Image description

ভারতে মুসলিমদের ওপর সহিংসতা ও নির্যাতনের অভিযোগ নতুন নয়; তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক রূপ নিয়েছে। কয়েক দশক ধরে দেশটির বিভিন্ন প্রান্তে সংখ্যালঘু মুসলিম জনগোষ্ঠী সাম্প্রদায়িক হামলা, ঘৃণামূলক বক্তব্য, বৈষম্যমূলক আইন প্রয়োগ এবং রাজনৈতিক মেরুকরণের শিকার হয়ে আসছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, ধর্মীয় পরিচয়কে কেন্দ্র করে সামাজিক বিভাজন ক্রমেই তীব্র হয়েছে, যার প্রভাব পড়ছে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা, নাগরিক অধিকার ও সামাজিক অবস্থানের ওপর। বিশেষ করে ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচন পরবর্তী সময়ে উত্তেজনা ও সহিংস ঘটনার মাত্রা বহুগুণ বেড়েছে বলে বিভিন্ন মহলে অভিযোগ উঠেছে।
নির্বাচনের পর কয়েকটি রাজ্যে মুসলিম অধ্যুষিত এলাকায় হামলা, বাড়িঘর ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে অগ্নিসংযোগ, গণগ্রেপ্তার এবং উসকানিমূলক প্রচারণার খবর সামনে এসেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও মুসলিমবিদ্বেষী বক্তব্য ও অপপ্রচার দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। বিশ্লেষকদের মতে, রাজনৈতিক স্বার্থে ধর্মীয় বিভাজনকে ব্যবহার করার প্রবণতা বাড়ায় সংখ্যালঘুদের মধ্যে ভয় ও অনিশ্চয়তা গভীর হয়েছে। মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, আইনের সমান সুরক্ষা এবং সামাজিক সম্প্রীতি নিশ্চিত না হলে এই সংকট আরও ভয়াবহ আকার নিতে পারে। ফলে পশ্চিমবঙ্গের এই পরিস্থিতি শুধু আঞ্চলিক নয়, বরং বৃহত্তর দক্ষিণ এশীয় রাজনৈতিক ও মানবাধিকার আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে পরিণত হয়েছে।

হামলা-নির্যাতন
পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের ফল ঘোষণার পরবর্তী কয়েক দিনে রাজ্যজুড়ে শতাধিক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে বলে অ্যাসোসিয়েশন ফর প্রটেকশন অব সিভিল রাইটস (এপিসিআর)-এর এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, যেখানে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হিসেবে মুসলিম সম্প্রদায়কে চিহ্নিত করা হয়েছে। ৪ থেকে ৭ মে পর্যন্ত সময়কালে সংঘটিত এসব ঘটনায় ইসলাম ধর্মাবলম্বী, তৃণমূল কংগ্রেস সমর্থক এবং গবাদি পশুর হাট লক্ষ্য করে হামলার অভিযোগ ওঠে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, সহিংসতার মধ্যে সম্পত্তিতে হামলা, ভয়-ভীতি প্রদর্শন, অর্থনৈতিক বয়কট, দোকান ও পরিবহন ব্যবস্থায় আঘাত, উচ্ছেদ অভিযান এবং কিছু ক্ষেত্রে বুলডোজার ব্যবহারের ঘটনাও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে; এর মধ্যে অন্তত শতাধিক মুসলিম শারীরিক বা অন্যভাবে নিগৃহীত হয়েছেন এবং শতাধিকটি সম্পত্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার মধ্যে বাড়িঘর, মসজিদ, দোকান ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে।

এছাড়াও সম্পত্তি ধ্বংসের ঘটন, যানবাহন ও কখনও কখনও ধর্মীয় স্থাপনায় ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে, যার ফলে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ছে এবং অনেককে এলাকা ছেড়ে যেতে বাধ্য হচ্ছে। অর্থনৈতিক বয়কট ও সামাজিক চাপ সৃষ্টি করছে। মুসলিম মালিকানাধীন দোকান থেকে কেনাকাটা বন্ধ করতে বলা হচ্ছে, কর্মসংস্থান থেকে বাদ দেওয়া বা বাজারে অংশগ্রহণে বাধা দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি ভয়ভীতি ও হুমকির মাধ্যমে একটি আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি করা হচ্ছে, যেমন রাতে হুমকি দেওয়া, এলাকা ছাড়তে চাপ দেওয়া বা গুজব ছড়িয়ে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা সৃষ্টি করা। অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রতিশোধের অংশ হিসেবে নির্দিষ্ট ধর্মীয় সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করে হামলা চালানো হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ঘৃণামূলক প্রচারণা, বিভ্রান্তিকর তথ্য ও বিদ্বেষ ছড়িয়ে পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করা হচ্ছে, যা বাস্তব সহিংসতাকে উসকে দিচ্ছে।

ভৌগোলিকভাবে এই সহিংসতা পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় ছড়িয়ে পড়ে। কোচবিহার ও উত্তর ২৪ পরগনায় সবচেয়ে বেশি ঘটনা ঘটলেও কলকাতা, হাওড়া, মুর্শিদাবাদ, মালদা ও বীরভূমসহ বিভিন্ন জেলায় এই সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। এছাড়া ঝাড়খণ্ড সীমান্তবর্তী কিছু এলাকা ছাড়া প্রায় পুরো রাজ্যেই কমবেশি এই উত্তেজনার প্রভাব পড়ে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়। যা স্থানীয় সংঘর্ষের বাইরে একটি বৃহত্তর বিদ্বেষমূলক পরিস্থিতির ইঙ্গিত দেয়।

অন্যদিকে, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল এসব ঘটনার জন্য একে অপরকে দায়ী করেছে। তৃণমূল কংগ্রেস ও অন্যান্য বিরোধী দল অভিযোগ করেছে যে, নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয়ের পর বিজেপি-সংশ্লিষ্টরা রাজ্যজুড়ে এই সহিংসতা চালিয়েছে, এমনকি পুলিশের উপস্থিতিতেও দোকানপাটে আগুন দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করা হয়। এ প্রসঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এটি পরিকল্পিতভাবে সংখ্যালঘু ও বিরোধী সমর্থকদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের একটি চেষ্টা। এদিকে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় এটিকে “টার্গেটেড ভায়োলেন্স” হিসেবে আখ্যা দিয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের ভূমিকা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। বিশেষ করে মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা ও উদ্বেগ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা দীর্ঘমেয়াদে রাজ্যের সামাজিক ভারসাম্যের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
প্রতিবেদনের ভাষ্য অনুযায়ী, এই ঘটনাগুলো কেবল বিচ্ছিন্ন স্থানীয় সংঘর্ষ নয়, বরং একটি বৃহত্তর সামাজিক ও রাজনৈতিক উত্তেজনার বহিঃপ্রকাশ। বিশেষ করে নির্বাচনের পর ক্ষমতার পালাবদল বা রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের সঙ্গে এসব হামলার যোগসূত্র রয়েছে বলে অনেকেই মনে করছেন।

রাস্তায় নামাজ পড়া নিষিদ্ধ
পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে তোলে বিজেপি নেতা অর্জুন সিংয়ের বক্তব্য। তিনি দাবি করেন, নতুন সরকার রাস্তায় নামাজ পড়া বন্ধ করার নির্দেশ দিয়েছে। যদিও প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এ ধরনের নির্দিষ্ট কোনো আদেশ নেই, তবুও এই বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার জন্ম দেয়। ভারতে ধর্মীয় স্বাধীনতা সাংবিধানিক অধিকার হলেও রাজনৈতিক বক্তব্যের মাধ্যমে মুসলিম ধর্মীয় অনুশীলনকে বারবার বিতর্কিত করে তোলা হচ্ছে। মসজিদ দখলে নিয়ে মন্দির করা, হিজাব, আজান, নামাজ- এসব বিষয়কে রাজনৈতিক বিতর্কে পরিণত করার ফলে সমাজে বিভাজন বাড়ছে।

গরুসহ সব পশু জবাই নিষিদ্ধ
ভারতে গরু জবাইকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরেই ধর্ম, রাজনীতি ও সামাজিক আবেগের মিশ্র এক বিতর্ক বিদ্যমান। দেশটির বহু রাজ্যে গরু ও বাছুর জবাই আইনত নিষিদ্ধ, কোথাও আবার আংশিকভাবে অনুমোদিত। হিন্দু ধর্মে গরুকে পবিত্র প্রাণী হিসেবে দেখা হয় বলে এই নিষেধাজ্ঞাকে অনেকেই ধর্মীয় মূল্যবোধ রক্ষার পদক্ষেপ হিসেবে সমর্থন করেন। অন্যদিকে মুসলিম, খ্রিস্টান ও কিছু পশুপালননির্ভর জনগোষ্ঠী মনে করে, এই আইন তাদের খাদ্যাভ্যাস, পেশা ও ব্যক্তিস্বাধীনতার ওপর প্রভাব ফেলছে।
ভারতের সংবিধানে পশু সংরক্ষণকে গুরুত্ব দেওয়া হলেও, গরু জবাই নিয়ে একক জাতীয় আইন নেই; বরং প্রতিটি রাজ্য নিজস্ব আইন অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেয়। ফলে কোথাও সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা, কোথাও নির্দিষ্ট বয়স বা অবস্থার গবাদিপশু জবাইয়ের অনুমতি রয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে গরু জবাইকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক উত্তেজনা, সহিংসতা ও সামাজিক বিভাজনের ঘটনাও সামনে এসেছে। এর মধ্যেই সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গে প্রকাশ্যে গরুসহ বিভিন্ন ধরনের পশু জবাই নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এমন একটি নির্দেশনা নিয়ে রাজ্যজুড়ে আলোচনা ও বিতর্ক শুরু হয়েছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, নতুন নিয়ম অনুযায়ী নির্ধারিত সরকারি অনুমোদন ছাড়া গরু, ষাঁড়, মহিষসহ কোনো পশু জবাই করা যাবে না। নিয়ম ভঙ্গ করলে সর্বোচ্চ ছয় মাস পর্যন্ত কারাদণ্ড অথবা অর্থদণ্ড, কিংবা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, পশু জবাইয়ের আগে স্থানীয় পৌর কর্তৃপক্ষ বা পঞ্চায়েত এবং সরকারি পশু চিকিৎসকের যৌথ অনুমোদিত ফিটনেস সনদ নেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। ওই সনদে উল্লেখ থাকতে হবে যে পশুটির বয়স ১৪ বছরের বেশি এবং সেটি আর কাজ বা প্রজননের উপযোগী নয়, অথবা আঘাত, অসুস্থতা কিংবা স্থায়ী অক্ষমতার কারণে জবাইযোগ্য অবস্থায় রয়েছে।
নতুন নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, অনুমোদিত পশু শুধুমাত্র নির্ধারিত কসাইখানা বা প্রশাসন অনুমোদিত স্থানে জবাই করা যাবে। খোলা জায়গা, রাস্তা বা জনসমাগমস্থলে পশু জবাই সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ থাকবে। একইসঙ্গে পরিদর্শনের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে এবং পরিদর্শনে বাধা দিলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।
এছাড়া সনদ প্রদান না করলে আবেদনকারী ১৫ দিনের মধ্যে সরকারের কাছে আপিল করার সুযোগ পাবেন বলেও উল্লেখ রয়েছে। নিয়ম বাস্তবায়নের মাধ্যমে জনস্বাস্থ্য, পরিবেশ ও শহুরে শৃঙ্খলা বজায় রাখার লক্ষ্য রয়েছে বলে প্রশাসনিক সূত্রে দাবি করা হচ্ছে।

তবে এই সিদ্ধান্ত ঘিরে নানা প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। অনেকেই এই আইন করায় হতবাক হয়েছেন। আবার অনেকেই বলছেন, মুসলিমদের ওপর নির্যাতন করার নতুন হাতিয়ার তৈরি করেছে বিজেপি

হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির বিস্তার
ভারতের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় “হিন্দুত্ব” শুধু একটি আদর্শ নয়; এটি একটি সাংগঠনিক ও রাষ্ট্রীয় শক্তিতে পরিণত হয়েছে। বিজেপি এবং আরএসএস দীর্ঘদিন ধরে ভারতকে “হিন্দু রাষ্ট্র” হিসেবে গড়ে তোলার ধারণা প্রচার করে আসছে।

গুজরাট দাঙ্গা, বাবরি মসজিদ ধ্বংস, নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (সিএএ), জাতীয় নাগরিকপঞ্জি (এনআরসি), “লাভ জিহাদ”, রাজনীতি- সব ক্ষেত্রেই মুসলমানদেরকে কেন্দ্র করে ভয় ও বিভাজনের রাজনীতি তৈরি করা হয়েছে।

সমালোচকদের মতে, মুসলমানদের ভয় দেখি বিজেপিতে ভোট দিতে বাধ্য করা হয়েছে। এমনও অভিযোগ পাওয়া গেছে, তৃণমুলের মুসলিমরা যদি ভোট কেন্দ্রে যায় তাদের হত্যা করা হবে। এতে করে অনেক মুসলিম ও তৃণমুলে ভোটাররা ভোট কেন্দ্রে যায়নি। আর যারা সাহস করে গেছে তাদের ওপর নির্যাতন চালালো হচ্ছে।

নাগরিকত্ব ও পরিচয়ের সংকট
২০১৯ সালে ভারতের নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (সিএএ) নিয়ে ব্যাপক আন্দোলন হয়েছিল। কারণ, এই আইনে প্রতিবেশী দেশ থেকে আসা অমুসলিমদের নাগরিকত্বের সুযোগ দেওয়া হলেও মুসলমানদের ক্ষেত্রে তা রাখা হয়নি।

এই আইনের বিরুদ্ধে শাহিনবাগসহ ভারতের বিভিন্ন স্থানে দীর্ঘ আন্দোলন হয়। মুসলমানরা মনে করেন, এটি তাদের নাগরিক পরিচয়কে প্রশ্নবিদ্ধ করার একটি প্রচেষ্টা।

এছাড়া এনআরসি বা জাতীয় নাগরিকপঞ্জি কার্যক্রমও মুসলমানদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। বহু দরিদ্র মানুষ নাগরিকত্ব প্রমাণের নথি দেখাতে না পারায় “রাষ্ট্রহীন” হয়ে পড়ার ভয় তৈরি হয়েছে। কারণ, ইতোমধ্যে অমিত শাহ সহ কয়েক জন বিজেপি নেতা মুসলিমদের দেশ ছাড়ার হুমকি দিয়েছেন।
পশ্চিমবঙ্গের ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে যে অভিযোগ উঠেছে, তা এই বৃহত্তর রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গেই সম্পর্কিত।

গণমাধ্যম ও প্রোপাগান্ডা
বর্তমান সময়ে রাজনৈতিক সংঘাতের বড় একটি অংশ পরিচালিত হয় তথ্য যুদ্ধের মাধ্যমে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া খবর, গুজব এবং বিদ্বেষমূলক প্রচারণা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।
ভারতের কিছু গণমাধ্যমের বিরুদ্ধেও পক্ষপাতদুষ্ট আচরণের অভিযোগ রয়েছে। অনেক সময় মুসলিমদের নিয়ে নেতিবাচক সংবাদ প্রচার করে জনমত প্রভাবিত করার চেষ্টা করা হয় বলে সমালোচকরা মনে করেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে “দেশদ্রোহী”, “অনুপ্রবেশকারী”, “জিহাদি” ইত্যাদি শব্দ ব্যবহার করে মুসলমানদের বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়ানো হচ্ছে। এর ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যেও বিভাজন বাড়ছে।

দক্ষিণ এশিয়ার ওপর প্রভাব
ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির প্রভাব প্রতিবেশী দেশগুলোতেও পড়ছে। বাংলাদেশে ভারতের হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। সীমান্ত হত্যা, পানি বণ্টন, বাণিজ্য বৈষম্য এবং রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের অভিযোগের পাশাপাশি এখন মুসলিমবিদ্বেষী রাজনীতিও আলোচনায় এসেছে। বাংলাদেশের অনেক মানুষ মনে করেন, ভারতের অভ্যন্তরে মুসলমানদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ বাড়লে তার প্রভাব দুই দেশের সম্পর্কেও পড়বে।

দক্ষিণ এশিয়ায় স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে হলে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, ধর্মীয় সহনশীলতা এবং সমমর্যাদার সম্পর্ক জরুরি। কিন্তু যদি সাম্প্রদায়িক রাজনীতি আঞ্চলিক সম্পর্কের ওপর প্রভাব ফেলে, তবে তা পুরো অঞ্চলের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।

বিশ্বের উদ্বগ
নির্বাচনের পর ভারতে সংখ্যালঘু নিরাপত্তা নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ নতুন করে আলোচনায় এসেছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন, পর্যবেক্ষক এবং কিছু বিদেশি গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে সামাজিক সম্প্রীতি ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে নজরদারি বাড়ানো প্রয়োজন। যদিও ভারতের সরকার নিয়মিতভাবে দাবি করে থাকে যে দেশটির সংবিধান সকল নাগরিকের সমান অধিকার নিশ্চিত করে এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, তবুও বিভিন্ন মহলে এ নিয়ে ভিন্নমত ও উদ্বেগ প্রকাশ করা হচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচন-পরবর্তী সময় অনেক দেশে রাজনৈতিক ও সামাজিক মেরুকরণ বাড়তে দেখা যায়, যার প্রভাব সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর পড়ার আশঙ্কা তৈরি করে। ভারতে মুসলিমসহ বিভিন্ন সংখ্যালঘু গোষ্ঠীর নিরাপত্তা ও সামাজিক অবস্থান নিয়ে আগেও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলোচনা হয়েছে। এবারও কিছু মানবাধিকার সংস্থা তাদের প্রতিবেদনে দাবি করেছে যে কিছু এলাকায় উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে এবং স্থানীয় পর্যায়ে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশ মনে করছে, গণতান্ত্রিক বড় দেশ হিসেবে ভারতের ক্ষেত্রে সংখ্যালঘু নিরাপত্তা ও মানবাধিকার পরিস্থিতি স্বচ্ছভাবে পর্যবেক্ষণ করা জরুরি। তারা নিয়মিত সংলাপ, স্বাধীন তদন্ত এবং তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে পরিস্থিতি মূল্যায়নের আহ্বান জানাচ্ছে।

উল্লেখ্য, ভারতে মুসলিম সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে বৈষম্য, সহিংসতা ও রাজনৈতিক উত্তেজনা নিয়ে বহু বছর ধরেই দেশি-বিদেশি মহলে আলোচনা রয়েছে। মানবাধিকার সংগঠন, রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কয়েক দশক ধরে বিভিন্ন সময়ে মুসলিম জনগোষ্ঠী সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, ঘৃণামূলক বক্তব্য, সামাজিক বৈষম্য এবং সহিংস ঘটনার শিকার হয়েছে।
বিশেষ করে ১৯৯২ সালে অযোধ্যায় বাবরি মসজিদ ধ্বংস, ২০০২ সালের গুজরাট দাঙ্গা, দিল্লিসহ বিভিন্ন অঞ্চলে সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষ এবং সাম্প্রতিক সময়ে ধর্মীয় পরিচয়কে কেন্দ্র করে উত্তেজনা আন্তর্জাতিকভাবে আলোচিত হয়েছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর অভিযোগ, কিছু ক্ষেত্রে মুসলিমদের লক্ষ্য করে ঘরবাড়ি ভাঙচুর, গণপিটুনি, ধর্মীয় স্থাপনায় হামলা ও বৈষম্যমূলক আচরণের ঘটনা ঘটেছে। এবার বিধান সভা নির্বাচনে বিজেপির জয়ের পর নির্যাতন কয়েকগুণ বেড়েছে। এই পরিস্থিতিতে ভারতে মুসলিমরা আতঙ্কে দিন কাঠাচ্ছে।

শীর্ষনিউজ