১৯৮০-২০২০ সাল পর্যন্ত পাওয়া বিভিন্ন উপগ্রহচিত্র বিশ্লেষণ করে দেখেন গবেষকেরা। বিভিন্ন নদী অববাহিকা সরেজমিন পর্যবেক্ষণও করেন তারা। উষ্ণায়ন যে হিমালয়ের নদীগুলোতে কী প্রভাব ফেলছে, তার একটি আভাসও মিলেছে গবেষণায়।
কার্বন নিঃসরণ এবং বিশ্ব উষ্ণায়নের জেরে ধীরে ধীরে ‘বরফশূন্য’ হচ্ছে পৃথিবী। বহু হিমবাহ ইতিমধ্যে হারিয়ে গিয়েছে পৃথিবী থেকে। এবার আরো এক উদ্বেগের বিষয় উঠে এলো নতুন গবেষণায়। উষ্ণায়ন এবং হিমবাহের গলন বিরূপ প্রভাব ফেলছে হিমালয় থেকে নেমে আসা নদীগুলোর ওপর। বিভিন্ন নদীর গতিপথ দ্রুত বদলে যাচ্ছে। এমনই আভাস মিলেছে সাম্প্রতিক এক গবেষণায়। মঙ্গলবার আনন্দবাজার পত্রিকার প্রতিবেদনে একথা বলা হয়।
হিমালয় পর্বতমালা গোটা এশিয়া মহাদেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ নদীর উৎস। ভারত, চীন, পাকিস্তান, বাংলাদেশ, আফগানিস্তান, নেপাল, ভুটানের বিভিন্ন নদীর উৎসস্থল হিমালয়ে। এই নদীগুলোই এশিয়ার সমভূমিতে বসবাসকারী প্রায় ২০০ কোটি মানুষের জীবনধারণে সাহায্য করে।
সাম্প্রতিক গবেষণায় দাবি করা হচ্ছে, জলবায়ু উষ্ণ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে হিমবাহিত পানিতে পুষ্ট এই নদীগুলোতেও পরিবর্তন আসে। এই গবেষণার জন্য চার দশক থেকে তোলা বিভিন্ন উপগ্রহচিত্র বিশ্লেষণ করে দেখা হয়। তাতে দেখা যায়, হিমবাহ গলে যাওয়ার ফলে হিমালয়ের নদীগুলো আরো দ্রুত গতিপথ পরিবর্তন করছে। এর ফলে নদীগুলোর প্রকৃতি কেমন হবে, তা-ও অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে। একই সঙ্গে বন্যা, ভূমিক্ষয়ের ঝুঁকিও বৃদ্ধি পেতে পারে বলে আশঙ্কা গবেষকদের।
বেইজিংয়ের ‘চায়না ইউনিভার্সিটি অব জিওসায়েন্সেস’-এর অধ্যাপক চেংশান ওয়াংয়ের নেতৃত্বে এই গবেষণাটি হয়। গবেষণায় তাকে সাহায্য করেন ওই প্রতিষ্ঠানেরই গবেষক ঝংপেন হান এবং সিচুয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক লিন ঝিপেং। জলবায়ু পরিবর্তন এবং হিমবাহের গলন কীভাবে হিমালয়ের প্রধান নদী অববাহিকাগুলোকে প্রভাবিত করে, তা বিশ্লেষণ করে দেখেন তারা। গত ১৪ মে ‘সায়েন্স’ জার্নালে গবেষণাটি প্রকাশিত হয়।
চেংশান এবং তার সহযোগীরা মোট ৪০ বছরের পরিবর্তনকে বিশ্লেষণ করেন। ১৯৮০ সাল থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত পাওয়া বিভিন্ন উপগ্রহচিত্র ব্যবহার করেন তারা। বিভিন্ন নদী অববাহিকা সরেজমিন পর্যবেক্ষণও করা হয়।
গবেষণায় উঠে আসে, ১৯৮০-এর দশক থেকে বিশ্বব্যাপী তাপমাত্রা বৃদ্ধির গড় হার যা ছিল, হিমালয়ে ছিল তার দ্বিগুণ। গবেষণায় আরো দেখা যায়, হিমালয় পর্বতমালার মধ্যে দিয়ে জল এবং পলির স্তর কিভাবে প্রবাহিত হবে, তাতে পরিবর্তন আনার ক্ষমতা রাখে উষ্ণায়ন। বরফগলা অতিরিক্ত পানি নদীগুলিতে আরও ‘শক্তির’ জোগান দেয়। উল্লেখ্য, এখানে ‘ফ্রোজ়েন গ্রাউন্ড’ বা হিমায়িত মাটিও উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলে (মাটিতে মিশে থাকা পানি বরফ হয়ে গেলে, সেই মাটি জমাট বেঁধে শক্ত হয়ে যায়। তাকে হিমায়িত মাটি বলে) । হিমায়িত মাটি গলে গেলে নদীর পাড় দুর্বল হয়ে যেতে পারে।
গবেষণার জন্য তারা বিভিন্ন নদীখাতের ১ হাজার ৫৮২ কিলোমিটার দীর্ঘ অংশ বিশ্লেষণ করে দেখেন। এতে মোট ১ হাজার ৭৯টি নদীবাঁকের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেন তারা। এর মধ্যে অনেকগুলো নদীবাঁকই সহজে গতিপথ বদলে ফেলার মতো পরিস্থিতিতে রয়েছে। কারণ, সেখানে নদীর প্রবাহকে বাধা দেওয়ার মতো কিছু নেই। গবেষণায় কোথাও কোথাও দেখা গিয়েছে নদীর গতিপথে ‘কাট অফ’ হয়েছে। অর্থাৎ, নদী পুরনো গতিপথ ছেড়ে তুলনামূলক সংক্ষিপ্ত পথে প্রবাহিত হয়েছে। আবার কোথাও গতিপথে ‘অ্যাভলশন’ হয়েছে। অর্থাৎ, কোনো নদী আকস্মিকভাবে পুরোনো গতিপথ ছেড়ে নতুন গতিপথ ধরেছে।
গবেষকদের দাবি, গত ৪০ বছরের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে যে ওই সময়কালে নদীর গতিপথে যথেষ্ট নাড়াচাড়া পড়েছে। সামগ্রিকভাবে ১৯৮০-২০২০ সালের মধ্যে হিমালয় থেকে নেমে আসা নদীগুলোর গতিপথে ৩৩ শতাংশ বেশি বদল হয়েছে। বাধাহীন নদীবাঁকগুলোতে এই বৃদ্ধির হার প্রায় ৯৭ শতাংশ।
গবেষকদের দাবি, হিমালয়জুড়ে তাপমাত্রার ক্রমাগত বৃদ্ধি, হিমবাহ ও হিমায়িত মাটি গলে যাওয়ার ফলেই এই পরিবর্তন হচ্ছে। জলবায়ু উষ্ণ হয়ে গেলে নদীগুলোতে আরও বেশি পানি এবং পলির স্তর নেমে আসছে। এসব অনুঘটকগুলো মিলেই নদীকে তার গতিপথ সহজে বদলে দেওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি করে দিচ্ছে বলে মনে করছেন তারা।