১৯৭৮ সালের এক সকাল। রুয়ান্ডার ভিরুঙ্গা পর্বতমালার কুয়াশাভেজা জঙ্গলে বসে আছেন এক মানুষ। চারপাশে গরিলার পরিবার। বিশালদেহী সিলভারব্যাক গরিলাটি সতর্ক চোখে তাকিয়ে আছে, কিন্তু তার পাশে তিন বছরের ছোট্ট গরিলা শাবকটি যেন অন্যরকম কৌতূহলী। ধীরে ধীরে সে এগিয়ে এলো। তারপর একসময় হেলান দিয়ে শুয়ে পড়ল মানুষটার গায়ে। তিনি নড়লেন না। শুধু মৃদু হাসলেন।
ক্যামেরা তখনও চলছে। পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষ পরে সেই দৃশ্য দেখেছিল। কিন্তু দৃশ্যটার ভেতরে যে অদ্ভুত নীরবতা ছিল, তা ক্যামেরায় ধরা পড়েনি। মানুষ আর বন্যপ্রাণীর মাঝখানে কয়েক সেকেন্ডের জন্য সব ভয়, দূরত্ব হারিয়ে গিয়েছিল।
সেই মানুষটির নাম স্যার ডেভিড অ্যাটেনবরো।
আজ তাঁর বয়স একশো। একটা শতাব্দী।
মানুষের জীবনে যা প্রায় অসম্ভব দীর্ঘ এক যাত্রা। কিন্তু ডেভিড অ্যাটেনবরোর জীবন যেন শুধু সময়ের হিসাব নয়; এটা পৃথিবীকে দেখার এক নতুন পদ্ধতির ইতিহাস।
১৯২৬ সালের ৮ মে, ইংল্যান্ডের লন্ডন শহরের কাছে আইলওয়ার্থে জন্মেছিলেন তিনি। তাঁর বাবা ছিলেন ইউনিভার্সিটি অব লিচেস্টারের অধ্যক্ষ। শৈশব কেটেছে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে। অন্য শিশুরা যখন খেলনা জমাত, ছোট্ট ডেভিড তখন পকেটে করে জমাতেন জীবাশ্ম, পাথর আর অদ্ভুত সব প্রাণীর হাড়।
পরিবারের লোকেরা পরে মজা করে বলতেন, বাড়ির প্রতিটি ড্রয়ারে হয়তো কোনো না কোনো প্রাণীর খুলির টুকরো লুকানো থাকত।
শৈশব থেকেই তাঁর কৌতূহল ছিল অদ্ভুত রকমের। পৃথিবীর প্রতি, জীবনের প্রতি, প্রকৃতির প্রতি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় তাঁর পরিবার দুই ইহুদি কিশোরীকে আশ্রয় দিয়েছিল, যারা নাৎসি জার্মানি থেকে পালিয়ে এসেছিল। যুদ্ধ, মৃত্যু আর ধ্বংসের সেই সময় হয়তো তাঁকে মানুষ আর পৃথিবীর সম্পর্ক নিয়ে আরও গভীরভাবে ভাবতে শিখিয়েছিল।
বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি পড়েছিলেন প্রাণিবিদ্যা ও ভূতত্ত্ব। পরে কিছুদিন নৌবাহিনীতেও কাজ করেন। কিন্তু তাঁর জীবনের আসল মোড় ঘুরল যখন তিনি যোগ দিলেন ব্রিটিশ ব্রডকাস্টিং কর্পোরেশন বা বিবিসিতে। তখনও টেলিভিশন নতুন এক জাদু।
১৯৫৪ সালে শুরু হলো 'জু কোয়েস্ট'। আজকের দৃষ্টিতে সেটি ছিল অবিশ্বাস্য এক অনুষ্ঠান। ক্যামেরা নিয়ে তিনি চলে যেতেন পৃথিবীর দুর্গম বনজঙ্গলে। মানুষ তখন প্রথমবারের মতো টেলিভিশনের পর্দায় দেখল দূরবর্তী উপজাতি, অদ্ভুত প্রাণী, ঘন জঙ্গল আর অনাবিষ্কৃত পৃথিবী।
ডেভিড অ্যাটেনবরোর বিশেষত্ব ছিল, তিনি কখনো প্রকৃতিকে শুধু তথ্য হিসেবে দেখাতেন না। তিনি যেন গল্প বলতেন। এমনভাবে বলতেন, মনে হতো পৃথিবীর প্রতিটি প্রাণী তাঁর বহুদিনের পরিচিত।
একবার পাপুয়া নিউগিনির দুর্গম অঞ্চলে গিয়ে তাঁর দল প্রথমবার যোগাযোগ করে বিআমি নামের এক বিচ্ছিন্ন জনগোষ্ঠীর সঙ্গে। ভাষা কেউ কারও বোঝে না। তবু হাতের ইশারা, হাসি আর কৌতূহল দিয়ে কথা চলতে থাকে।
পরে তিনি বলেছিলেন, ভাষা ছাড়াও মানুষ একে অন্যকে বোঝাতে পারে, এই অভিজ্ঞতা তাঁকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল। ১৯৬০-এর দশকে তিনি শুধু উপস্থাপকই ছিলেন না, বিবিসির বড় কর্মকর্তা হিসেবেও কাজ করেছেন। বিবিসি টু চ্যানেলের প্রধান ছিলেন তিনি। তাঁর সময়েই ইউরোপে প্রথম রঙিন টেলিভিশন সম্প্রচার শুরু হয়। এমনকি বিখ্যাত কমেডি অনুষ্ঠান মনটি পাইথনস ফ্লাইং সার্কাস সম্প্রচারের সিদ্ধান্তেও তাঁর ভূমিকা ছিল।
কিন্তু অফিসের চেয়ারে বসে থাকা মানুষ তিনি ছিলেন না। শেষ পর্যন্ত চাকরির উচ্চপদ ছেড়ে আবার ক্যামেরার সামনে ফিরে এলেন। কারণ তাঁর আসল প্রেম ছিল পৃথিবী।
১৯৭৯ সালে মুক্তি পেল লাইফ অন আর্থ। সেই ধারাবাহিক যেন প্রকৃতি বিষয়ক টেলিভিশন অনুষ্ঠানের সংজ্ঞাই বদলে দিল। কোটি কোটি মানুষ প্রথমবার বুঝল, পৃথিবীর প্রতিটি প্রাণী আসলে এক বিশাল জীবনের গল্পের অংশ। সেই সময়ই ঘটেছিল বিখ্যাত গরিলার ঘটনাটি।
ছোট্ট গরিলা পাবলো যখন তাঁর ওপর শুয়ে পড়েছিল, ডেভিড অ্যাটেনবরো পরে বলেছিলেন, 'সেই সংযোগ আমার সারা জীবনের সঙ্গী হয়ে আছে।'
মজার ব্যাপার হলো, প্রাণীদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক প্রায়ই অদ্ভুত হয়ে উঠত। কেনিয়ায় এক অন্ধ গন্ডারশাবকের সঙ্গে তিনি চার হাত-পায়ে নেমে কথা বলার চেষ্টা করেছিলেন। গন্ডারটি নাক দিয়ে অদ্ভুত শব্দ করছিল, তিনিও উত্তর দিচ্ছিলেন একইভাবে। পরে শিশুর মতো আনন্দ নিয়ে বলেছিলেন, প্রাণীটি ছিল “মোহনীয়”। এই সরল বিস্ময়ই তাঁকে আলাদা করেছে।
ডেভিড অ্যাটেনবরো কখনো নিজেকে প্রকৃতির ওপরে ভাবেননি। তিনি যেন প্রকৃতিরই এক বিনয়ী পর্যবেক্ষক।
২০০১ সালে এল দ্য ব্লু প্লানেট। তারপর দ্য প্ল্যানেট আর্থ। পৃথিবীর সমুদ্র, মরুভূমি, বরফঢাকা অঞ্চল, গুহা, পাহাড় সব যেন নতুন করে খুলে গেল মানুষের সামনে। তাঁর কণ্ঠ হয়ে উঠল পৃথিবীর কণ্ঠ।
অনেকে বলেন, তাঁর গলা শুনলেই মনে হয় পৃথিবী নিজেই নিজের গল্প বলছে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাঁর গল্পের সুরও বদলেছে। যুবক অ্যাটেনবরো মূলত বিস্ময় দেখাতেন। বৃদ্ধ অ্যাটেনবরো দেখাতে শুরু করলেন সতর্কবার্তা।
জলবায়ু পরিবর্তন, বন ধ্বংস, প্লাস্টিক দূষণ, প্রাণীর বিলুপ্তি এসব নিয়ে তিনি ক্রমশ সরব হয়ে ওঠেন। একসময় তিনি সরাসরি বলতে শুরু করেন, মানুষ পৃথিবীকে বিপজ্জনক দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
২০২০ সালে মুক্তি পাওয়া David Attenborough: A Life on Our Planet-এ তিনি নিজের জীবনকে “সাক্ষীর জবানবন্দি” বলেছিলেন। তিনি দেখিয়েছিলেন, তাঁর জন্মের সময় পৃথিবীতে কত বিশাল বন ছিল, কত কম কার্বন ছিল বায়ুমণ্ডলে, আর এখন কত কিছু বদলে গেছে।
এই পরিবর্তন তিনি শুধু পরিসংখ্যানে দেখেননি। তিনি তা নিজের চোখে দেখেছেন। তিনি দেখেছেন প্রবাল প্রাচীর ফ্যাকাসে হয়ে যাচ্ছে। দেখেছেন বরফ গলছে দেখেছেন হাজার হাজার প্রাণী হারিয়ে যাচ্ছে।
তবু আশ্চর্যের বিষয়, তাঁর কণ্ঠে হতাশার চেয়ে আশা বেশি শোনা যায়। তিনি বিশ্বাস করেন, মানুষ চাইলে এখনও পৃথিবীকে বাঁচাতে পারে।
সম্ভবত এ কারণেই তরুণ প্রজন্মের কাছেও তিনি এত জনপ্রিয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগেও তাঁর কণ্ঠ মানুষ মন দিয়ে শোনে।
নেটফ্লিক্সে প্রচারিত আওয়ার প্লানেট নতুন প্রজন্মকে আবারও তাঁর প্রেমে ফেলেছিল। বিস্ময়কর সিনেমাটোগ্রাফি আর তাঁর কোমল অথচ গভীর বর্ণনা পৃথিবীর প্রকৃতিকে যেন এক মহাকাব্যে পরিণত করেছিল।
ব্রিটিশ রাজপরিবারের সঙ্গেও তাঁর সম্পর্ক ছিল দীর্ঘদিনের। রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথেল সঙ্গে তাঁর বন্ধুত্ব ছিল বহু বছরের। রানীর বড়দিনের ভাষণ তৈরিতেও তিনি কাজ করেছেন। পরে রাজা তৃতীয় চার্লস তাঁকে দ্বিতীয়বার নাইটহুড প্রদান করেন।
তবে এত সম্মান, পুরস্কার আর খ্যাতির পরও তাঁর ব্যক্তিজীবন ছিল অনেক শান্ত।
তাঁর স্ত্রী জেন অ্যাটেনবরো মারা যান ১৯৯৭ সালে। তখন তিনি নিউজিল্যান্ডে শুটিং করছিলেন। স্ত্রীর মৃত্যুর খবর শুনে দ্রুত ফিরে এসেছিলেন। পরে তিনি খুব কমই ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে কথা বলেছেন। কিন্তু কাছের মানুষরা বলেন, স্ত্রীর মৃত্যুর পর তিনি দীর্ঘদিন গভীর নিঃসঙ্গতার মধ্যে ছিলেন।
হয়তো প্রকৃতিই তখন তাঁর সবচেয়ে বড় সঙ্গী হয়ে উঠেছিল। ডেভিড অ্যাটেনবরোর জীবনের আরেকটি বিস্ময়কর দিক হলো, পৃথিবীতে অসংখ্য প্রাণী ও উদ্ভিদের নাম রাখা হয়েছে তাঁর নামে। এমনকি একটি প্রাগৈতিহাসিক সামুদ্রিক সরীসৃপের নামও তাঁর সম্মানে রাখা হয়েছে।
একজন মানুষের জন্য এর চেয়ে বড় স্বীকৃতি আর কী হতে পারে?
যে মানুষ সারাজীবন পৃথিবীর প্রাণীদের গল্প বলেছে, শেষ পর্যন্ত প্রাণীরাই যেন তাঁর নাম বহন করছে। আজ যখন তাঁর বয়স একশো, তখন পৃথিবী আগের চেয়ে অনেক বেশি বিপদের মুখে। কিন্তু একই সঙ্গে মানুষ আগের চেয়ে অনেক বেশি সচেতনও।
এই সচেতনতার পেছনে ডেভিড অ্যাটেনবরোর অবদান বিশাল। তিনি মানুষকে শিখিয়েছেন, প্রকৃতি কোনো দূরের বিষয় নয়। বনের গরিলা, সমুদ্রের তিমি, মরুভূমির টিকটিকি কিংবা বরফের পেঙ্গুইন সবাই আসলে আমাদেরই প্রতিবেশী।
আর হয়তো এ কারণেই পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষ তাঁকে শুধু একজন উপস্থাপক হিসেবে দেখে না। তারা তাঁকে দেখে পৃথিবীর এক বৃদ্ধ অভিভাবক হিসেবে। এক শতাব্দী পেরিয়ে এসে ডেভিড অ্যাটেনবরো এখনও যেন একই মানুষ, বিস্ময়ে ভরা চোখে পৃথিবীর দিকে তাকিয়ে থাকা এক চিরকৌতূহলী শিশু।
সূত্র: সিএনএন, জু কোয়েস্ট, মন্টি পাইথনস ফ্লাইং সার্কাস, লাইফ অন আর্থ, দ্য ব্লু প্ল্যানেট, প্ল্যানেট আর্থ, ডেভিড অ্যাটেনবরো: আ লাইফ অন আওয়ার প্ল্যানেট, আওয়ার প্ল্যানেট, নেটফ্লিক্স, বিবিসি