ভারত সফরে এসে আগ্রার ঐতিহাসিক তাজমহল পরিদর্শন করেছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। স্ত্রী জ্যানেট রুবিওকে সঙ্গে নিয়ে ইউনেস্কো ঘোষিত বিশ্বের ঐতিহ্যবাহী স্থাপনাটির সামনে বিখ্যাত বেঞ্চে বসে তোলা ছবি সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করেন তিনি।
তবে ছবিটি প্রকাশের পরই তা যুক্তরাষ্ট্র-ইরান উত্তেজনার নতুন আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে। চলমান সংঘাতের মধ্যেই তেহরান এই ছবিকে ওয়াশিংটনের বিরুদ্ধে কূটনৈতিক খোঁচা দেওয়ার সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করেছে।
ছবি প্রকাশের কিছুক্ষণের মধ্যেই ভারতের হায়দরাবাদে অবস্থিত ইরানের কনস্যুলেট জেনারেল সামাজিক মাধ্যম এক্সে প্রতিক্রিয়া জানায়।
তারা লিখেছে, মার্কো রুবিও যদি ইতিহাস কিংবা স্থাপত্য সম্পর্কে জানতেন, তাহলে এখানে ছবি তোলার জন্য পোজ দিতেন না।
পোস্টে আরও বলা হয়, এই স্মৃতিসৌধ নির্মিত হয়েছিল সম্রাটের ইরানি স্ত্রীর প্রতি ভালোবাসার স্মারক হিসেবে। এটি নির্মাণ করেছেন ইরানি স্থপতিদের মেধা ও সৃজনশীলতায়। অথচ আজ তার সরকারই ইরানি সভ্যতাকে মুছে ফেলার হুমকি দিচ্ছে এবং অন্যান্য সভ্যতাকেও অপমান করছে।
উল্লেখ্য, ইরান সংঘাতের চূড়ান্ত উত্তেজনার সময় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানি সভ্যতা ধ্বংস করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছিলেন।
এর জবাবে ইরানের সামরিক কর্মকর্তারা যুক্তরাষ্ট্রের মাত্র আড়াইশ বছরের ইতিহাসের সঙ্গে ইরানের ছয় হাজার বছরেরও বেশি পুরোনো সভ্যতার তুলনা টেনে ট্রাম্পের মন্তব্যকে উপহাস করেছিলেন।
ভালোবাসার স্মৃতিসৌধ হিসেবে পরিচিত তাজমহল ১৬৩২ সালে মুঘল সম্রাট শাহজাহান তার তৃতীয় স্ত্রী মমতাজ মহলের স্মৃতিতে নির্মাণ শুরু করেন।
ঐতিহাসিকদের মতে, তাজমহল মুঘল স্থাপত্যের শ্রেষ্ঠ নিদর্শন হলেও এর শিকড় গভীরভাবে প্রোথিত ফারসি ঐতিহ্যের মধ্যে। রাজপরিবারের বংশপরিচয় থেকে শুরু করে স্থাপত্য নকশা এবং অলংকরণ সব ক্ষেত্রেই পারস্যের প্রভাব স্পষ্ট।
মমতাজ মহলের প্রকৃত নাম ছিল আরজুমান্দ বানু বেগম। তিনি ইরানের একটি প্রভাবশালী ফারসি অভিজাত পরিবারের সদস্য ছিলেন।
তার বাবা আবদুল হাসান আসাফ খান ছিলেন মুঘল দরবারের উচ্চপদস্থ পারস্য বংশোদ্ভূত অভিজাত।
মমতাজের দাদা মির্জা গিয়াস বেগ, যিনি পরে ইতিমাদ-উদ-দৌলা উপাধি লাভ করেন, ইরানের তেহরান থেকে ১৫৭৭ সালে ভারতে এসে সম্রাট আকবরের দরবারে যোগ দেন।
এই পারিবারিক সূত্রেই মমতাজ ছিলেন সম্রাট জাহাঙ্গীরের প্রধান স্ত্রী সম্রাজ্ঞী নূরজাহানের ভাতিজি।
অন্যদিকে মমতাজের মা দিওয়ানজি বেগমও ছিলেন পারস্যের কাজভিন শহরের বিশিষ্ট অভিজাত খাজা গিয়াসউদ্দিনের কন্যা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আধুনিক ইরানের সীমানার বাইরে তাজমহলই সম্ভবত ফারসি স্থাপত্যের সবচেয়ে উজ্জ্বল উদাহরণ।
এর বিশাল পেঁয়াজাকৃতি দ্বৈত গম্বুজ এবং সূক্ষ্ম মার্বেল ইনলে কাজ সরাসরি সাফাভি পারস্যের স্থাপত্য ঐতিহ্য থেকে অনুপ্রাণিত।
তাজমহলের বিখ্যাত চারবাগ বাগানও পারস্য স্থাপত্যের আরেকটি স্পষ্ট ছাপ বহন করে। জলধারার মাধ্যমে চারটি অংশে বিভক্ত এই বাগান ইসলামী ঐতিহ্যে বর্ণিত জান্নাতের চার নদীর প্রতীক হিসেবে নির্মিত।
তাজমহলের মার্বেল দেয়ালে খোদাই করা পবিত্র কোরআনের আয়াতগুলো নির্বাচন ও লিপিবদ্ধ করেছিলেন ইরানের শিরাজ শহরের বিখ্যাত ক্যালিগ্রাফার আবদুল হক।
তার অসাধারণ কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ শাহজাহান তাকে আমানত খান উপাধিতে ভূষিত করেন।
ঐতিহাসিকদের মতে, তাজমহল মূলত ফারসি শিল্প ও স্থাপত্যধারার সঙ্গে ভারতীয় কারিগরি দক্ষতা এবং স্থানীয় উপকরণের এক অনন্য সমন্বয়।
এই কারণেই বিশ্বের অন্যতম বিখ্যাত স্থাপত্য নিদর্শনটি শুধু মুঘল ঐতিহ্যের প্রতীক নয়, বরং ভারত ও পারস্যের দীর্ঘ সাংস্কৃতিক সংযোগেরও এক অনন্য সাক্ষ্য হয়ে আছে।
সূত্র : এনডিটিভি