মা-বাবা হওয়া কি আসলেই হাড়ভাঙা খাটুনির কাজ? সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম রেডডিটের এক আলোচনায় যখন এই প্রশ্নটি উঠেছিল, তখন ৪০০-র বেশি ভুক্তভোগী মা-বাবা একবাক্যে স্বীকার করেছেন, এই ক্লান্তি আসলে অন্তহীন এবং আক্ষরিক অর্থেই তা অবিরাম।
বর্তমান যুগে মা-বাবারা কেন এমন মরণ-ক্লান্তি অনুভব করছেন, তার কারণ খুঁজতে গিয়ে গবেষকরা এখন অদ্ভুত সব তথ্য পাচ্ছেন প্রতিনিয়ত। মজার ব্যাপার হলো, এই হাড়ভাঙা ক্লান্তির পেছনে কেবল রাতের কম ঘুম দায়ী নয়, বরং আমাদের নিঃসঙ্গ জীবনযাত্রার পরিবর্তনই এর জন্য দায়ী সবচেয়ে বেশি।
জার্মানি আর ফ্রান্সে প্রায় ৪০ হাজার মানুষের ওপর করা গবেষণায় দেখা গেছে, সন্তান হওয়ার পর মায়েরা গড়ে মাত্র এক ঘণ্টা আর বাবারা বড়জোর ১৫-২০ মিনিট কম ঘুমান অন্যদের তুলনায়। অবাক করা বিষয় হলো, ছয় বছরের কম বয়সী বাচ্চা আছে এমন মা-বাবা গড়ে সাত-আট ঘণ্টা বিছানায় সময় কাটান এবং এটি চিকিৎসকদের দেওয়া আদর্শ সময়ের মধ্যে পড়ে বেশ চমৎকারভাবে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, পর্যাপ্ত সময় বিছানায় কাটানোর পরেও কেন আমাদের দেশের বা বিদেশের আধুনিক মা-বাবারা সারাদিন এমন চোখ-মুখ বসে যাওয়া অবসাদ অনুভব করেন সবসময়?
বিবর্তনবাদ বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, আমাদের পূর্বপুরুষ বা আদিম শিকারি সমাজগুলোয় ঘুমের ধরন ছিল একদম আলাদা আর বেশ সহজ। ইউনিভার্সিটি অফ টরন্টোর গবেষক ডেভিড স্যামসন তানজানিয়ার হাদজা উপজাতির সঙ্গে থেকে দেখেছেন, তারা রাতে আমাদের চেয়ে বেশিবার জেগে উঠলেও, তারা কখনোই ঘুমের অভাব নিয়ে কোনো অভিযোগ করেন না কারও কাছে।
তাদের কাছে এক টানা আট ঘণ্টা মটকা মেরে ঘুমানোর কোনো যান্ত্রিক বাধ্যকতা ছিল না এবং তাদের আমাদের মতো সকাল ৯টা-৫টা অফিস ধরার বা ভারী যন্ত্রপাতি চালানোর কোনো তাড়াও ছিল না একদমই।
আগের দিনে মায়েরা তাদের সন্তানদের একদম নিজের শরীরের সঙ্গে লেপ্টে নিয়ে ঘুমাতেন এবং রাতে আধো-ঘুমে থেকেই সন্তানদের বুকের দুধ পান করাতেন খুব সহজে। নৃবিজ্ঞানীরা একে ‘ব্রেস্টস্লিপিং’ বলছেন এবং এই পদ্ধতিতে মা আর শিশু— দুজনেরই ঘুমের ছন্দ নষ্ট হতো না বরং মায়ের শরীরে বিশেষ হরমোন নিঃসরিত হয়ে ঘুম আরও গভীর করত নিমিষেই।
কিন্তু বর্তমানে আধুনিক পশ্চিমা পরামর্শ মেনে শিশুকে আলাদা ঘরে রাখা আর রাত জেগে মোবাইল টিপে বা আলো জ্বেলে ঘড়ি ধরে খাওয়ানোর ফলে মায়েদের শরীর ও মস্তিষ্ক পুরোপুরি জেগে ওঠে এবং পরে আর ঘুম আসতে চায় না কোনোভাবেই।
সবচাইতে বড় সমস্যা হলো এখনকার মা-বাবারা সন্তান পালনের জন্য আগের মতো পাড়া-প্রতিবেশী, দাদা-দাদি বা আত্মীয়স্বজনের সেই চিরচেনা সাহায্য পান না বললেই চলে। আদিম সমাজে একটি শিশুকে বড় করার জন্য পুরো গোষ্ঠী বা ‘অ্যালোপ্যারেন্টসরা’ এগিয়ে আসত এবং গবেষণায় দেখা গেছে ইফে উপজাতির শিশুদের মায়ের বাইরেও অন্তত ১০ জন মানুষ দেখাশোনা করত নিয়মিতভাবে।
কিন্তু এখনকার যুগে একক পরিবারে একা হাতে ডাবল শিফটে সংসার আর অফিস সামলাতে গিয়ে মায়েরা হিমশিম খাচ্ছেন সারাক্ষণ এবং এই নিঃসঙ্গতা আর মানসিক চাপই তাদের শরীরকে নিংড়ে দিচ্ছে প্রতি মুহূর্তে।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, আগের দিনে মায়েদের সন্তান হওয়ার মধ্যে অন্তত চার বছরের বিরতি থাকত যা তাদের শরীর পুনরুদ্ধারে সাহায্য করত অনেকখানি। কিন্তু বর্তমান কৃষিপ্রধান বা শিল্পোন্নত সমাজে খুব অল্প সময়ের ব্যবধানে একের পর এক বাচ্চা হওয়ায় মায়েদের ক্লান্তি এখন আকাশ ছুঁয়েছে খুব স্বাভাবিক নিয়মেই। তবে বিশেষজ্ঞরা আশার বাণী শুনিয়ে বলছেন, মানুষ আসলে এই চরম ঘুমের অভাব সহ্য করার এক অবিশ্বাস্য ক্ষমতা নিয়েই পৃথিবীতে এসেছে বংশরক্ষার তাগিদে।
পরিবেশ আর সংস্কৃতি প্রতিকূল হলেও আমাদের জিনগত গঠন আমাদের এই সংকট কাটিয়ে উঠতে সাহায্য করে একদম জন্মগতভাবেই। তাই ঘুমের সময় কত মিনিট কমল সেই হিসাব বা ট্র্যাকিং করা বন্ধ করে দিয়ে একটু রিল্যাক্স করলে ক্লান্তি থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব হবে অচিরেই।
বিবর্তনবাদ অনুযায়ী, সন্তান জন্মদান হলো জীবনের একটি ‘মিশন ক্রিটিক্যাল’ কাজ আর এই সময়ে একটু ঘুম বিসর্জন দেওয়াটা প্রকৃতির নিয়মেই একদম সার্থক বলে মনে করেন বিজ্ঞানীরা।
সূত্র: বিবিসি