Image description

ভারতের পশ্চিমবঙ্গে দলবিরোধী কর্মকাণ্ডের অভিযোগে দুই বিধায়ক—ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় ও সন্দীপন সাহাকে দল থেকে বহিষ্কার করেছে তৃণমূল কংগ্রেস। দলের সহসভাপতি চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য স্বাক্ষরিত চিঠিতে তাদের প্রাথমিক সদস্য পদ বাতিলের কথা জানানো হয়েছে।

 

তৃণমূল সূত্র জানিয়েছে, ই-মেইল ও হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে ওই সিদ্ধান্ত দুই বিধায়ককে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার স্পিকার রথীন্দ্র বসুকেও বিষয়টি অবহিত করা হয়েছে।

সোমবার পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার একটি বিতর্কিত স্বাক্ষর জালিয়াতি অভিযোগ নিয়ে রাজ্য সরকারের সদর দপ্তর নবান্নে সংবাদ সম্মেলন করেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। সেখানে তিনি জানান, বিধানসভার স্পিকারের কাছে লিখিত অভিযোগ করেছিলেন তৃণমূলের এই দুই বিধায়ক।

সেই অভিযোগের ভিত্তিতে বিধানসভার সচিবালয় থানায় মামলা করে। পরে বিষয়টির তদন্তে রাজ্যের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) যুক্ত করা হয়।

 

সংবাদ সম্মেলনের প্রায় ১৫ মিনিটের মধ্যেই উলুবেড়িয়া পূর্বের বিধায়ক ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় এবং এন্টালির বিধায়ক সন্দীপন সাহাকে দল থেকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেয় তৃণমূল।

বহিষ্কারের পর প্রতিক্রিয়ায় সন্দীপন সাহা বলেন, যারা অনৈতিক কাজ করে দল তাদের সমর্থন দেয়, আর যারা নৈতিক অবস্থান নেয় তাদের বহিষ্কার করা হয়।

তিনি দাবি করেন, একটি হাজিরা খাতার স্বাক্ষরকে প্রস্তাব অনুমোদনের স্বাক্ষর হিসেবে দেখানো হয়েছে, যা তারা জানতেন না।

 

নিয়ম অনুযায়ী, বহিষ্কারের পর দুই বিধায়ক এখন ‘স্বতন্ত্র’ বা দলহীন সদস্য হিসেবে বিধানসভায় থাকবেন। ফলে রাজ্যসভা নির্বাচনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে তারা দলের হুইপ বা নির্দেশ মানতে বাধ্য থাকবেন না।

ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক জীবনে এটি প্রথম বহিষ্কারের ঘটনা নয়। ২০১৪ সালে সিপিএমের মনোনয়নে তিনি রাজ্যসভার সদস্য নির্বাচিত হন।

তবে ২০১৭ সালে বিভিন্ন অভিযোগে তাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়। পরে তিনি দীর্ঘ সময় দলহীন সাংসদ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এরপর তৃণমূল কংগ্রেসে যোগ দিয়ে প্রথমে রাজ্যসভায় এবং পরে বিধানসভায় নির্বাচিত হন।

 

দুই বিধায়কের বহিষ্কারের পর দলের মুখপাত্র ও বেলেঘাটার বিধায়ক কুণাল ঘোষ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি দীর্ঘ পোস্ট দেন। সেখানে তিনি নাম উল্লেখ না করেই দলবিরোধী অবস্থান নেওয়ার সমালোচনা করেন। পরে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ঋতব্রত ও সন্দীপনের নাম উল্লেখ করে প্রশ্ন তোলেন, দলের প্রতীক ও নেত্রীর জনপ্রিয়তা ব্যবহার করে নির্বাচিত হওয়ার পর এত দ্রুত দলের বিরুদ্ধে অভিযোগ কেন তোলা হলো।

কী এই স্বাক্ষর বিতর্ক?

গত ৪ মে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর ৬ মে দলীয় সভায় নির্বাচিত বিধায়কদের নিয়ে বৈঠক করেন তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ওই বৈঠকে পরিষদীয় দলের নেতা, উপনেতা ও মুখ্যসচেতক নির্বাচনের দায়িত্ব তার ওপর ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়।

পরবর্তীতে শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়কে বিরোধী দলনেতা, নয়না বন্দ্যোপাধ্যায় ও অসীমা পাত্রকে উপদলনেতা এবং ফিরহাদ হাকিমকে মুখ্যসচেতক হিসেবে মনোনীত করা হয়। এ বিষয়ে দলের সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় স্বাক্ষরিত একটি চিঠি বিধানসভায় পাঠানো হলেও তা গ্রহণ করা হয়নি।

বিধানসভার নিয়ম অনুযায়ী, এসব পদে নির্বাচন পরিষদীয় দলের আনুষ্ঠানিক বৈঠকেই সম্পন্ন হতে হয়। পরে ১৯ মে আরেকটি বৈঠকে বিধায়কদের দিয়ে একটি নথিতে স্বাক্ষর নেওয়া হয়। অভিযোগ উঠেছে, ওই স্বাক্ষর ১৯ মে নেওয়া হলেও তা ৬ মের বৈঠকের কার্যবিবরণী হিসেবে দেখানো হয়েছে। এই অভিযোগ থেকেই বর্তমান বিতর্কের সূত্রপাত।

ঘটনার তদন্তে সিআইডি কয়েকজন বিধায়কের বাড়িতে যায়। তাদের মধ্যে রয়েছেন নয়না বন্দ্যোপাধ্যায়, কুণাল ঘোষ, তাপস মাইতি ও বাহারুল ইসলাম।

বিশেষ করে বাহারুল ইসলামের স্বাক্ষর নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। তিনি দাবি করেন, ৬ মে অনুষ্ঠিত বৈঠকে তিনি উপস্থিত ছিলেন না। তদন্তকারীদেরও তিনি একই তথ্য জানিয়েছেন। তার ভাষ্য, ভোট-পরবর্তী সহিংসতার কারণে সেদিন তিনি নিজ এলাকায় অবস্থান করছিলেন।

এদিকে শোভনদেব চট্টোপাধ্যায় বলেন, কাউকে জোর করে স্বাক্ষর করানো হয়নি। তবে বাহারুল ইসলাম একটি স্বাক্ষর দেখে সেটি তার নয় বলে দাবি করেছেন।

স্বাক্ষর জালিয়াতির অভিযোগের তদন্তের অংশ হিসেবে সোমবার অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তলব করেছিল সিআইডি। তবে অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে তিনি হাজির হননি।