Image description

গত এক সপ্তাহে দুটি মর্মান্তিক মৃত্যু ভারতের মূলধারার গণমাধ্যমের নজর কেড়েছে। ভোপালের ৩৩ বছর বয়সী এমবিএ গ্র্যাজুয়েট ত্বিষা শর্মা এবং গ্রেটার নয়ডার ২৪ বছর বয়সী দীপিকা নাগরের মৃত্যুর ঘটনা দেশটির বিবেককে নাড়িয়ে দিয়েছে। তবে এর চেয়েও বেশি উদ্বেগের বিষয় হলো, এই ঘটনাগুলো সমাজের এক কাঠামোগত বাস্তবতাকে সামনে এনেছে।

এই দুটি ঘটনাই একটি গভীর পরিসংখ্যানগত অসঙ্গতি উন্মোচন করে। ভারতে নারীদের শিক্ষাগত যোগ্যতা, বিয়ের আগে জানাশোনা এবং উচ্চবিত্ত শহুরে সমাজের বিকাশ ঘটলেও স্বামী বা শ্বশুরবাড়ির লোকজনের হাতে প্রাণঘাতী সহিংসতার হার ক্রমাগত বাড়ছে। ফলে, জনশুমারি স্তরের সমীক্ষা এবং প্রকৃত প্রশাসনিক অপরাধের রেকর্ডের মধ্যে একটি বিশাল ব্যবধান স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

ভারতে প্রতি বছর প্রায় ৫,৭০০টি যৌতুকজনিত মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। ন্যাশনাল ফ্যামিলি হেলথ সার্ভের তথ্য অনুযায়ী, ভারতে বিবাহিত নারীদের প্রায় ৩১.৯ শতাংশই শারীরিক, যৌন বা মানসিক পারিবারিক সহিংসতার শিকার হন। অথচ প্রতি বছর ‘স্বামী বা আত্মীয়দের দ্বারা নিষ্ঠুরতা’ ধারার অধীনে ১ লাখ ২০ হাজারের মতো মামলা নিবন্ধিত হয়।

এনএফএইচএস-৫ এর ‘সাহায্য চাওয়ার আচরণ’ সংক্রান্ত ডেটা থেকে দেখা যায়, নির্যাতিত নারীদের মধ্যে মাত্র ১ শতাংশ আইনি প্রতিষ্ঠানের দ্বারস্থ হন। সুতরাং, এনসিআরবি এর ডেটাকে যৌতুকজনিত মৃত্যু বা পারিবারিক সহিংসতার প্রকৃত চিত্র হিসেবে ধরা যায় না। এটি অপরাধের ব্যাপ্তি দেখায় না, বরং প্রাতিষ্ঠানিক জটিলতা ও প্রতিবন্ধকতাকেই কেবল ফুটিয়ে তোলে।

ভোপাল এবং গ্রেটার নয়ডার ঘটনাগুলো এই প্রচলিত বিশ্বাস বা ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করে যে পুঁজি, পেশাদার স্বাধীনতা কিংবা শহরের আধুনিক জীবনযাপন নারীদের পারিবারিক সহিংসতা থেকে রক্ষা করতে পারে না। তথ্য অনুযায়ী, জীবনসঙ্গী বা সঙ্গীনির দ্বারা সহিংসতার এই প্রবণতা সব পরিবেশেই সমানভাবে বিদ্যমান। এটি গ্রামীণ এলাকায় ৩৪ শতাংশ এবং শহুরে কেন্দ্রগুলোতে ২৭ শতাংশ। নতুন শহরে চলে যাওয়াকে প্রায়শই আধুনিকায়নের পথ হিসেবে দেখা হলেও, এটি অনেক সময় নারীর তাৎক্ষণিক শারীরিক নিরাপত্তা বলয় এবং পারিবারিক সুরক্ষা থেকে তাকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে, যা ঘরের ভেতরে নিয়ন্ত্রণের একটি নিজস্ব ক্ষেত্র তৈরি করে।

 

এদিকে নামী-দামী এবং জাঁকজমকপূর্ণ বিয়ের আড়ালে বৈবাহিক লেনদেনের এই ছায়া অর্থনীতি যৌতুকের চিত্রকে ভয়াবহ আকারে তুলে ধরে। এনএফএইচএসের তথ্য থেকে দেখা যায়, জরিপকৃত ৭২,০৫৬ জন নারীর মধ্যে সবচেয়ে কম আয়ের এবং সবচেয়ে উচ্চ আয়ের উভয় শ্রেণির নারীরাই সমানভাবে শারীরিক সহিংসতার শিকার হয়েছেন। 

আদালতের অন্তহীন দীর্ঘসূত্রতা

ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থার প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত ধীরগতির ও অদক্ষ। পারিবারিক সহিংসতা থেকে বেঁচে যাওয়া একজন নারী কিংবা তার শোকগ্রস্ত পরিবারকে আইনি প্রতিকার পেতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়। ২০২২ সালে যেখানে ৬০,৫৭৭টি মামলা আগে থেকেই বিচারের অপেক্ষায় ঝুলে ছিল, সেখানে নতুন করে আরও ৬,১৬০টি যৌতুক মৃত্যুর মামলা বিচারের জন্য পাঠানো হয় যা বিশাল। এর মধ্যে মাত্র ১,২৩১টি মামলা সাজার স্তরে পৌঁছাতে পেরেছে এবং ২,১৮৯টি মামলার আসামিরা খালাস পেয়ে গেছে। বাকি মামলাগুলোর বর্তমান অবস্থান নিয়ে কোনও চূড়ান্ত তথ্য নেই।

বিচারিক আদালতের এই দীর্ঘসূত্রতা অপরাধীদের জন্য একটি প্রশাসনিক ঢাল বা বাফার হিসেবে কাজ করে। অপরাধীরা যখন উচ্চ প্রভাবশালী সামাজিক মহলের অংশ হয়, তখন তারা এই দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার সুযোগটি পুরোপুরি লুফে নেয়। 

সূত্র: এনডিটিভি