Image description

মানিকগঞ্জের হরিরামপুরের ২৮ বছর বয়সী যুবক মো. তালাত মাহমুদ বায়েজিদ। কম্বোডিয়ায় একটি বৈধ আইটি প্রতিষ্ঠান বা শপিং মলে চাকরি পাবেন—এমনটাই আশা ছিল তার। কিন্তু সেই আশা নিয়ে দেশ ছাড়লেও মানবপাচারকারীরা তাকে ৩ লাখ ৬০ হাজার টাকায় একটি চীনা সাইবার ক্রাইম সেন্টারের কাছে বিক্রি করে দেয়।

সম্প্রতি কম্বোডিয়ার এমন অবৈধ বন্দিশালা থেকে দেশে ফিরে আসা ২২১ জন বাংলাদেশির মধ্যে বায়েজিদ একজন। ভুয়া চাকরির প্রলোভনে পড়ে তারা সেখানে বন্দি ছিলেন।

দালাল কাউসার হাবিবের মাধ্যমে বায়েজীদের এই ভয়াবহ অভিজ্ঞতার শুরু। বিদেশে কাজের জন্য  কাউসার হাবিবের সাথে বায়েজিদের ৭ লাখ টাকার চুক্তি হয়। বায়েজিদ ৫ লাখ ৪৫ হাজার টাকা এবং তার পাসপোর্ট দালালের হাতে তুলে দেন। এরপর ২০২৫ সালের ১ নভেম্বর তিনি কম্বোডিয়ার টেচো বিমানবন্দরে পৌঁছান। সেখানে গিয়ে তিনি জানতে পারেন, তাকে ট্যুরিস্ট ভিসায় পাঠানো হয়েছে। বিমানবন্দরে নামার পর মিন্টু ও সাইফুল নামে স্থানীয় দুই দালাল তাকে রিসিভ করে একটি হোটেলে আটকে রাখে। পরে তারা বায়েজিদকে সাইবার অপরাধ চক্রের কাছে বিক্রি করে দেয়।

ওই বন্দিশালার ভেতরে এক চীনা নাগরিক বায়েজিদকে আটকে রেখে কঠোর পরিশ্রম ও নির্যাতন করতে থাকে। বায়েজিদের পরিবার ৩ হাজার ডলার মুক্তিপণ দেওয়ার পর তিনি মুক্তি পান। শেষ পর্যন্ত তিনি “ব্যাক মাইগ্রেশন” নামক একটি উদ্যোগের মাধ্যমে দেশে ফিরে আসেন এবং বিমানবন্দর থানায় একটি মামলা দায়ের করেন।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, ভুক্তভোগীদের বেশিরভাগেরই জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) বৈধ ছাড়পত্র ছিল। কিন্তু চীনা চক্রের সাথে হাত মেলানো বাংলাদেশি দালালদের একটি নেটওয়ার্কের কারণে তারা প্রতারণার শিকার হন।

নির্যাতন সেল এবং ইলেকট্রিক শক

ভুক্তভোগীরা শরীরে নির্যাতনের গভীর চিহ্ন নিয়ে দেশে ফিরেছেন। তারা জানান, তাদেরকে দিনরাত ২৪ ঘণ্টা অনলাইনে আর্থিক প্রতারণার কাজ করতে বাধ্য করা হতো। যারা নির্দিষ্ট লক্ষ্য পূরণ করতে পারতেন না কিংবা কাজে অস্বীকৃতি জানাতেন, তাদেরকে নির্যাতন সেলে নিয়ে যাওয়া হতো। সেখানে লোহার রড দিয়ে পেটানো হতো এবং ইলেকট্রিক শক দেওয়া হতো।

সম্প্রতি কম্বোডিয়ার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী একটি বড় ধরনের চিরুনি অভিযান চালায়। এই অভিযানের কারণে চীনা অপরাধীরা সেখান থেকে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়। ফলে বন্দি বাংলাদেশিরা সেখান থেকে পালিয়ে আসার সুযোগ পান।

কম্বোডিয়া থেকে ফিরে আসা এই ভুক্তভোগীদের মনে এবং শরীরে গভীর ক্ষত তৈরি হয়েছে। বেঁচে ফেরা ব্যক্তিরা জানান, বন্দিদের ছোট ছোট কামরায় আটকে রাখা হতো এবং কোটা পূরণের জন্য দিনরাত অনলাইন আর্থিক জালিয়াতি করতে বাধ্য করা হতো।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন ভুক্তভোগী বলেন, কাজ করতে রাজি না হলে বা লক্ষ্য পূরণে ব্যর্থ হলে নির্যাতন সেলে নিয়ে লোহার রড দিয়ে মারধর করা হতো এবং ইলেকট্রিক শক দেওয়া হতো। কম্বোডিয়ার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাম্প্রতিক ব্যাপক অভিযানের পর চীনা ক্যাম্প পরিচালকেরা পালিয়ে গেলে এই চরম অত্যাচার বন্ধ হয়। মুক্ত হন আটকে পড়া বাংলাদেশিরা।

দালাল অপুর ‘মানবপাচার’ সাম্রাজ্য

ফিরে আসা ব্যক্তিদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এই পাচার চক্রের অন্যতম প্রধান হোতা আব্দুল্লাহ আল মামুন অপু। তিনি ময়মনসিংহের বাসিন্দাম ২০১৫ সালের দিকে বাংলাদেশ ছেড়ে কম্বোডিয়ার নমপেনে স্থায়ী হন। কম্বোডিয়ার পাসপোর্টধারী অপু নিজেকে কম্বোডিয়া আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক দাবি করে দীর্ঘদিন ধরে আইনি নজরদারি এড়িয়ে চলছিলেন। তবে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব এই দাবির সত্যতা অস্বীকার করেছে।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বাংলাদেশে সরকার পতনের পর রাজনৈতিক শূন্যতার সুযোগ নেন অপু। তিনি দেশ থেকে পালিয়ে যাওয়া রাজনীতিবিদদের টার্গেট করে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নেন। এর ফলে কম্বোডিয়ায় বাংলাদেশিদের যাওয়ার হার হঠাৎ অনেক বেড়ে যায়। জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্যও এই বৃদ্ধির প্রমাণ দেয়। তথ্য অনুযায়ী, শুধু ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল মাসের মধ্যেই ২ হাজার ৪০৮ জন বাংলাদেশি কম্বোডিয়ায় গেছেন।

যেভাবে পাতা হয় ফাঁদ

ভুক্তভোগী মো. তালাত মাহমুদ বায়েজিদ গত ১৫ জুন ঢাকার বিমানবন্দর থানায় মানবপাচার ও জোরপূর্বক শ্রম আদায়ের অভিযোগে একটি মামলা করেন। মামলার এজাহারে বলা হয়, একটি সুসংগঠিত চক্র উন্নত জীবনের লোভ দেখিয়ে তাকে এই ফাঁদে ফেলেছে। মামলায় ট্রাভেল এজেন্সি ব্যবসায়ী ৫০ বছর বয়সী মো. কাউসার হাবিব, কম্বোডিয়া প্রবাসী কুষ্টিয়ার ৩২ বছর বয়সী দালাল মিন্টু এবং নোয়াখালীর ৪২ বছর বয়সী সাইফুলসহ অজ্ঞাত আরও চারজনকে আসামি করা হয়েছে।

অভিযোগ থেকে জানা যায়, বায়েজিদের এক খালার মাধ্যমে তার সঙ্গে কাউসার হাবিবের পরিচয় হয়। কাউসার ২০২২ সালের আগস্টে বায়েজিদকে কম্বোডিয়ায় প্রতি মাসে ৬ লাখ টাকা বেতনের চাকরির প্রস্তাব দেন। এজন্য ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে বায়েজিদের সঙ্গে কাউসারের ৭ লাখ টাকার  চুক্তি হয়। বায়েজিদ প্রথমে পাসপোর্টের সাথে নগদ এক লাখ টাকা দেন এবং পরে ব্যাংকের মাধ্যমে আরও ৪ লাখ ৪৫ হাজার টাকা পাঠান।

২০২৩ সালের ২৬ অক্টোবর বায়েজিদের ফ্লাইটের টিকেট কেনা হয়। এরপর ১ নভেম্বর যাত্রার দিন সকালে বায়েজিদ হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে কাউসারের সাথে দেখা করে শেষ কিস্তির এক লাখ ৬০ হাজার টাকা বুঝিয়ে দেন।

কম্বোডিয়া পৌঁছানোর পর ‘বিক্রি’

বায়েজিদ কম্বোডিয়া পৌঁছে তাকে ট্যুরিস্ট ভিসা দেওয়া হয়েছে জানতে পেরে আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। তিনি হোয়াটসঅ্যাপে কাউসারকে মেসেজ দিলে কাউসার তার স্থানীয় সহযোগী মিন্টু ও সাইফুলকে বায়েজিদকে নিয়ে আসার নির্দেশ দেন। কিন্তু তারা তাকে কাজের জায়গায় না নিয়ে “হোটেল রয়্যাল এ ওয়ান”-এ নিয়ে যান এবং সেখান থেকে দ্রুত একটি চীনা সাইবার ক্রাইম সেন্টারের কাছে বিক্রি করে দেন।

সেই বন্দিশালার ভেতরে কো ওয়াং নামের এক চীনা নাগরিক বায়েজিদকে ড্রেন পরিষ্কার করার মতো অত্যন্ত কঠিন শারীরিক পরিশ্রম করতে বাধ্য করেন। বায়েজিদ এতে বাধা দিলে তাকে নির্মমভাবে মারধর করা হয়। বায়েজিদকে জানানো হয়, তাকে ৩ হাজার ডলারে কিনে নেওয়া হয়েছে। টাকা আদায়ের জন্য বায়েজিদের ওপর নির্যাতনের দৃশ্য ভিডিও কলের মাধ্যমে তার পরিবারকে দেখানো হতো।

ছেলের জীবন বাঁচাতে বায়েজিদের পরিবার চড়া সুদে ঋণ নিয়ে কো ওয়াংকে ৩ হাজার ডলার মুক্তিপণ দেয়। মুক্তির পর বায়েজিদ একদম নিঃস্ব হয়ে পড়েন। পরে তিনি “জাক মাইগ্রেশন” নামক একটি সংস্থার সাথে যোগাযোগ করতে সক্ষম হন। তাদের সহায়তায় বায়েজিদসহ আরও ৫৩ জন ভুক্তভোগী ২০২৬ সালের ১ জুন কম্বোডিয়া থেকে রওনা হয়ে ঢাকায় পৌঁছান। সেখানে জাক মাইগ্রেশন ওয়েলফেয়ার সেন্টারে প্রাথমিক চিকিৎসা নেওয়ার পর তিনি থানায় মামলা দায়ের করেন।

মানবপাচারের এক ভয়াবহ নতুন রূপ

ব্র্যাকের অভিবাসন কর্মসূচির সহযোগী পরিচালক শরিফুল হাসান জানান, কম্বোডিয়ার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানের কারণেই এই যুবকদের উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, ডিজিটাল সাইবার অপরাধ বা স্ক্যামিং হলো আধুনিক মানবপাচারের একটি ভয়াবহ রূপ। যেহেতু একজন ভুক্তভোগী কঠোর মানবপাচার বিরোধী আইনে মামলা করেছেন, তাই কর্তৃপক্ষের উচিত বিষয়টি গুরুত্বের সাথে তদন্ত করা।

শরিফুল হাসান বলেন, সরকারি ছাড়পত্র থাকা সত্ত্বেও কীভাবে ভুক্তভোগীদের ট্যুরিস্ট ভিসায় পাঠানো হলো, সেই স্থানীয় রিক্রুটিং নেটওয়ার্কগুলোকে চিহ্নিত করা জরুরি। এই চক্রগুলো ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ এবং টেলিগ্রামের মাধ্যমে ভুয়া আইটি বা কল সেন্টারের চাকরির লোভনীয় বিজ্ঞাপন দেয়। এই পরিস্থিতিতে সরকার এবং ব্র্যাকের পক্ষ থেকে নাগরিকদের থাইল্যান্ড, মিয়ানমার, লাওস, ভিয়েতনাম এবং কম্বোডিয়ার যেকোনো চাকরির প্রস্তাব ভালোভাবে যাচাই করার জন্য জরুরি সতর্কতা জারি করা হয়েছে।