সংঘাতের প্রভাবে এই এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে স্থলমাইনের ভয়াবহ ঝুঁকি। গত দেড় বছরে এই করিডোরে মাইন বিস্ফোরণে অন্তত ৩৫ বাংলাদেশি হতাহত হন। নিহত ও আহতদের মধ্যে রয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দা, রোহিঙ্গা, জেলে, কৃষিশ্রমিক এবং সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবির সদস্যরাও।

সবশেষ গত ৯ জুন নাইক্ষ্যংছড়ির ঘুমধুম অংশে স্থলমাইন বিস্ফোরণে আব্দুল খালেক নামে এক যুবক নিহত হন। এর আগে গত ২৪ মে একই উপজেলার ভালুকিয়া এলাকায় মাইন বিস্ফোরণে তিনজন নিহত হন। ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত ফুলতলী, লেম্বুছড়ি, জামগছড়ি, তুমব্রু ও ঘুমধুম এলাকায় একের পর এক মাইন বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এর মূল কারণ মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে চলমান সশস্ত্র সংঘাত।

জানা গেছে, ২০২৪ সালের শুরু থেকে সীমান্তের ওপারে মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মির মধ্যে তীব্র লড়াই চলছে। সংঘাতের এক পর্যায়ে আরাকান আর্মি সীমান্তসংলগ্ন বিস্তীর্ণ এলাকার নিয়ন্ত্রণ নেয়।

নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও সাবেক সামরিক কর্মকর্তা এমদাদুল ইসলাম বলেন, সীমান্তের ওপারে যেসব এলাকায় সংঘর্ষ হয়েছে, সেখানে উভয়পক্ষই নিজেদের প্রতিরক্ষামূলক অবস্থান শক্তিশালী করতে মাইন ব্যবহার করেছে। সংঘাত পুরোপুরি শেষ না হওয়া পর্যন্ত এসব মাইন অপসারণের সম্ভাবনাও কম।

তিনি বলেন, একবার মাইন পুঁতে রাখা হলে তা বছরের পর বছর সক্রিয় থাকতে পারে। ফলে যুদ্ধক্ষেত্রের প্রভাব শেষ হওয়ার পরও সীমান্তবর্তী সাধারণ মানুষের ওপর এর ভয়াবহ প্রভাব দীর্ঘদিন ধরে থেকে যায়।

দেড় বছরে অন্তত ৩৫ জন হতাহত

প্রশাসনের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে মাইন বিস্ফোরণে অন্তত ছয়জন নিহত এবং ২৯ জনের বেশি আহত হয়েছেন। তবে প্রকৃত সংখ্যা আরো বেশি হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। কারণ, সীমান্তের দুর্গম এলাকায় ঘটে যাওয়া অনেক ঘটনা গণমাধ্যম কিংবা প্রশাসনিক নথিতে উঠে আসে না।

জানা গেছে, ২০২৪ সালে মাইন বিস্ফোরণে দুই রোহিঙ্গা নিহত ও ছয়জন আহত হন। একই বছরের ৭ জুলাই টেকনাফের লালদিয়ার চর এলাকায় মিয়ানমারের অভ্যন্তরে মাইন বিস্ফোরণে মো. জুবায়ের (১৮) নামে এক বাংলাদেশি যুবক নিহত হন। ওই ঘটনায় আহত হন দুজন। ২০২৫ সালে অন্তত ২৮ জন মাইন বিস্ফোরণে আহত হন। শুধু ২৪ জানুয়ারি থেকে ১ মে পর্যন্ত সময়ের মধ্যে আহত হন অন্তত ১৩ জন।

এর মধ্যে ২৪ জানুয়ারি নাইক্ষ্যংছড়ির ফুলতলী, লেম্বুছড়ি ও জামগছড়ি এলাকায় পৃথক তিনটি বিস্ফোরণের ঘটনায় তিনজন আহত হন। ৬ এপ্রিল টেকনাফের হোয়াইক্যং সীমান্তে মৎস্যজীবী মোহাম্মদ ফিরোজের একটি পা বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।

নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, সীমান্তে মাইন এখন শুধু সাধারণ মানুষের জন্য নয়, নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের জন্যও বড় ধরনের হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২০২৫ সালের অক্টোবরে তুমব্রু সীমান্তে টহলরত অবস্থায় মাইন বিস্ফোরণে গুরুতর আহত হন বিজিবির ল্যান্স নায়েক মো. আক্তার হোসেন। পরে ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে ২৩ দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর তার মৃত্যু হয়।

কেন এই করিডোরে মাইনের ঝুঁকি

স্থানীয় প্রশাসন বলছে, সীমান্ত করিডোরটি মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশপথ। সীমান্তের ওপারে পাহাড়ি পথ, ঘন জঙ্গল এবং কৌশলগত অবস্থানের কারণে সংঘাতের সময় এলাকাটি সামরিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

এছাড়া সীমান্তবর্তী বিভিন্ন এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে কৃষিকাজ, বাঁশ-কাঠ সংগ্রহ, গবাদিপশু চরানো এবং অন্যান্য জীবিকার প্রয়োজনে মানুষের নিয়মিত যাতায়াত রয়েছে। অনেক সময় স্থানীয় বাসিন্দারা না জেনেই ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় প্রবেশ করায় মাইন বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটছে।

ঘুমধুম এলাকার এক জনপ্রতিনিধি বলেন, সীমান্তের কাছাকাছি বসবাসকারী মানুষ জীবিকার প্রয়োজনে বছরের পর বছর ধরে পাহাড় ও বনাঞ্চলে চলাচল করে আসছেন। কিন্তু বর্তমানে কোন এলাকায় মাইন পুঁতে রাখা হয়েছে আর কোন এলাকা নিরাপদ, সে বিষয়ে অনেকের কাছে স্পষ্ট ধারণা নেই।

তিনি বলেন, সীমান্ত এলাকার মানুষ অনেক সময় বাধ্য হয়েই ঝুঁকি নিয়ে চলাফেরা করেন। কেউ মাছ ধরতে, কেউ বাঁশ কাটতে, কেউ কৃষিকাজ করতে আবার কেউ গবাদিপশু খুঁজতে গিয়ে মাইন বিস্ফোরণের শিকার হচ্ছেন।

নিরাপত্তা বিশ্লেষক এমদাদুল ইসলাম বলেন, স্থলমাইনের সবচেয়ে বড় ভয়াবহতা হলো এটি যোদ্ধা ও সাধারণ মানুষের মধ্যে কোনো পার্থক্য করে না। তিনি বলেন, সীমান্তবর্তী এলাকায় ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলো চিহ্নিত করা, স্থানীয় জনগণকে সতর্ক করা এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সহযোগিতায় মাইন ঝুঁকি মূল্যায়ন করা জরুরি।

এদিকে, সীমান্ত এলাকায় মাইন বিস্ফোরণে হতাহতের ঘটনা বাড়তে থাকায় প্রশাসনের পক্ষ থেকে সচেতনতা কার্যক্রম জোরদারের কথা জানানো হয়েছে। বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এনামুল হাসান বলেন, সীমান্তবর্তী এলাকায় নিয়মিতভাবে সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের শূন্যরেখা এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় না যাওয়ার জন্য সতর্ক করা হচ্ছে। তিনি বলেন, মানুষ সচেতন হলে মাইন বিস্ফোরণে হতাহতের ঘটনা অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।

ইউএনও জানান, ঝুঁকির বিষয়গুলো জনগণকে জানানো হলেও জীবিকার প্রয়োজনে অনেকে সতর্কতা উপেক্ষা করে সীমান্তের কাছাকাছি চলে যাওয়ায় দুর্ঘটনা ঘটছে।

সীমান্ত পরিস্থিতি মোকাবিলায় বাংলাদেশকে কূটনৈতিক পর্যায়ে আরো সক্রিয় হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক এম শাহীদুজ্জামান বলেন, সীমান্তে মাইন বিস্ফোরণের বিষয়টি শুধু আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এটি একটি আঞ্চলিক নিরাপত্তার বিষয়।

তিনি বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করে সাধারণ মানুষকে নিরাপদ রাখা, সীমান্তবাসীর জন্য বিশেষ নিরাপত্তা কর্মসূচি গ্রহণ এবং প্রয়োজন হলে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা নেওয়া প্রয়োজন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ঘুমধুম-তুমব্রু-ফুলতলী সীমান্ত করিডোর এখন আর শুধু একটি ভৌগোলিক সীমারেখা নয়; এটি এমন একটি এলাকা, যেখানে যুদ্ধের অদৃশ্য অস্ত্র প্রতিদিন নতুন করে মানুষের জীবনকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে।

সীমান্তের ওপারে সংঘাত যতদিন চলবে, ততদিন এই মাইন আতঙ্কও অব্যাহত থাকার আশঙ্কা রয়েছে। ফলে দ্রুত ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়া এবং সীমান্তবাসীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।