Image description

এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কি সব সমস্যার সমাধান দিতে পারবে? যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এবারের সমাবর্তন অনুষ্ঠানগুলোতে বক্তাদের কথায় তেমনটাই মনে হয়েছে। কিন্তু স্নাতক শেষ করা শিক্ষার্থীরা এই বার্তা খুব একটা ভালোভাবে নেননি। একের পর এক অনুষ্ঠানে এআই-এর গুণগান শুনে শিক্ষার্থীরা দুয়োধ্বনি দিয়েছেন।

 

শিক্ষার্থীদের এই প্রতিক্রিয়ার কারণ বোঝা কঠিন নয়। তারা এমন এক সময়ে কর্মজীবনে প্রবেশ করছেন, যখন এআইকে কেবল একটি কাজের সরঞ্জাম হিসেবে নয়, বরং পুরো শ্রমবাজার বদলে দেওয়ার শক্তি হিসেবে দেখা হচ্ছে।

 

কিন্তু চ্যালেঞ্জটা শুধু চাকরির বাজারে নয়। খোদ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে এখন এআইয়ের আদলে ঢেলে সাজানোর পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। বাজেট সংকট বা প্রশাসনিক কাজের চাপ কমাতে এআইকে সমাধান হিসেবে দেখানো হচ্ছে।

 

আসল বিপদটা এখানেই। চরম আর্থিক সংকটের এই সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যদি অন্ধভাবে এই প্রযুক্তি গ্রহণ করে, তবে তারা বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়বে। প্রযুক্তি খাতের প্রভাবশালীরা অবশ্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে এই পথে হাঁটতে উৎসাহ দিচ্ছে।

 

মার্কিন প্রযুক্তি জায়ান্ট সিসকো সম্প্রতি একটি নিবন্ধে বলেছে, ‘ভবিষ্যৎমুখী প্রতিষ্ঠানগুলো এআইকে তাদের সম্পদ সংকটের সমাধান হিসেবে দেখে।’

 

সিসকোর দাবি, এআই রুটিনমাফিক কাজগুলো স্বয়ংক্রিয় করতে পারে এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে আরও দক্ষ করে তুলতে পারে। এমনকি তারা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে ‘এআই-সম্পর্কিত দক্ষতার সাপ্লাই চেইন’ বা সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখার ওপর জোর দিয়েছে।

 

উচ্চশিক্ষা সম্পর্কে এটি একটি উদ্বেগজনক দৃষ্টিভঙ্গি। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে বলা হচ্ছে এআইকে কেবল একটি যন্ত্র হিসেবে নয়, বরং প্রতিষ্ঠানের মূল ভিত্তি হিসেবে দেখতে। শিক্ষার্থীদের ভাবা হচ্ছে এআই জানা হবু কর্মী হিসেবে। অন্যদিকে শিক্ষকদের কাজ সহজ করার নামে শ্রম কমিয়ে ফেলার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।

 

অনেকেই এই যুক্তিতে সাড়া দিয়েছেন। মিনেসোটা ইউনিভার্সিটি, ডার্টমাউথ কলেজ ও সিরাকিউজ ইউনিভার্সিটি এআই কোম্পানিগুলোর সঙ্গে চুক্তি করেছে। ২০২৫ সালে ক্যালিফোর্নিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটি (সিএসইউ) ওপেনএআইয়ের সাথে ১৭ মিলিয়ন ডলারের একটি চুক্তি করে। এর মাধ্যমে তারা পাঁচ লাখেরও বেশি শিক্ষার্থী ও অনুষদ সদস্যের জন্য চ্যাটবট ব্যবহারের সুযোগ পায়।

 

জরিপ বলছে, সিএসইউ-এর অনেক শিক্ষক ও শিক্ষার্থী এআইয়ের এসব চাকচিক্যময় প্রতিশ্রুতিতে বিশ্বাসী নন। তা সত্ত্বেও এই চুক্তিকে একটি ‘মাইলফলক’ হিসেবে প্রচার করা হয়েছে। ওপেনএআইয়ের জন্য এটি ছিল একটি বড় সুযোগ। কিন্তু অর্থনৈতিক যুক্তি বলছে, একদিকে বিশ্ববিদ্যালয়টি ১৪৪ মিলিয়ন ডলারের বাজেট ঘাটতির মুখে পড়ছে, অন্যদিকে তারা এআইয়ের পেছনে বড় অংকের খরচ করে যাচ্ছে।

 

বিশ্ববিদ্যালয় যখন তার বিভিন্ন কাজ এআইয়ের হাতে সঁপে দেয়, তখন কী ঘটে? অ্যারিজোনার গ্লেনডেল কমিউনিটি কলেজের সমাবর্তনে এর একটি উদাহরণ দেখা গেছে। সেখানে শিক্ষার্থীদের নাম পড়ার জন্য এআই ব্যবহার করা হয়েছিল। কিন্তু প্রযুক্তিটি ঠিকমতো কাজ করেনি। মঞ্চে হাঁটা শিক্ষার্থীদের নামের সাথে এআইয়ের পড়া নাম মিলছিল না।

 

শিক্ষার্থীদের দুয়োধ্বনির মুখে কলেজের প্রেসিডেন্ট টিফানি হার্নান্দেজ একে একটি ‘শিক্ষা’ হিসেবে বর্ণনা করেন। কিন্তু ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীদের কাছে এই ক্ষমা প্রার্থনা আন্তরিক মনে হয়নি।

 

আরও গুরুতর সমস্যা হলো, এআই যদি প্রশাসনিক কাজ ছাপিয়ে শিক্ষকতা ও খাতা মূল্যায়নের জায়গা দখল করে। সমর্থকরা বলেন, এআই খরচ কমাবে এবং ক্লাস ডিজাইন বা খাতা দেখার কাজ ভালো করবে।

 

কিন্তু এর বিপরীতে গোপনীয়তা লঙ্ঘন, পক্ষপাতদুষ্টতা ও জবাবদিহির অভাবের প্রশ্ন রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণ হলো শিক্ষা ও মেন্টরশিপ। তবে এসবের সবটা যদি স্বয়ংক্রিয় হয়ে যায়, তখন আর কী বাকি থাকে?

 

খাতা মূল্যায়নের ক্ষেত্রে এআইয়ের দক্ষতা নিয়ে সংশয় আছে। কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, এআই রুটিনমাফিক খাতা দেখতে গিয়ে মানুষের মতো বিচক্ষণতা দেখাতে পারে না। এআই অনেক সময় কেবল রচনার দৈর্ঘ্য বা কঠিন শব্দের ওপর ভিত্তি করে নম্বর দেয়। যেটা শিক্ষার মানদণ্ডের সঙ্গে মেলে না।

 

গবেষক ডেবোরাহ তালমি সতর্ক করে বলেছেন, মূল্যায়নের অর্থ কেবল নম্বর দেওয়া নয়, এটি শিক্ষার একটি অর্থবহ প্রক্রিয়া। এআইয়ের ব্যবহার এই মূল্যবোধকে ঝুঁকিতে ফেলে। শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ে কেবল একটি সনদের জন্য আসে না। তারা চায় তাদের প্রতিভা বিকশিত হোক এবং তারা পৃথিবীকে বুঝতে শিখুক।

 

বিশ্ববিদ্যালয় যদি এসব কাজ এআইয়ের হাতে ছেড়ে দেয়, তবে উচ্চশিক্ষার মূল উদ্দেশ্যই ব্যাহত হবে। এআইয়ের অতিরিক্ত ব্যবহার শিক্ষার্থীদের চিন্তাশক্তি ও বিশ্লেষণ ক্ষমতা কমিয়ে দিতে পারে।

 

এআই বিপ্লবের পক্ষে যারা সবচেয়ে বেশি কথা বলছেন, তারা মূলত বড় বড় প্রযুক্তি কোম্পানির সঙ্গে যুক্ত। তাদের বিনিয়োগ থেকে মুনাফা পাওয়ার জন্য সবখানে এআইয়ের ব্যবহার জরুরি হয়ে পড়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তাদের কাছে বড় একটি বাজার।

 

তারা চায় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে ব্যবহার করে এআইকে জনজীবনের অপরিহার্য অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে। এতে শিক্ষার্থীদের কেবল বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর মুনাফার দাবার ঘুঁটি হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।

 

বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কেবল আর্থিক দক্ষতার জায়গা নয়, আর তাদের প্রধান কাজ কেবল দক্ষ কর্মী সরবরাহ করাও নয়। বিশ্ববিদ্যালয় গড়া হয়েছিল পাঠদান ও উচ্চতর জ্ঞানচর্চার জন্য, যাতে চিন্তাশীল নাগরিক তৈরি করা যায়।

 

শিক্ষার্থীদের সমাবর্তনে দেওয়া সেই দুয়োধ্বনি আসলে এক বড় প্রতিবাদ। তারা এমন একটি ব্যবস্থাকে মেনে নিতে অস্বীকার করছে, যা তাদের মানুষ নয়, বরং কেবল উপাত্ত বা ডেটা হিসেবে গণ্য করছে। এআইয়ের যুগে বিশ্ববিদ্যালয়ের এই যে মহান উদ্দেশ্য, সেটিকেই এখন শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের রক্ষা করতে হবে।

 

 


আলজাজিরা থেকে অনূদিত

 

লেখক: সোমদীপ সেন প্রিটোরিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক। তিনি মূলত এশীয় শিক্ষা ও রাজনীতি নিয়ে লেখালেখি করেন।