চার মিনিট। দুটি মুহূর্ত। একজন ডিয়েগো ম্যারাডোনা। একদিকে বিতর্ক, অন্যদিকে নিখাদ প্রতিভা। ‘হ্যান্ড অব গড’ আর ‘গোল অব দ্য সেঞ্চুরি’—ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে আলোচিত দুই মুহূর্তের জন্ম দিয়েছিলেন আর্জেন্টিনার কিংবদন্তি ডিয়েগো ম্যারাডোনা।
১৯৮৬ বিশ্বকাপে পুরো টুর্নামেন্টজুড়ে আর্জেন্টিনাকে সামনে থেকে নেতৃত্ব দেন ম্যারাডোনা। গ্রুপ পর্বে তিনি ছিলেন দলের সবচেয়ে উজ্জ্বল তারকা, আর নকআউট পর্বে হয়ে ওঠেন ম্যাচের পার্থক্য গড়ে দেওয়া খেলোয়াড়। শেষ পর্যন্ত ট্রফি হাতে উল্লাস করা অধিনায়কও ছিলেন তিনিই।
সেই বিশ্বকাপ মূলত ছিল ম্যারাডোনার দখলে।
তবে তার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে স্মরণীয় ম্যাচ হয়ে আছে ১৯৮৬ সালের ২২ জুন, ইংল্যান্ডের বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনাল। বিশেষ করে মাত্র চার মিনিটের ব্যবধানে করা দুটি গোল তাকে ফুটবল ইতিহাসে অমর করে তোলে।
মেক্সিকো সিটির তীব্র গরমে সেদিন অ্যাজটেকা স্টেডিয়াম ছিল অগ্নিগর্ভ। ইংল্যান্ড ম্যাচের আগে আর্জেন্টিনা দলের কর্মকর্তারা খেলোয়াড়দের জন্য হালকা ও আরামদায়ক জার্সি সংগ্রহ করেছিলেন। কিন্তু মাঠের বাইরে উত্তাপ আরও বেশি ছিল।
স্টেডিয়ামের ভেতরে ও বাইরে দুই দেশের সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। ফকল্যান্ড যুদ্ধের মাত্র চার বছর পর এই ম্যাচ দুই দেশের মানুষের আবেগকে গভীরভাবে নাড়িয়ে দেয়। আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়েরাও সেই চাপ অনুভব করেন।
পরে সিএনএনকে হোর্হে লুইস বুরুচাগা বলেন, ‘নিঃসন্দেহে ম্যাচটির আলাদা গুরুত্ব ছিল। আমরা জানতাম ফকল্যান্ড যুদ্ধে নিহতদের ফিরিয়ে আনতে পারব না, তবে আমরা দেশকে কিছু আনন্দ দিতে পারব।’
নিজের আত্মজীবনীতে ম্যারাডোনা লিখেছিলেন, ‘এটাই ছিল প্রতিশোধ।’
এর পেছনে ছিল আরও পুরোনো ক্ষোভ। ১৯৬৬ বিশ্বকাপে ওয়েম্বলিতে ইংল্যান্ডের কাছে ১-০ গোলে হেরে আর্জেন্টিনা নিজেদের বঞ্চিত মনে করেছিল। সেই ম্যাচকে তারা বলেছিল ‘দ্য থেফট অব দ্য সেঞ্চুরি’।
২০ বছর পর আর্জেন্টিনা সেই ক্ষোভের জবাব দেয়।
অ্যাজটেকা স্টেডিয়ামে প্রায় ১ লাখ ১৪ হাজার দর্শকের সামনে ম্যাচ শুরু হয়। প্রথমার্ধ গোলশূন্য থাকলেও উত্তেজনা ছিল তুঙ্গে। ইংল্যান্ডের পিটার বিঅর্ডসলি সুযোগ নষ্ট করেন, আর ম্যারাডোনা পিটার শিলটনকে পরীক্ষা নেন।
দ্বিতীয়ার্ধের ছয় মিনিটে আসে সেই বিতর্কিত মুহূর্ত। বক্সে ভেসে আসা বলের দিকে ঝাঁপিয়ে পড়েন ম্যারাডোনা। মুহূর্তেই বল জালে জড়িয়ে যায়।
রেফারি আলি বিন নাসের কিংবা লাইন্সম্যান কেউই বুঝতে পারেননি তিনি হাত ব্যবহার করেছেন। ম্যারাডোনা হাত দিয়ে বল ঠেলে দেন শিলটনের মাথার ওপর দিয়ে।
পরে তিনি নিজেই এই গোলের নাম দেন ‘হ্যান্ড অব গড’। তবে এটি কোনো অলৌকিক ঘটনা ছিল না।
ইংল্যান্ডের খেলোয়াড়েরা ক্ষোভে ফেটে পড়েন। সেই ক্ষোভ বহু বছর ধরে রয়ে যায়।
২০২০ সালে দ্য গার্ডিয়ানকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে পিটার শিলটন বলেন, ‘সে আমাকে টপকে ওঠেনি। সে প্রতারণা করেছে। পুরো ইংল্যান্ড দল তার প্রতারণার শিকার হয়েছে। সে কোনো অনুশোচনাও দেখায়নি।’
অন্যদিকে ম্যারাডোনা কখনোই অনুতপ্ত হননি। বরং কয়েক বছর আগে তিনি রেফারি আলি বিন নাসেরের সঙ্গে দেখা করে তাকে আর্জেন্টিনার জার্সি উপহার দেন এবং বলেন, ‘আমার চিরন্তন বন্ধু।’
এই ঘটনাই ম্যারাডোনার দুষ্টুমি ও বিদ্রোহী চরিত্রকে প্রকাশ করে।
কিন্তু মাত্র চার মিনিট পর তিনি দেখান তার প্রকৃত মহিমা।
ইংল্যান্ডের গ্লেন হডল ফাউলের আবেদন জানালেও রেফারি খেলা চালিয়ে দেন। বল পৌঁছায় হেক্টর এনরিকের কাছে, তিনি পাস দেন ম্যারাডোনাকে।
সেই মুহূর্ত থেকেই শুরু হয় ইতিহাস।
ম্যারাডোনা প্রথমে বিয়ার্ডসলির ট্যাকল এড়িয়ে যান, বাঁ পায়ে বল নিয়ন্ত্রণ করে ঘুরে দাঁড়ান এবং পিটার রিডকে ফাঁকি দিয়ে এগিয়ে যান।
খালি জায়গা পেয়ে তিনি গতি বাড়ান। তার হাতে ছিল অধিনায়কের আর্মব্যান্ড, যা তিনি পেয়েছিলেন ড্যানিয়েল পাসারেল্লার কাছ থেকে।
পিটার রিড পেছনে পড়ে যান।
এরপর তিনি মাথা তুলে পরিস্থিতি বোঝেন, গতি কিছুটা কমিয়ে বাঁ পায়ের বাইরের অংশ দিয়ে বল নিয়ন্ত্রণ করেন এবং টেরি বুচারকে কাটিয়ে যান।
গোলপোস্ট থেকে ২০ গজ দূরে পৌঁছালে সামনে দাঁড়ান টেরি ফেনউইক। কিন্তু ম্যারাডোনা তখন অপ্রতিরোধ্য।
একটি টাচেই ফেনউইককেও কাটিয়ে ঢুকে পড়েন বক্সে। সামনে শুধু গোলরক্ষক পিটার শিলটন।
তিনি ভান করেন দূরের কোণে শট নেবেন। শিলটন প্রতিক্রিয়া দেখান।
ঠিক সেই মুহূর্তে বাঁ পায়ে সূক্ষ্ম টাচে বলকে পাশ কাটিয়ে দেন ম্যারাডোনা।
এটি ছিল এক অবিশ্বাস্য মুহূর্তের সিদ্ধান্ত ও দক্ষতা।
পেছন থেকে টেরি বুচার এসে পড়ার আগেই তিনি ফাঁকা জালে বল পাঠিয়ে দেন।
তখন আর্জেন্টিনার রেডিও ধারাভাষ্যকার ভিক্টর হুগো মোরালেস চিৎকার করে বলছিলেন, ‘জেনিও! জেনিও! জেনিও! গোওওওল!’
অসাধারণ গতি, দক্ষতা ও নিয়ন্ত্রণে তৈরি হয় ফুটবলের এক অবিশ্বাস্য দৃশ্য।
গোলের পরই ম্যারাডোনা দৌড়ে যান কর্নার ফ্ল্যাগের দিকে, উদযাপন করেন বুরুচাগার সঙ্গে।
মোরালেস তখন বলেন, ‘ধন্যবাদ ঈশ্বর, ফুটবলের জন্য, ম্যারাডোনার জন্য, এই অশ্রুর জন্য। আর্জেন্টিনা ২, ইংল্যান্ড ০।’
ব্রিটিশ ধারাভাষ্যকার ব্যারি ডেভিস মন্তব্য করেন, ‘এটা ছিল নিখাদ ফুটবল প্রতিভা।’
পরে ম্যারাডোনা নিজেই বলেন, ‘আমি এখনও বিশ্বাস করতে পারি না আমি এটা করেছি। এটা এমন এক গোল, যেটা মানুষ স্বপ্নে দেখে কিন্তু বাস্তবে করা প্রায় অসম্ভব।’
সেই ম্যাচে আর ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি ইংল্যান্ড। গ্যারি লিনেকার একটি গোল করলেও আর্জেন্টিনা জয় নিশ্চিত করে।
লিনেকার টুর্নামেন্টে ছয় গোল করে গোল্ডেন বুট জিতলেও, গোল্ডেন বল ওঠে ম্যারাডোনার হাতে।
এরপর সেমিফাইনালে বেলজিয়ামের বিপক্ষে আরও দুটি গোল করেন তিনি।
ফাইনালে পশ্চিম জার্মানির বিপক্ষে শেষ মুহূর্তে বুরুচাগাকে দিয়ে জয়সূচক গোল করান।
আর্জেন্টিনা বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়, আর ম্যারাডোনা হয়ে ওঠেন পুরো জাতির নায়ক।
ইংল্যান্ডের বিপক্ষে তার দ্বিতীয় গোলটি পরে ফিফার ভোটে ‘গোল অব দ্য সেঞ্চুরি’ নির্বাচিত হয়।
প্রথম গোলের বিতর্ক আর দ্বিতীয় গোলের সৌন্দর্য—এই দুই বিপরীত রূপেই ফুটবলে চিরকাল অমর হয়ে আছেন ডিয়েগো ম্যারাডোনা।