Image description

আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন দুই দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে বেইজিংয়ে চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিনপিংয়ের সাথে এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠক করতে যাচ্ছেন। দুই দেশের মধ্যে ঐতিহাসিক বন্ধুত্বের ২৫ বছর পূর্তি উদ্‌যাপনের এই ক্ষণে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া সফরটিতে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সহযোগিতা সম্প্রসারণের ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এই সফরে মস্কো ও বেইজিংয়ের মধ্যে কয়েক ডজন দ্বিপাক্ষিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, যা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এই দুই পরাশক্তির ক্রমবর্ধমান ঘনিষ্ঠতা এবং পররাষ্ট্রনীতি ও বাণিজ্যের ক্ষেত্রে অভিন্ন অবস্থানেরই বহিঃপ্রকাশ।

সাম্প্রতিক বৈশ্বিক পরিস্থিতি এবং পশ্চিমা দেশগুলোর একক আধিপত্যের বিরুদ্ধে এই দুই দেশের অবস্থান বিশ্বের ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণকে সম্পূর্ণ নতুন রূপ দিচ্ছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ‘আরটি’-এর সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে রাশিয়া ও চীনের এই ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থের মেলবন্ধনের প্রধান ক্ষেত্রগুলো বিস্তারিতভাবে উঠে এসেছে। ওই প্রতিবেদনের তথ্যের আলোকে রাশিয়া ও চীনের অভিন্ন বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গি, বহুমুখী বিশ্বব্যবস্থা, তাইওয়ান সংকট, মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি এবং ইউক্রেন সংকটের মতো প্রধান ক্ষেত্রগুলোর একটি গভীর বিশ্লেষণ নিচে উপস্থাপন করা হলো।

বহুমুখী বিশ্বব্যবস্থার ধারণা

মস্কো এবং বেইজিংয়ের বর্তমান সম্পর্কের সবচেয়ে বড় ভিত্তি হলো একটি ‘বহুমুখী বিশ্বব্যবস্থা’ বা এমন একটি বৈশ্বিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যা কোনো একক শক্তির অধীনে থাকবে না। দুই দেশই মনে করে যে, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পশ্চিমা বিশ্ব, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের একক আধিপত্যবাদী নীতির অবসান ঘটার সময় এসেছে। রাশিয়া ও চীন উভয়েই ওয়াশিংটনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময় নিষেধাজ্ঞা, সামরিক জোট এবং বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে অপব্যবহার করার অভিযোগ এনেছে।

তাদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র নিজের বৈশ্বিক আধিপত্য টিকিয়ে রাখতে এই হাতিয়ারগুলো ব্যবহার করে আসছে, যা উদীয়মান অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক শক্তিগুলোর বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করছে। এই একক আধিপত্যের বিপরীতে তারা যুক্তি দেখায় যে, আন্তর্জাতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে বর্তমান বিশ্বের নতুন ও উদীয়মান পরাশক্তিগুলোর আরও বেশি এবং কার্যকর ভূমিকা থাকা উচিত। এই লক্ষ্য অর্জনে রাশিয়া ও চীন ব্রিকস এবং সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার (এসসিও) মতো জোটগুলোকে ব্যাপকভাবে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। তারা এই প্ল্যাটফর্মগুলোকে পশ্চিমা নেতৃত্বাধীন বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের শক্তিশালী বিকল্প এবং একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও ন্যায়সংগত বৈশ্বিক ব্যবস্থার মূল স্তম্ভ হিসেবে বিশ্বমঞ্চে উপস্থাপন করছে।

 

২০২২ সালে উজেবেকিস্তানের সমরখন্দে এক সম্মেলনের ফাঁকে ভ্লাদিমির পুতিন ও সি চিনপিং। ছবি: রয়টার্স২০২২ সালে উজেবেকিস্তানের সমরখন্দে এক সম্মেলনের ফাঁকে ভ্লাদিমির পুতিন ও সি চিনপিং। ছবি: রয়টার্স

 

তাইওয়ান সংকট এবং এক চীন নীতি

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম প্রধান উত্তেজনার কেন্দ্রবিন্দু তাইওয়ান ইস্যুতে রাশিয়া শুরু থেকেই বেইজিংয়ের অবস্থানকে দৃঢ়ভাবে সমর্থন করে আসছে। মস্কো আনুষ্ঠানিকভাবে বেইজিংয়ের ‘এক চীন নীতি’ সমর্থন করে, যার আওতায় তাইওয়ানকে চীনের মূল ভূখণ্ডের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। যদিও বিশ্বের বেশির ভাগ দেশই আনুষ্ঠানিকভাবে এই নীতি মেনে চলে, তবুও তাইপের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের অব্যাহত এবং ক্রমবর্ধমান সামরিক ও রাজনৈতিক সমর্থন ওয়াশিংটন এবং বেইজিংয়ের মধ্যে উত্তেজনাকে মারাত্মকভাবে বাড়িয়ে তুলেছে। বেইজিংয়ে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে প্রেসিডেন্ট সি চিনপিং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দীর্ঘ বিলম্বিত সফরের সময় এই বিষয়ে কড়া হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন। সি চিনপিং স্পষ্ট করে বলেন যে, চীন-মার্কিন সম্পর্কের ক্ষেত্রে তাইওয়ান ইস্যুটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং সংবেদনশীল বিষয়। তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেন, এই বিষয়টির সঠিক এবং সতর্ক সমাধান না করা হলে তা বিশ্বের এই দুই পরাশক্তির মধ্যে সরাসরি সংঘাত এবং ভয়াবহ সংঘর্ষের জন্ম দিতে পারে। রাশিয়া এই ইস্যুতে চীনের সার্বভৌমত্বের দাবিকে পূর্ণ সমর্থন দিয়ে ওয়াশিংটনের উসকানিমূলক নীতির তীব্র বিরোধিতা করে আসছে।

মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি এবং ইরান সংকট

বর্তমান ভূ-রাজনীতিতে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ ও অস্থিরতা রাশিয়া ও চীন–উভয় দেশের জন্যই এক বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সম্প্রতি ইরান লক্ষ্য করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলাকে মস্কো কঠোর ভাষায় নিন্দা জানিয়েছে এবং একে ‘সম্পূর্ণ উসকানিমূলক আগ্রাসন’ হিসেবে অভিহিত করেছে। অন্যদিকে বেইজিংও এই যুদ্ধের তীব্র নিন্দা করে সতর্কবার্তা জারি করেছে। চীনের মতে, এই চলমান সংঘাত এবং হরমুজ প্রণালির মধ্য দিয়ে সমুদ্রগামী জাহাজ চলাচলে সৃষ্ট বিঘ্ন বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার এবং অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় এক বিশাল ধাক্কা বা সংকটের সৃষ্টি করেছে।

চীন মূলত ইরানের অপরিশোধিত তেলের অন্যতম প্রধান ক্রেতা, কিন্তু গত ফেব্রুয়ারিতে মার্কিন-ইসরায়েলি হামলার পর থেকে ইরান থেকে চীনের তেল সরবরাহ অনেকাংশে বাধাগ্রস্ত ও হ্রাস পেয়েছে। এই পরিস্থিতিতে রাশিয়া চীনের জ্বালানি চাহিদা মেটাতে এবং এই ঘাটতি পূরণ করতে বেইজিংয়ে তেল রপ্তানি উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বাড়িয়ে দিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের এই সংকটময় পরিস্থিতিতে মস্কো এবং বেইজিং উভয়েই বারবার জোর দিয়ে বলেছে যে, এই ধরনের সশস্ত্র সংঘাতের কোনো সামরিক সমাধান হতে পারে না, বরং আলোচনার টেবিলে কূটনৈতিক উপায়েই এর একটি স্থায়ী সমাধান সূত্র খুঁজে বের করা প্রয়োজন।

ইউক্রেন সংকট এবং ন্যাটোর সম্প্রসারণ

ইউক্রেন যুদ্ধকে কেন্দ্র করে রাশিয়া ও পশ্চিমা বিশ্বের মধ্যে যে চরম বিরোধ তৈরি হয়েছে, সেখানেও চীন এক ধরনের ভারসাম্যপূর্ণ কিন্তু রাশিয়ার প্রতি সহানুভূতিশীল কূটনৈতিক অবস্থান বজায় রেখেছে। চীন গত কয়েক বছরে ইউক্রেন সংকট নিরসনে বেশ কয়েকটি শান্তি প্রস্তাব পেশ করেছে। বেইজিং ধারাবাহিকভাবে মস্কো এবং কিয়েভকে অনতিবিলম্বে আলোচনা পুনরায় শুরু করার এবং এই সংকটের মূল কারণগুলোকে চিহ্নিত করে একটি স্থায়ী মীমাংসার দিকে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়ে আসছে। রাশিয়ার পক্ষ থেকে এই যুদ্ধকে মার্কিন নেতৃত্বাধীন ন্যাটো জোটের উসকানি এবং রাশিয়ার সীমানার দিকে ন্যাটোর আগ্রাসী সম্প্রসারণের বিরুদ্ধে একটি পরোক্ষ যুদ্ধ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।

মস্কোর দাবি, ২০১৪ সালে ইউক্রেনে পশ্চিমা মদদপুষ্ট অভ্যুত্থানের পর থেকে কিয়েভের ওপর পশ্চিমাদের ক্রমবর্ধমান প্রভাব এই সংকটের মূল বীজ বপন করেছিল। রাশিয়া জোর দিয়ে বলেছে যে, যেকোনো টেকসই শান্তি চুক্তির জন্য ইউক্রেনকে অবশ্যই একটি নিরপেক্ষ ও জোটনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসেবে ফিরে আসতে হবে, দেশটিকে সম্পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণ করতে হবে এবং তথাকথিত ‘ডিনাজিফিকেশন’ বা নাৎসিমুক্ত করতে হবে। এর পাশাপাশি ২০২২ সালে গণভোটের মাধ্যমে রাশিয়ার সাথে একীভূত হওয়া সমস্ত অঞ্চল থেকে ইউক্রেনীয় সৈন্য প্রত্যাহারের দাবিও পুনর্ব্যক্ত করেছে মস্কো, যা চীন আন্তর্জাতিক আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করার পক্ষে মত প্রকাশ করেছে।

পরিশেষে বলা যায়, ভ্লাদিমির পুতিনের এই বেইজিং সফর কেবল দুই দেশের মধ্যকার বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক লেনদেনের বিষয় নয়, বরং এটি বর্তমান একমেরুকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থার বিরুদ্ধে দুই পরাশক্তির এক শক্তিশালী কৌশলগত জোটের বার্তা দেয়। নিষেধাজ্ঞা, ভূ-রাজনৈতিক চাপ এবং আঞ্চলিক সংঘাতের এই সময়ে রাশিয়া ও চীনের এই বহুমাত্রিক একাত্মতা এবং অভিন্ন পররাষ্ট্রনীতি আগামী দিনে বিশ্ব রাজনীতির ভারসাম্য নির্ধারণে অত্যন্ত নির্ণায়ক ভূমিকা পালন করবে।