Image description

আটলান্টিক মহাসাগরে এক প্রমোদতরীতে হান্টাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। এ সংক্রমণে জাহাজের তিনজন যাত্রী প্রাণ হারিয়েছেন। আক্রান্ত সন্দেহে আরও তিনজনকে জরুরি ভিত্তিতে জাহাজ থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহাপরিচালক তেদ্রোস আধানম গেব্রিয়েসুস সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স-এ বলেছেন, ‘এমভি হন্দিয়াস’ নামের জাহাজটি থেকে উদ্ধারকৃত ওই তিন ব্যক্তিকে উন্নত চিকিৎসার জন্য নেদারল্যান্ডসে পাঠানো হয়েছে। কিন্তু এই হান্টাভাইরাস আসলে কী?

হান্টাভাইরাস কী?

হান্টাভাইরাস হচ্ছে একগুচ্ছ ভাইরাসের সমষ্টি, যা সাধারণত ইঁদুর বা এ জাতীয় ক্ষুদ্র প্রাণীর মাধ্যমে ছড়ায়। আক্রান্ত ইঁদুরের লালা, মল-মূত্র বা এদের বাস স্থানের ধুলিকণার সংস্পর্শে মানুষ এলে সংক্রমিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়, যা দেহে গুরুতর রোগ তৈরি করতে পারে।

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক সাপ্তাহিক ম্যাগাজিন ‘নিউ সায়েন্টিস্ট’ প্রতিবেদনে লিখেছে, ভৌগোলিক অবস্থানভেদে এ ভাইরাসের সংক্রমণের ধরন ও লক্ষণে ভিন্নতা দেখা যায়।

উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকায় এ ভাইরাসের কারণে ‘হান্টাভাইরাস কার্ডিওপালমোনারি সিনড্রোম’ বা এইচসিপিএস নামের রোগ হয়, যা সরাসরি শ্বাসতন্ত্র বা ফুসফুসকে আক্রমণ করে। এ নির্দিষ্ট ধরনে আক্রান্ত রোগীদের প্রায় অর্ধেকই মারা যেতে পারে।

অন্যদিকে, ইউরোপ ও এশিয়া মহাদেশে হান্টাভাইরাস ‘হেমোরেজিক ফিভার উইথ রেনাল সিনড্রোম’ বা এইচএফআরএস তৈরি করে। এ রোগটি দেহের রক্তনালী, বিশেষ করে কিডনির মারাত্মক ক্ষতি করে। অঞ্চল যেটাই হোক না কেন দ্রুত চিকিৎসা না পেলে এ সংক্রমণ প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে।

বিশ্বজুড়ে প্রতি বছর আনুমানিক ১০ হাজার থেকে এক লাখ মানুষ হান্টাভাইরাসে আক্রান্ত হন, যার মধ্যে এশিয়া ও ইউরোপে সংক্রমণের হার সবচেয়ে বেশি।

দক্ষিণ আফ্রিকার ‘ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর কমিউনিকেবল ডিজিজেস’-এর তথ্য অনুসারে, ওই জাহাজ থেকে নামা দুই ব্যক্তির দেহে ‘আন্দেস ভাইরাস’-এর উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছে।

‘আন্দেস ভাইরাস’ হান্টাভাইরাসেরই একটি রূপ যা, এইচসিপিএস বা শ্বাসতন্ত্রের জটিল রোগ তৈরি করে। এ নির্দিষ্ট ভাইরাসটি দীর্ঘ সময় ধরে থাকলে একজন মানুষ থেকে অন্য মানুষেও ছড়িয়ে পড়তে পারে।

হান্টাভাইরাসের লক্ষণ কী?

হান্টাভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার প্রাথমিক পর্যায়ে সাধারণত জ্বর, পেশিতে ব্যথা ও প্রচণ্ড মাথাব্যথার মতো লক্ষণ দেখা দেয়।

মানুষ সাধারণত সংক্রমিত ইঁদুরের লালা, মল-মূত্র বা এদের বসবাসের স্থানের ধুলিকণার সংস্পর্শে এলে এ ভাইরাসটি নিশ্বাসের মাধ্যমে দেহে প্রবেশ করে।

হান্টাভাইরাস মারাত্মক সংক্রামক ব্যাধি, যা সঠিক সময়ে শনাক্ত না হলে দেহের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গপ্রত্যঙ্গ বিকল করে দিতে পারে।

কীভাবে ছড়ায়?

সাধারণত সংক্রমিত ইঁদুরের লালা, মল বা মূত্র থেকে নির্গত ভাইরাস নিশ্বাসের মাধ্যমে দেহে প্রবেশ করলে এ সংক্রমণ ঘটে। সরাসরি স্পর্শ ছাড়াও কেবল আক্রান্ত প্রাণীর বর্জ্য মিশ্রিত ধূলিকণা বা বাতাস ফুসফুসে প্রবেশের মাধ্যমে এ রোগের বিস্তার ঘটে।

‘লন্ডন স্কুল অফ হাইজিন অ্যান্ড ট্রপিক্যাল মেডিসিন’-এর বিশেষজ্ঞ রজার হিউসন এক বিবৃতিতে বলেছেন, “ঠিক এ কারণে কোনো ব্যক্তির আক্রান্ত হওয়ার সন্দেহ দেখা দিলে তদন্তের ক্ষেত্রে একটি বিষয়েই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়, তা হচ্ছে আক্রান্ত ব্যক্তি ইঁদুরের উপদ্রব রয়েছে এমন কোনো পরিবেশ, খাদ্য গুদাম, জাহাজের কেবিন, স্টোরেজ এরিয়া বা অন্য কোনো বদ্ধ জায়গার সংস্পর্শে এসেছিলেন কি না। সাধারণত হান্তাভাইরাস একজন মানুষ থেকে অন্য মানুষের দেহে সহজে ছড়িয়ে পড়ার মতো ভাইরাস হিসেবে বিবেচিত নয়।”

ইঁদুরের কামড়ের মাধ্যমেও হান্টাভাইরাস সংক্রমণ হতে পারে। তবে এমনটা সচরাচর ঘটে না। সাধারণত এমন সব কাজ, যা ইঁদুরের সংস্পর্শে আসার ঝুঁকি বাড়ায়, যেমন বদ্ধ বা পর্যাপ্ত বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা নেই এমন ঘর পরিষ্কার করা, কৃষিকাজ, বনায়নের কাজ বা ইঁদুর উপদ্রুত স্থানে বসবাস বা ঘুমানোর মতো বিষয়গুলো মানুষের এ ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, মানুষ থেকে মানুষে এ ভাইরাসের সংক্রমণের ঘটনা এখন পর্যন্ত কেবল আমেরিকা মহাদেশের 'আন্দেস ভাইরাস'-এর ক্ষেত্রে নথিবদ্ধ করা হয়েছে, যা বেশ বিরল। এ ধরনের সংক্রমণ সাধারণত দীর্ঘ সময় ধরে ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শে থাকলে ঘটে থাকে, বিশেষ করে পরিবারের সদস্য বা জীবনসঙ্গীদের মধ্যে।

এ ছাড়া রোগের প্রাথমিক পর্যায়ে ভাইরাসের বিস্তার ঘটানোর সক্ষমতা সবচেয়ে বেশি থাকে তখনই একজনের দেহ থেকে অন্যজনের দেহে তা ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বেশি।

প্রাদুর্ভাব কতটা উদ্বেগের?

‘ল্যাঙ্কাস্টার ইউনিভার্সিটি’র বিশেষজ্ঞ অ্যাডাম টেইলর বলেছেন, “এ প্রাদুর্ভাব নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই।

“হান্টাভাইরাস সাধারণত মানুষের মাধ্যমে নয়, বরং প্রাণীর শারীরিক বর্জ্যের সংস্পর্শে এলে ছড়ায়। বর্তমানে জাহাজে ঝুঁকি কমানোর জন্য যেসব ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে সেগুলো কেবল সতর্কতামূলক পদক্ষেপ মাত্র।”

অন্যদিকে বিশেষজ্ঞ হিউসন বলেছেন, প্রমোদতরিতে এই সংক্রমণ পাওয়া গেছে বলেই কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে আসা ঠিক হবে না।

“একই জাহাজের একাধিক ব্যক্তি আক্রান্ত হওয়ার মানে এই নয় যে, তারা জাহাজের ভেতরেই সংক্রমিত হয়েছেন। তারা জাহাজে ওঠার আগে, যাত্রাপথে কোনো দ্বীপে নামার সময় বা পরিবেশগত অন্য কোনো কারণেও আক্রান্ত হতে পারেন। ঠিক এ কারণেই জনস্বাস্থ্য তদন্ত, ল্যাবরেটরি পরীক্ষা ও ভাইরাসের জিনোম সিকোয়েন্সিং করা জরুরি।”

জাহাজটি কোথায় ছিল?

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দেওয়া তথ্য অনুসারে, ২ মে এমভি হন্দিয়াস জাহাজে বেশ কয়েকজন যাত্রীর তীব্র শ্বাসকষ্টজনিত অসুস্থতার খবর মেলে। এ প্রাদুর্ভাবে এরইমধ্যে দুইজন মারা গেছেন এবং একজন যাত্রী আশঙ্কাজনক অবস্থায় চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

ভ্রমণসূচি অনুসারে, জাহাজটি ২০২৬ সালের ১ এপ্রিল আর্জেন্টিনার উশুয়াইয়া থেকে যাত্রা শুরু করেছিল। এরপর দক্ষিণ আটলান্টিক মহাসাগর হয়ে অ্যান্টার্কটিকা, দক্ষিণ জর্জিয়া, নাইটিংগেল দ্বীপ, ট্রিস্টান দা কুনহা, সেন্ট হেলেনা ও অ্যাসেনশন দ্বীপে যাত্রা বিরতি নেয়।

এদিকে, সুইজারল্যান্ডের এক ব্যক্তির দেহেও হান্টাভাইরাস শনাক্ত হয়েছে। তিনি ওই জাহাজে না থাকলেও এপ্রিলের শেষদিকে দক্ষিণ আমেরিকা থেকে দেশে ফিরেছিলেন।