পশ্চিমবঙ্গের প্রথমবারের মতো ক্ষমতায় বসতে যাচ্ছে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)। সদ্যসমাপ্ত নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশের বেশি সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে দলটি এখন সরকার গঠনের অপেক্ষায়।
এমন পরিস্থিতিতে সবার নজর পরবর্তী মুখ্যমন্ত্রীর দিকে। তবে মুখ্যমন্ত্রী কে হচ্ছেন, তা এখনো নিশ্চিত নয়। নির্বাচনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়-এর বিপক্ষে কাউকে মুখ্যমন্ত্রী পদপ্রার্থী হিসেবে ঘোষণা না করায় জল্পনা এখন তুঙ্গে।
এই পদের জন্য এগিয়ে আছেন রাজ্য বিজেপির প্রধান মুখ শুভেন্দু অধিকারী। আলোচনায় এগিয়ে থাকার পেছনে রয়েছে তার নির্বাচনী প্রচারণায় সাফল্য।
পাঁচ বছর আগে তৃণমূল কংগ্রেস ছেড়ে বিজেপিতে যোগ দেন শুভেন্দু। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে দল হারলেও গত কয়েক বছর ধরে অযাচিত বিভিন্ন কথা বলে নিজেকে আলোচনায় রেখেছেন তিনি।
২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর বাংলাদেশ নিয়ে বিভিন্ন সময়ে বিতর্কিত মন্তব্য করেছেন শুভেন্দু। কখনো আলু-পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধের কথা বলেছেন, আবার কখনো বাংলাদেশ দখলের হুমকিও দিয়েছেন।
২ ডিসেম্বর ২০২৪: বাংলাদেশে আলু-পেঁয়াজ বন্ধ করে দেওয়া হবে
বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নিপীড়নের অভিযোগ নিয়ে সব সময় সরব থাকতে দেখা যায় শুভেন্দুকে। সম্মিলিত সনাতন জাগরণ জোটের মুখপাত্র চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের মুক্তির দাবিতেও ভারতে রাজনীতির মাঠ গরম করেছিলেন তিনি। চিন্ময়কে মুক্তি না দিলে সাময়িকভাবে পেট্রাপোল স্থলবন্দর বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছিলেন শুভেন্দু।
এতে কাজ না হলে নতুন বছর থেকে স্থলবন্দর দিয়ে ভারত থেকে আলু ও পেঁয়াজ বাংলাদেশে আসা বন্ধ করে দেওয়ার হুমকিও দেন তিনি। বেনাপোল স্থলবন্দরের ওপারে পেট্রাপোলে বিক্ষোভ সমাবেশে যোগ দিয়ে তিনি এসব হুমকি দেন।
সমাবেশে শুভেন্দু বলেছিলেন, ‘আজ সিনেমার ট্রেলার দেখিয়ে গেলাম। বাংলাদেশে হিন্দুদের ওপর অত্যাচার বন্ধ না হলে এবং চিন্ময় কৃষ্ণ দাস মুক্তি না পেলে পাঁচ দিন স্থলবন্দর বন্ধ থাকবে। তারপর ২০২৫ সালে লাগাতার বন্ধ করে দেওয়া হবে। আলু-পেঁয়াজ কী করে যায়, তা আমরা দেখব।’
৮ ডিসেম্বর ২০২৪: রাফাল যদি পাঠিয়ে দেওয়া হয়
সেদিন এক সমাবেশে বক্তব্য দিতে গিয়ে শুভেন্দু বলেছিলেন, ‘বেশি লাফালাফি করবেন না। কতগুলো অর্বাচীন ঢাকাতে দাঁড়িয়ে কাল বলছে, চার ঘণ্টার মধ্যে নাকি কলকাতা দখল করবে। ওই লোকগুলো কোন স্কুল-কলেজে পড়েছে বলে জানা নেই আমার। বিজ্ঞানের ন্যূনতম ধ্যান-ধারণা আছে বলে জানা নেই আমার। কতগুলো মাদরাসাতে পড়েছে, ওই জন্য ঢাকা থেকে ওই ধরনের কথাবার্তা বলছে।’
তিনি বলেন, ‘আমাদের হাসিমারা বিমানঘাঁটিতে যে রাফাল বিমানগুলো রাখা আছে না, তার একটা যদি পাঠিয়ে দেওয়া হয়, শুধু আওয়াজেই ওদের... আমি বলতে পারি। ভারত কত বড় সামরিক শক্তি ধরে এটা রাশিয়া জানে, আমেরিকা জানে, চীন জানে।’
‘ভারত থেকে পেঁয়াজ আর আলু না গেলে যাদের খাওয়া জোটে না, ওদের নুন তৈরি হয় কাঁচা নুন। কিন্তু আয়োডিনটা পাঠাতে হয় ভারতকে, তারপরে পরিশোধিত নুন তৈরি হয়। আমরা ওদের ওপর নির্ভর করি না।’
৯ ডিসেম্বর ২০২৪: তিন লাখ রিকশা রওনা দিয়েছে কলকাতা দখলের জন্য
বাংলাদেশ পরিস্থিতি নিয়ে আয়োজিত বিক্ষোভ সমাবেশে শুভেন্দু বলেন, ‘বাংলাদেশের জঙ্গি সংগঠন তারা ভারতকে শত্রু রাষ্ট্র ঘোষণা করার কথা বলছে, হিজবুত তাহরীর—এরা পাকিস্তানের পক্ষ নিয়েছিল ৭১ সালে। তখন ভারত ছেড়ে দিয়েছিল। এবারও এরা ধরা পড়বে, এবার যাতে ছাড়া না হয়। যে ভাষায় উত্তর দিলে এরা সন্তুষ্ট হয় সেই ভাষায় উত্তর দেওয়ার জন্য আমরা প্রস্তুত থাকব।’
‘আমার কাছে খবর আছে, ঢাকা থেকে তিন লাখ হাতে টানা রিকশা রওনা দিয়েছে কলকাতা দখল করার জন্য। আরে ওদের আছেটা কী ভাই? আছে কী? রাফাল রাখা আছে হাসিমারায়—শুধু আওয়াজ দিলেন না, ওখান থেকে, আমি কালকেও বলেছি আবারও বলছি ভদ্র ভাষায় বলছি…।’
তিনি বলেন, ‘ওখানে মৌলবাদী জঙ্গিদের হাতে রাষ্ট্রযন্ত্র চলে গেছে। আমেরিকা এসে ওসামা বিন লাদেন বা হামাস প্রধানের যে অবস্থা করেছে, সেই একই অবস্থা বাংলাদেশের জঙ্গিবাদ, মৌলবাদ, এই র্যাডিক্যাল ফোর্সকে শিকড়সুদ্ধ তুলে উপড়ে ফেলার কাজ বিশ্ব সমাজ করবে।’
১০ ডিসেম্বর ২০২৪: হাসিনা বৈধ প্রধানমন্ত্রী
ভারতের পশ্চিমবঙ্গের উত্তর ২৪ পরগনা জেলার ঘোজাডাঙ্গা সীমান্ত এলাকায় একটি কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে শুভেন্দু বলেন, ‘হাসিনা ওয়াজেদ বৈধ প্রধানমন্ত্রী। এরা অবৈধ। হাসিনা ওয়াজেদ প্রধানমন্ত্রী হিসেবেই ঢাকাতে শাহজালাল এয়ারপোর্টে নামবেন।’
‘আমরা ওই দেশ সৃষ্টি করেছি। আমাদের ১৭ হাজার সেনা বলিদান দিয়েছে। আমরা মুজিবুর রহমানকে প্রোটেকশন দিয়েছি। আমাদের দেশ দালাই লামাকে প্রোটেকশন দিয়েছে। ভারত এটা করে। হাসিনা ওয়াজেদকে সরাতে গেলে আরেকটা ভোটে নির্বাচনে গিয়ে সরাতো। এটা অবৈধ কেয়ারটেকার। আমার বিশ্বাস, আমেরিকা-ভারতসহ মানবতাবাদী দেশগুলো এগিয়ে এসে অবৈধ সরকারকে উৎখাত করবে।’
১২ জানুয়ারি ২০২৫: ওসামা বিন লাদেনের চেয়েও খারাপ অবস্থা হবে
বাংলাদেশের দিকে ইঙ্গিত করে শুভেন্দু বলেন, ‘ভারত এখন পৃথিবীর তৃতীয় সামরিক শক্তিশালী দেশ। ভারত অত্যন্ত দায়িত্বশীল দেশ, দুর্বল দেশকে আক্রমণ করে না। এরা জানে না যে সেনা পাঠানোর দরকার হবে না। আমরা এখন ড্রোনে এত এত বেশি উন্নত, এরা জানেই না। গোটা পাঁচ-সাতেক ড্রোন পাঠিয়ে দিলেই ওদের কাজ শেষ হয়ে যাবে। ওসামা বিন লাদেনের থেকেও খারাপ অবস্থা হবে।’
‘ওই বালুরঘাট সীমান্তে কটা ট্যাঙ্ক নিয়ে এসেছে, নিয়ে এসে খড়গাদা দিয়ে সাজিয়েছে। আমাদের ট্যাঙ্ক লাগে না, এখন ট্যাঙ্ক দিয়ে যুদ্ধ হয় না। ওরা ষাট-সত্তর সালে আছে। এখন ট্যাঙ্কের যুদ্ধ হয় না, বন্দুকের যুদ্ধ হয় না, ম্যানপাওয়ার লাগে না, পাঁচটা ড্রোন শুধু পাঠাবে ভারত।’
১৯ জানুয়ারি ২০২৫: কয়েক মিনিটেই ফয়সালা হয়ে যাবে
পশ্চিমবঙ্গের উত্তর ২৪ পরগনা জেলার বারাসাতে হিন্দু সম্মিলিত সংঘের ডাকে এক অনুষ্ঠানে এসে স্বাক্ষর সংগ্রহ কর্মসূচির উদ্বোধনের সময় শুভেন্দু বলেন, ‘ইউনূস যুদ্ধ লাগিয়ে রাষ্ট্রপ্রেমের জিকির তুলে টিকে থাকতে চাইছে। কিন্তু ভারতীয় বিএসএফ সংযমের পরিচয় দিচ্ছে। কারণ বাংলাদেশের সঙ্গে যুদ্ধ ভারতের কাছে তো কয়েকদিনের ব্যাপার নয়, কয়েক মিনিটেই ফয়সালা হয়ে যাবে। চিমটি কাটছে, আঁচড় কাটছে—আমরা বড় ভাই হিসেবে সহ্য করছি। বেড়া আমরা দেবই।’
২২ ডিসেম্বর ২০২৫: দীপু দাস হত্যার প্রতিবাদে বাংলাদেশ হাইকমিশন ঘেরাও
বাংলাদেশে দীপু দাস হত্যায় প্রতিবাদে আয়োজিত বিক্ষোভে শুভেন্দু বলেন, ‘আমরা এখানে ভারত সরকারের কমার্স অফিসেও যাব। গিয়ে বলব এক টন এক্সপোর্ট পারমিটও এখান থেকে দেওয়া যাবে না। এক কেজি পেঁয়াজও ওখানে পাঠানো যাবে না। যতক্ষণ না দীপু দাসের হত্যাকারীদের গ্রেপ্তার করা হয়।’
‘আমরা পুনরায় ১০ হাজার মানুষ নিয়ে আমরা বাংলাদেশ ডেপুটি হাইকমিশন অভিযান করব। যতক্ষণ না দীপু দাসের হত্যাকারীদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে, আমরা ডেপুটি হাই কমিশনারকে সুস্থভাবে এখানে অফিসে বসতে দেব না। এক কেজি পেঁয়াজও বাংলাদেশে পাঠাতে দেব না, দেব না, দেব না।’
২৭ ডিসেম্বর, ২০২৫: ইসরায়েল যেমন গাজায় শিক্ষা দিয়েছে, সেভাবে বাংলাদেশকে শিক্ষা
দীপু দাস হত্যার প্রতিবাদে আয়োজিত আরেক কর্মসূচিতে শুভেন্দু বলেন, ‘এই লোকদের অবশ্যই একটা শিক্ষা দিতে হবে। ঠিক যেমনটা ইসরায়েল গাজাকে দিয়েছে। আমাদের সরকার হিন্দু এবং দেশের স্বার্থে কাজ করছে। অপারেশন সিঁদুরে আমরা যেভাবে পাকিস্তানকে শিক্ষা দিয়েছিলাম, ঠিক তেমনি একটা শিক্ষা তাদেরও দিতে হবে।’